করোনা ও চীন-মার্কিন সম্পর্ক

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual7 Ad Code

তারেক শামসুর রেহমান: করোনাভাইরাস নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। এ সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কোনদিকে টার্ন নেবে, তা এ মুহূর্তে স্পষ্ট করে বোঝা না গেলেও এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনাভাইরাসের বিষয়টিকে ইস্যু করে আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে চাচ্ছেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘রাশিয়া গেট’ বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার তথাকথিত ‘জড়িত’ ও ‘প্রভাব বিস্তার’ করার অভিযোগ বিগত চার বছরেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

Manual5 Ad Code

এ নিয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। শীর্ষ কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন। চলতি বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন। আর এ নির্বাচনে ট্রাম্পের চীনবিরোধী একাধিক বক্তব্য থেকে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, এবার তিনি টার্গেট করেছেন চীনকে। তার স্পষ্ট অভিযাগ, করোনাভাইরাসটি চীনের উহানে অবস্থিত একটি ল্যাব থেকে ‘লিক’ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যখন চীনবিরোধী একটি বক্তব্য দেন তা গুরুত্ব পায় বৈকি। এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, আর তা হচ্ছে- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি চীনের নাম করে বক্তব্য দিলেও চীনা প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র তথা ট্রাম্পবিরোধী কোনো বক্তব্য দেননি। তবে এটা ঠিক চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বক্তব্য আমরা পেয়েছি, যাতে ট্রাম্পের বক্তব্য খণ্ডন করা হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য স্পষ্ট। তিনি অভিযোগ করেছেন উহানের ল্যাবে এ ভাইরাসটি তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ এ ভাইরাসটি মানবসৃষ্ট একটি ভাইরাস। তার দ্বিতীয় অভিযোগটি হচ্ছে, তার পুনর্নির্বাচিত হওয়া ঠেকাতে চায় চীন। তার মতে, তার পুনর্নির্বাচন ঠেকাতে ‘যা শক্তিতে কুলায়’ বেইজিং তা-ই করতে পারে। তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগটি করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি এ কথাও বলেছেন, চীনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা তিনি ভেবে দেখছেন। এক্ষেত্রে নতুন করে চীনা পণ্যের ওপর শুল্কারোপের দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন।

Manual8 Ad Code

শুধু ট্রাম্প একাই নন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও একই সুরে কথা বলেছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দফতরের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ‘চীন উদ্দেশ্যমূলকভাবে মহামারীর ভয়াবহতা গোপন করেছে।’ ওই প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জানানোর আগেই চীন চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করেছে। নিজেদের বিশাল কর্মীবাহিনী থাকায় চীন সহজেই ওইসব কাঁচামাল কাজে লাগিয়ে মাস্ক, পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্ট, গ্লাভসসহ সব পণ্য তৈরি করে নিতে পারবে। ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই পম্পেও বলেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করার দায়ে চীনের শাস্তি হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়ে পম্পেও বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। যারা দায়ী, তাদের আমরা জবাবদিহি করতে বাধ্য করব এবং আমাদের সময়মতোই আমরা সেটা করব।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা পম্পেওর বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, করোনাভাইরাসটি চীনে তৈরি এবং মানবসৃষ্ট একটি ভাইরাস। চীন এ তথ্যটি গোপন করেছে এবং চীনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে পুনর্নির্বাচিত হতে না দেয়া। প্রকারান্তরে ট্রাম্প প্রশাসন এটাই বলতে চাচ্ছে, চীন চায় একজন ডেমোক্র্যাট জো বাইডেনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের অভিযোগের আদৌ কোনো ভিত্তি আছে কি? সত্যি সত্যিই উহানের ল্যাবে এটি তৈরি হয়েছিল কিনা? নাকি এটা চীনের বিরুদ্ধে এক ধরনের ষড়যন্ত্র?

Manual4 Ad Code

এর জবাব দেয়ার আগে আমরা আরও কিছু বক্তব্য শুনব। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস মানবসৃষ্ট নয়। অথবা জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়নি বলে বিজ্ঞানীরা যে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন, তাতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাও একমত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি জেনেভায় বলেছে চীনের ল্যাবে ভাইরাস তৈরি হয়েছে বলে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো ‘প্রমাণ’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে পাঠানো হয়নি। সংস্থাটির ইমারজেন্সি ডাইরেক্টর ডা. মাইকেল জে রায়ানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুমাননির্ভর। সংস্থার টেকনিক্যাল লিডের মতে, সব প্রমাণ বলছে ভাইরাসটির উৎপত্তি প্রকৃতিতে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও ব্রিটেনের গোয়েন্দাদের জোট ‘ফাইভ আইস’-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ল্যাব তত্ত্ব শুধু কিছু সংবাদমাধ্যমেই এসেছে। বাস্তবে এর প্রমাণ নেই। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে এ তথ্যটি জানা গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্থনি ফুচি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত। তিনি আরও বলেছেন, এটি যে চীনের ল্যাবে তৈরি হয়েছে, এর কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ঠড়ী নিউজ ম্যাগাজিন এ সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ২৯ এপ্রিল। এটি লিখেছেন এলিজা বারক্লে (Eliza Barclay)। তার প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘Why these

scientists still doubt the coronavirus leaked from a chinese lab’. প্রতিবেদনে তিনি বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর মতামত নিয়েছেন, যাদের কেউ কেউ উহানের বিতর্কিত ওই প্রতিষ্ঠানে (Wuhan Institute of virology) কাজ করেছেন। প্রতিবেদনে নিউইয়র্কের কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যাঞ্জেলা রাসমুসসেনের (Angela Rasmus

sen) একটি উদ্ধৃতিও আছে, যেখানে তিনি ল্যাব থেকে এটি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেছেন। তার মতে, This virus came

Manual8 Ad Code

from bats under unknown ‘circumstances’- বাদুড় থেকে এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে। এ যুক্তিও কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কেননা উহানে যখন প্রথম এটি ধরা পড়ে (৩১ ডিসেম্বর ২০১৯), তারপর এটি ছড়িয়ে পড়ে ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে। কেপভার্দে, সাদ, টোগো কিংবা বারবাডোজের মতো দেশ ও অঞ্চলেও এটি ছড়িয়ে পড়েছিল। উহান ল্যাব থেকে ছড়িয়ে পড়লে টোগো বা বারবাডোজের মতো দেশে এত তাড়াতাড়ি এটি ছড়িয়ে যেত না। সুতরাং ‘ল্যাব থিউরি’ যুক্তিযুক্ত নয়। Vox-এর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ জেনারেল মার্ক মিলিই’র একটি বক্তব্য আছে। তার বক্তব্য- ‘It’s

inconclusive, although the weight of evidence seems to indicate natural.’ প্রকৃতি থেকেই উৎপত্তি- এমন কথাও জানাতে চেয়েছেন তিনি। নিউজউইক ম্যাগাজিন ২৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট (জানুয়ারি) উল্লেখ করে তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, ‘Judged that the outbreak probably occurred naturally’- অর্থাৎ প্রকৃতিতেই জন্ম। যদিও গোয়েন্দা সংস্থা তাদের রিপোর্টে কিছু পরিবর্তন এনে ‘accidentally due to unsafe laboratory practices’ শব্দটি পরে ব্যবহার করে। দুর্ঘটনাক্রমে এটি হয়ে থাকতে পারে- তাদের শেষ অভিযোগ ছিল এমনই। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ও National Emerging Infectious Diseases Laboratories-এর প্রধান অধ্যাপক গেরাল্ড কেউচও বলেছেন, উহান ল্যাবটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। এখান থেকে ভাইরাসটি ‘লিক’ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ধরনের অনেক প্রতিবেদন ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রমাণ করে করোনাভাইরাসটি (কোভিড-১৯) উহান ল্যাবে তৈরি হয়নি, কিংবা উহান ল্যাব থেকে ‘লিক’ হয়নি। আরও দুটি তথ্য দিই। উহানে করোনাভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আগেই ১৬ নভেম্বর (২০১৯) পূর্ব ফ্রান্সের Albert Schweitzen হাসপাতালে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে (CGTN, ৮ মে)। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Center for Research on Coronavirus and other Emerging

Pathogens-এর সহ-পরিচালক ফ্রেডেরিক ডি. বুসম্যানও (Frederic D. Bushman) মনে করেন, ‘Covid-19 is not an

engineered weapon’ (CGTN, ৮ মে)। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে এতসব জেনেও ট্রাম্প কেন চীনের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন? এর মূল কারণ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া। এটা প্রমাণিত, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা চরমভাবে ব্যর্থ। প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন বেকার হয়ে পড়েছেন (৩৩.৫ মিলিয়ন)। আর নোয়াম চমস্কির মতে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে! মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসেও যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সুতরাং ‘চীনা ভাইরাস’-এর বক্তব্য দিয়ে ট্রাম্প সবার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন মাত্র।

ড. তারেক শামসুর রেহমান : প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code