করোনা পরবর্তী পৃথিবী কেমন হবে?

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual3 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট, ঢাকা: সবকিছু কি আগের মতো থাকবে? নাকি পুরোপুরি বদলে যাবে? আমাদের সামাজিকতা, পারিপার্শ্বিকতা, আচরণ, ব্যবহার, সম্পর্কের ধরন কেমন হবে? এই বিষয়ে অনেক তাত্ত্বিক গবেষণা হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক তথ্যচিত্র। তবে আমি আলোচনা করব আমার, আপনার মতো সাধারণ মানুষদের ভাষায় সেই দিনগুলো কেমন হতে পারে তার একটি ভাষাকল্প।

Manual5 Ad Code

হাত মেলানো, কোলাকুলি:
কল্পনায় গিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে ভাবুনতো কয়েক মাস পরের কথা। করোনাভাইরাসের প্রকোপ শেষ হলেও আপনি কি আর স্বাভাবিকভাবে আগের মতো করে কারো সাথে হাত মেলানো কিংবা কোলাকুলি করতে পারবেন?
পাল্টে যাবে দেখা করার গল্পও:
গত দশ বছর ধরেই সীমিত আকারে অনলাইন কনফারেন্স কল চলছে বাংলাদেশে। যাতায়াতের খরচ, ভিসা প্রাপ্তির সমস্যার কথা চিন্তা করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনলাইনে কাজ করিয়ে নেয়ার নানা উপায় বের করে নিয়েছেন। বাংলাদেশেও সেসবের ব্যবহার হচ্ছে বেশ। অফিসের সহকর্মীদের মধ্যে দ্রুত আলোচনা সেরে নেয়ার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ, বন্ধুদের সাথে ঈদে ঘোরাঘুরির ছক ঠিক করার জন্য ভাইবারে আড্ডা, সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অফিসের সহকর্মীদের সাথে মিটিং করার জন্য স্কাইপ কিংবা জুমের ব্যবহার ইত্যাদি শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। তবে সেটা খুব বড় আকারে না। অনেক আলোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দেখা সাক্ষাতের মাধ্যমে হয়ে আসছে।
অফিসের সময়ঘণ্টা পাল্টে যাবে
সপ্তাহে ৬ দিন, সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা অফিস- দেশ ও জাতির জন্য কতটা জরুরী? ১৯৯৬ সালের যখন বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি ১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২ দিন করার আলোচনা শুরু হয়েছিল, তখন চারিদিকে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। আলোচক-সমালোচকদের মুখে তখন বাংলাদেশ গরীব দেশ, সম্ভব হলে প্রতিদিনই কাজ করা দরকার, এমন সব আলাপ শুনেছি বহুবার। শুনে আসছি- অফিসে নির্ধারিত সময়ের পর যারা যতক্ষণ বেশী থাকেন, তাদের মূল্যায়ন তত বেশী। পরিবারকে সময় দেবার চাইতে সময়টুকু অফিসকে দেয়া যেন আমাদের সমাজে পারফরমেন্স ইন্ডিকেটর।
কমে আসবে অস্ত্রের ঝনঝনানি:
দেশপ্রেমের জন্য সীমান্তে যুদ্ধ করাই একমাত্র উপায় নয়, অস্ত্রের চাইতে স্টেথোস্কোপ ভালো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সারাবিশ্বে অস্ত্রের যে ঝনঝনানি, সীমান্তে সীমান্তে মানুষ হত্যার ধ্বংসযজ্ঞ- তার বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীর মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। করোনা-উত্তর পৃথিবীতে এই প্রতিবাদ আরও উত্তাল হবে। খাবার, ওষুধ না কিনে সরকারের অস্ত্র কেনার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আরও প্রতিবাদী হবে জনগন। জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসাবিদ্যায় অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে যুদ্ধাস্ত্র, সামরিক যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে সরকার তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে।
নারীনেতৃত্বই হবে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ:
হাজার বছর ধরে চলে আসা পুরুষ নেতৃত্বের জায়গা ছেড়ে দেবার সময় এসেছে বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। গত কয়েক দশক ধরেই আমরা দেখে আসছি, নারী- নেতা হিসেবে ভালো, ধীরস্থির, অবিচল-কঠিন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা, সারাবিশ্বের পররাষ্ট্রনীতিতে হিলারি ক্লিনটনের দাপট, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে জার্মানির চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেলের দৃঢ়তা, ভারতের স্থানীয় রাজনীতিতে মমতা ব্যানার্জির সাহসিকতা, সন্ত্রাস ও মৌলবাদ দমনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নিউ জিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জ্যাসিন্ডা আরডার্নের অবিচল অবস্থান মানুষকে সাহস জুগিয়েছে।
একক আধিপত্য হারাবে যুক্তরাষ্ট্র:
পৃথিবীতে বড় বড় নানা ঘটনার পর পরাশক্তির যে হিসেব-নিকেশ হয় তাতে বড় ধরণের পরিবর্তন হয়। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯২০ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর পর বিশ্বক্ষমতার মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ১৯১৪ সালের আগের অপরাজেয় ক্ষমতাধর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, ফ্রান্স সাম্রাজ্য তাদের আধিপত্য কিছুটা বজায় রাখতে পারলেও জার্মান , অষ্ট্রিয়া-হাংগেরি সাম্রাজ্য এবং রুশ সাম্রাজ্য ব্যাপকভাবে তাদের আধিপত্য হারায়। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য, ইটালি, ফ্রান্স একচেটিয়াভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে দীর্ঘদিনের ক্ষমতা হারায়। এরপর স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নও দাপট হারায় আমেরিকার কাছে। গত প্রায় তিন দশক আমেরিকা সেই দাপট ধরে রাখলেও চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হচ্ছে। এবার আমেরিকার একক দাপটে আঘাত হানবে বৈশ্বিক সমষ্টিক শক্তি। করোনা-উত্তর পৃথিবীতে চীন ও রাশিয়া আমেরিকার একক দাপটের অবসান ঘটাবে এবং বিশ্ব অন্তত নিকট ভবিষ্যতের জন্য সুপার পাওয়ার কনসেপ্ট থেকে বের হয়ে আসবে বলে মনে হচ্ছে।
ধর্মবিশ্বাস ও চর্চায় আসবে পরিবর্তন:
সব ধর্মেই শান্তির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু গত কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়- শান্তির চেয়ে যুদ্ধে ধর্মের ব্যবহার বেশী। গত কয়েকশ বছরের সবগুলো যুদ্ধের শত্রু-মিত্রও মূলত নির্ণয় হয়েছে ধর্মকে কেন্দ্র করে। গত কয়েক হাজার বছরে একেক শতাব্দী দখলে রেখেছে একেক ধর্মের অনুসারীগণ। ফলশ্রুতিতে ওইসব সময়ে অন্যান্য ধর্মের মানুষ ভয়াবহ অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন।
পারিবারিক দূরত্ব কমবে, জয় হবে ভালোবাসার:
গত কয়েকশ বছর ধরে মানুষ নানা কারণে পারিবারিক কাঠামো থেকে সরে এসে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছিল। বাবা-মার সাথে সন্তানের, নানী-দাদীর সাথে নাতি-নাতনীর, চাচা-মামাদের সাথে ভাগিনা-ভাতিজির দূরত্ব বেড়ে গেছে চোখে পড়ার মতো। মানুষ ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথা বিবেচনা করে বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছিল। জাগতিক সুখ-বিলাসের কারণে মানুষ তাদের আত্মীয়-স্বজনদের থেকে দূরে সরে গেছে অনেকটাই। কয়েকশ বছর আগে পশ্চিমা বিশ্বে শুরু হওয়া এই সংস্কৃতি আস্তে আস্তে খুঁটি গেড়েছে আমাদের উপমহাদেশেও।

Manual1 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code