একক মালিকানায় একাধিক গণমাধ্যম না রাখার সুপারিশ

লেখক:
প্রকাশ: ২ years ago

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

একক মালিকানায় একাধিক গণমাধ্যমের মালিকানা না রাখার পক্ষে মত দিয়েছে সংস্কার কমিশন। তাঁরা বলেছেন, ‘এক উদ্যোক্তার একটি গণমাধ্যম (ওয়ান হাউস, ওয়ান মিডিয়া)’ নীতি কার্যকর করাই গণমাধ্যমে কেন্দ্রীকরণ প্রতিরোধের সেরা উপায়। আজ শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে সংস্কার প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়। প্রতিবেদনেই এই সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমের মালিকানার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং একক মালিকানা ও একাধিক গণমাধ্যমের মালিকানা অর্জনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের কেন্দ্রীকরণের বিষয়গুলোয় সংস্কার শুরু হয়েছে। এমনকি দর্শক বা পাঠকের কত শতাংশ একটি গণমাধ্যমের গ্রাহক/ভোক্তা, এর ভিত্তিতেও সেই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নতুন প্রকল্পের অনুমোদন বা আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে।

একক মালিকানার পরিবর্তে মালিকানা বিস্তৃত (diffusion of ownership) করার প্রয়োজনীয়তার কথা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন কমিশন তার প্রতিবেদনে বলেছিল। ইন্দোনেশিয়ায় গণমাধ্যম চালুর অধিকার দেশটির যে কোনো নাগরিকের আছে, কিন্তু সেই গণমাধ্যমকে করপোরেশন হিসেবে কাজ করতে হয়, যার অর্থ হচ্ছে—তা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হবে, যাতে সাধারণ মানুষও শেয়ার ধারণ করতে পারবে। একই সঙ্গে দেশটির ‘মিডিয়া অ্যাক্টে’ সাংবাদিক-কর্মচারীদের শেয়ার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

এ ছাড়া, উন্নত বিশ্বেও অধিকাংশ বড় গণমাধ্যম কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির কারণে কোম্পানির উদ্যোক্তা বা ব্যবস্থাপকদের শেয়ারহোল্ডারদের কাছে অন্তত জবাবদিহি করতে হয়।

এতে আরও বলা হয়েছে, তথ্যের সঙ্গে মানুষের বিশ্বাস বা আস্থার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা জনগণের আমানতের সঙ্গে তুলনীয়। অথচ ব্যাংকের আমানতকে জনগণের আমানত বিবেচনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হলেও আমাদের দেশে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তেমনটি করা হয়নি।

সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালক পারিবারিকভাবে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ারধারণ করতে পারে না এবং কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে একই সময়ে পরিবারের তিনজনের বেশি পরিচালক থাকতে পারেন না। কিন্তু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এ ক্ষেত্রে তাই পরিবর্তন প্রয়োজন।

গণমাধ্যমের মালিকানা সংক্রান্ত সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, কমিশন প্রথম পর্যায়ে মাঝারি ও বৃহৎ মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে সর্বসাধারণের জন্য শেয়ার ছাড়া ও স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া সমীচীন মনে করছে। উদ্যোক্তা পরিচালক ও ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শেয়ার ধারণের সীমা ২৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত করা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে শেয়ার বণ্টন বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। কর্মীদের শেয়ার ধারণের সর্বোচ্চ সীমা পাঁচ শতাংশেই সীমিত রাখতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা কর্মীদের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন।

Manual5 Ad Code

এ ছাড়া, ছোট আকারের মিডিয়া কোম্পানিতে কর্মীদের শেয়ার দেওয়া বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। একই কোম্পানি/গোষ্ঠী/ব্যক্তি/পরিবার/উদ্যোক্তা যাতে একই সঙ্গে একাধিক মাধ্যমের মালিক হতে না পারেন, সে জন্য বিশ্বের বহু দেশে ক্রস-ওনারশিপ (টেলিভিশনের মালিক সংবাদপত্রের মালিক হতে পারেন না, বা সংবাদপত্রের মালিক টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হতে পারেন না) নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

Manual6 Ad Code

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও এটি আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্রিটেনেও কাছাকাছি ধরনের এক আইনে টেলিভিশনের মালিক কোনো স্থানীয় পত্রিকায় ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারেন না। ভারতে এ ধরনের একটি বিল পার্লামেন্টে বিতর্কের অপেক্ষায় আছে। আমাদের দেশেও বেসরকারি খাতে টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়ার সময় এই মর্মে সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপন হয়েছিল বলে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ গণমাধ্যম কমিশনের কাছে পেশ করা লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন। তবে সেই প্রজ্ঞাপন মন্ত্রণালয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্পষ্টতই সরকারগুলো ওই নীতি অনুসরণ করেনি।

Manual6 Ad Code

কমিশন আরও বলেছে, বৈশ্বিক উত্তম চর্চা হচ্ছে, গণমাধ্যমের কেন্দ্রীকরণ যেন কোনোভাবেই ঘটতে না পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ। কমিশন মনে করে, আমাদেরও অচিরেই অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। ক্রস-ওনারশিপ নিষিদ্ধ করে অরডিন্যান্স জারি করা যায় এবং যেসব ক্ষেত্রে এটি বিদ্যমান, সেগুলোয় পরিবর্তন আনার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তাদের ব্যবসা পুনর্গঠনের লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়া প্রয়োজন। এগুলো নানা পদ্ধতিতে হতে পারে।

যেসব কোম্পানি/গোষ্ঠী/প্রতিষ্ঠান/ব্যক্তি/পরিবার একই সঙ্গে টেলিভিশন ও পত্রিকার মালিক তারা যে কোনো একটি গণমাধ্যম রেখে অন্যগুলোর মালিকানা বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তর করে দিতে পারে। অথবা দুইটি মিডিয়ার (টেলিভিশন ও পত্রিকাকে) সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একত্রিত করে আরও শক্তিশালী ও বড় আকারের একটি মিডিয়া (টেলিভিশন অথবা দৈনিক পত্রিকা) পরিচালনা করতে পারে।

কমিশনের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ বিনষ্ট করে—এমন ব্যবস্থার অবসান হওয়া দরকার। একক মালিকানায় একই ভাষায় একাধিক দৈনিক পত্রিকা বা একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমের যে প্রভাবক ক্ষমতা, তা নিজ স্বার্থে কেন্দ্রীভূত করে। সে কারণে এই ব্যবস্থার অবসান হওয়া দরকার। বিদ্যমান এ ব্যবস্থার দ্রুততম সমাধান করতে হবে।
চাকরি স্থায়ীকরণের শুরুতেই সাংবাদিকের বেতন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমান করার সুপারিশচাকরি স্থায়ীকরণের শুরুতেই সাংবাদিকের বেতন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমান করার সুপারিশ

উদাহরণ টেনে কমিশন আরও বলেছে, একই সাবান একাধিক মোড়কে বাজারজাত করা যেমন বাজারের প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করে, একই মালিকানায় একই ভাষায় একাধিক দৈনিক পত্রিকাও গণমাধ্যমের প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করে এবং পাঠক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ‘এক উদ্যোক্তার একটি গণমাধ্যম (ওয়ান হাউস, ওয়ান মিডিয়া)’—নীতি কার্যকর করাই গণমাধ্যমে কেন্দ্রীকরণ প্রতিরোধের সেরা উপায়।

Manual1 Ad Code

এ ছাড়া, গণমাধ্যমের মালিকানায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে মানুষ জেনেশুনে তার পছন্দ (ইনফর্মড চয়েজ) বেছে নিতে পারে। এ ছাড়া, এতে গণমাধ্যমে কালো টাকার অনুপ্রবেশ নিরুৎসাহিত হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবছর তার আর্থিক হিসাব উন্মুক্ত করতে হবে, যাতে তার আয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code