করোনার কারণে অন্য রোগীদের সেবা ব্যাহত

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual7 Ad Code

করোনার কারণে অন্য রোগীদের চিকিত্সাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ঠান্ডা-সর্দি, জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্টের অনেক রোগীকে চিকিত্সকরা সেবা দিচ্ছেন না। ডাক্তাররা নির্দয় আচরণ করছেন রোগীদের সঙ্গে। অনেক রোগী এক সপ্তাহ ধরে সেবা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন না ডাক্তাররা। জ্বর থাকলেই ফিরিয়ে দিচ্ছে প্রাইভেট হাসপাতালগুলো। বেশির ভাগ ডাক্তার সর্দি-কাশি-জ্বর ও গলা ব্যথা আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সা দেবেন না বলেও লিখে রেখেছেন। বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশনের কারণে জ্বর বা শ্বাসকষ্ট অনুভব হওয়া রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালেও চিকিত্সকরা ঠান্ডা-সর্দি-জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের স্পর্শ পর্যন্ত করছেন না। কাউকে কাউকে আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বর দেখিয়ে বিদায় করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, বিষয়টি জেনেছি, বিভিন্ন অভিযোগ আসছে। এ ব্যাপারে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ডাক্তাররা যাতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস চালু রাখেন সে ব্যাপারেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিকিত্সকরা অভিযোগ করে বলেন, করোনা ভাইরাস সন্দেহভাজন রোগীদের সেবাদানে হাসপাতালে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয়সংখ্যক নিরাপত্তা সরঞ্জাম যেমন—পিপিই, হ্যান্ড গ্লাভস, অ্যাপ্রোন, বিশেষ গাউন, সার্জিক্যাল মাস্ক, চশমা ও জীবাণুমুক্তকরণ রাসায়নিক উপাদানের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে, রোগীদের জন্য মানসম্মত কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন অবকাঠামো না থাকায় সংক্রমণ ঝুঁকি রয়েছে। ঠান্ডা-কাশি ও শ্বাসকষ্ট করোনার উপসর্গও হতে পারে। তাই তারা রোগী সেবা দিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন বলে যুক্তি তুলে ধরেন।

রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এম শামীম জানান, প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকে ১ লক্ষ বেড আছে। আমরা সরকারকে এখন থেকে তিন মাস সহযোগিতা করতে পারি। তবে আমাদের গার্মেন্টসের মতো আর্থিক সহযোগিতা দিলে রোগীদের চিকিত্সাসেবা দিতে পারব এবং এতে অন্য রোগীরা উপকৃত হবেন। আমি আমার হাসপাতালের ১০০ বেড তিন মাসের জন্য ছেড়ে দেব করোনা রোগীদের চিকিত্সাসেবা দেওয়ার জন্য।

বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকরা বলেন, ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা কেন ঝুঁকি নেবে? সবার আগে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে ২ লাখ পিপিই বেসরকারি হাসপাতালে দেওয়া হলে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া ডাক্তার-নার্সসহ সেবাকর্মীদের ইন্সুরেন্সের ব্যবস্থা করা উচিত। এসব নানা কারণে অনেকে ডিউটি করতে চান না। আগে ব্যবস্থাপনা জরুরি।

সরেজমিনে রাজধানীর এবং দেশের জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, চিকিত্সকরা রোগীদের সেবা দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। মিরসরাইয়ের বারৈয়ারহাট এলাকার শফিকুর নাহার। ৬৫ বছরের এই বৃদ্ধার সম্প্রতি হঠাত্ করে কানের সমস্যা হয়। তাই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। শনিবার সন্ধ্যা থেকে ডাক্তার দেখাতে ছুটে বেড়িয়েছেন তিন-চারটি ডাক্তারের চেম্বার। কোথাও ডাক্তার পাননি।

Manual1 Ad Code

শুধু শফিকুর নাহার নন, রাজধানীসহ সারাদেশের চিত্র প্রায় অভিন্ন। রাজধানীর অনেক ডাক্তারের চেম্বারে সোমবার সিরিয়াল নেওয়ার পরও ডাক্তাররা আসেননি। তাই ডাক্তার না দেখিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে অনেক রোগীকে। তবে যারা নগরের বাইরে থেকে এসেছিলেন তারা পড়েছিলেন সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায়। গত ১৩ মার্চ নাজমা আমিন নামে কানাডা প্রবাসী এক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেবাদানের একপর্যায়ে সেবা-সংশ্লিষ্টরা তার করোনা ভাইরাস সন্দেহে আতঙ্কিত হয়ে চিকিত্সকরা রোগীর ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে যান। তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ও আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে মারা যান ঐ তরুণী।

এছাড়া সম্প্রতি জ্বর-সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন বাহরাইন ফেরত এক প্রবাসী। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে তার দেহে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার লক্ষণ দেখতে পান চিকিত্সকরা। এতে ৭ নম্বর পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অন্যান্য রোগীসহ দায়িত্বরত চিকিত্সক-নার্সরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এই রোগীকে কোথায় রাখা হবে, চিকিত্সা কীভাবে শুরু হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পূর্বে ঐ রোগী ভয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও গজারিয়ায় করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়া ছয় জন রোগী মারা গেছেন।

Manual7 Ad Code

মৃতদের স্বজনরা বলেন, বিনা চিকিত্সায় তারা মারা গেছেন। করোনা সন্দেহে তাদের সেবা দেওয়া হয়নি। হাসপাতালের কয়েক জন চিকিত্সক-নার্স অভিযোগ করেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে গত ২৭ জানুয়ারি দেশের সব সরকারি হাসপাতালে অনতিবিলম্বে সংক্রমক রোগীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা বা আইসোলেশন ইউনিট খোলার নির্দেশনা দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অথচ নির্দেশনার পর দেড় মাস পার হলেও অনেক হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট চালু হয়নি। এ কারণে সন্দেহভাজন রোগীকে সেবা দিতে চিকিত্সক, নার্স এবং ওয়ার্ডবয়রা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

Manual6 Ad Code

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাধিক চিকিত্সক-নার্স বলেন, দেশের সবচেয়ে বড়ো হাসপাতাল হওয়ায় রোগীদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। কারণ, ঢাকা মেডিক্যাল কাউকেই বিনা চিকিত্সায় ফিরিয়ে দেয় না। তবে করোনা ভাইরাস নিয়ে এখানকার চিকিত্সক-নার্সসহ সেবা-সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যেই এক ধরনের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যে রোগীর সংস্পর্শে আসায় সংক্রমণ সন্দেহে মেডিসিন বিভাগের চার জন চিকিত্সককে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code