কলাভৃৎ

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual8 Ad Code

কমলা রঙা রোদ সদর রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বৃহৎ ছাতিম গাছটার মগডাল ছুঁয়ে সবেই অস্ত গেছে। ঠিক তখনই ‘সংবাদ প্রতিদিন’ পত্রিকা অফিস থেকে বের হয়ে সদর রাস্তায় এসে দাঁড়ায় দানিয়েল।

 

তার দৃষ্টি তখন যাত্রীবিহীন ধাবমান যে কোনো একটি রিকশার প্রতি। হঠাৎ করেই প্রাইভেট কারটি বিগড়ে গেল এভাবে! ভাবতেই পারছে না দানিয়েল। ড্রাইভার বেচারা বেশ কয়েকবার স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করল বটে কিন্তু প্রতিবারই গাড়িটা গোঁ গোঁ শব্দ তুলে মৃগী রোগীর মতো কেঁপে কেঁপে থেমে গেল। সে জানে জীবনে নিরবচ্ছিন্ন সুখ বলে কিছু নেই। চলার পথে নানা রকম সুবিধা অসুবিধা অতিক্রম করেই মানুষকে এগোতে হয়। বাঁধা বিপত্তি আছে, থাকবে কিন্তু তাই বলে কী গাড়িটাকে আজই নষ্ট হতে হবে। সময় পেল না আর। নতুন গাড়ি। বছর দুয়েক আগেই কেনা।

Manual5 Ad Code

দানিয়েল ভাবে- ড্রাইভার ব্যাটার কারসাজি নয়তো? ড্রাইভারটি নতুন, মাসখানেক ধরে চালাচ্ছে। স্বভাব চরিত্র যে কেমন? কিছুই জানা নেই তার। বারবার হাতঘড়ি দেখে দানিয়েল। চ্যানেল ফাইভে ঠিক সাতটার রেকর্ডিং। আল্লাহই জানে কী আছে আজ কপালে। ঈষৎ দূরে একটি খালি রিকশা গোচরীভূত হতেই সেটাকে কাছে আসতে ইঙ্গিত করে সে।

রিকশাওয়ালা কাছে এসে দানিয়েলকে উদ্দেশ করে বলল- কোথায় যাবেন ভাই? দানিয়েল অস্ফুট কণ্ঠে বলল- ভাই! চ্যানেল ফাইভে যাব, যাবেন? রিকশাওয়ালার চটপট জবাব- যাব, উঠে বসুন। দরদস্তুর করতে ইচ্ছা করল না দানিয়েলের। কত নেবে জিজ্ঞেস করলেই রিকশাওয়ালা হয়তো এমন ভাড়া হাঁকবে শুনে মাথায় রক্ত উঠে যাবে। টাকার জন্য নয় বরং অন্যায্য দাবির জন্য।

Manual8 Ad Code

মাথায় রক্ত বরং গন্তব্যে পৌঁছে উঠুক। রিকশাওয়ালা তাকে ভাই বলে কেন সম্বোধন করল, বুকের ভেতর খচখচ করতে লাগল দানিয়েলের। বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার সে, প্র্যাকটিস করে সুপ্রিম কোর্টে। সেটা না হয় বাদ থাক। শরীরে তো আর লেখা থাকে না কে জজ আর কে ব্যারিস্টার। রিকশাওয়ালার সেটা জানারও কথা নয়। পোশাক আশাকে সবসময় ধোপাদুরস্ত একজন মানুষ সে, আজ পরেছে অ্যাশ কালারের ওপর হালকা কালো স্ট্রাইপ করা জমকালো একটি স্যুট, স্যুটের পকেটে সুদৃশ্য স্কয়ার। শরীরে মেখেছে ফরাসি এসেন্স।

Manual5 Ad Code

আধ মাইল দূর পর্যন্ত যার সুগন্ধ ভুর ভুর করে ভেসে যায়। তারপরও রিকশাওয়ালার মন ভরল না, স্যারের বদলে ভাই! কেমন যেন এক ধরনের স্নায়বিক অস্বস্তি হতে লাগল দানিয়েলের। যদিও সে একজন সাম্যবাদী মানুষ। কলেজ জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মার্কসবাদ লেলিনবাদ দর্শনে। তখন মনে হতো মার্কসবাদ ও লেলিনবাদেই নিহিত আছে নীপিড়িত মানুষের চূড়ান্ত মুক্তি। পরিণত বয়সে সে দর্শনে অবশ্য চিড় ধরলেও এ জগতের সব মানুষ যে সমান সে বিষয়ে তার বিশ্বাস এখনও হিমালয়ের মতোই উত্তুঙ্গ ও দৃঢ়।

মানুষজন তাকে ভাই বলল না স্যার বলল এসব বিষয় সে একেবারেই গায়ে মাখে না। অন্য সময় হলে এ রকম তুচ্ছ বিষয় হয়তো তার কান অনায়াসে এড়িয়ে যেত। সে নিজেও ব্যক্তিগতভাবে ছোট বড় সবাইকে প্রথমে আপনি করে সম্বোধন করে। কিন্তু আজ তার মেজাজটাই বিগড়ে দিয়েছে সংবাদ প্রতিদিনের সাহিত্য সম্পাদক। দিন চারেক পর পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী । তিন দিনের মধ্যে একটি লেখা লিখে দিতে হবে সে উপলক্ষে।

সম্ভ্রমের সঙ্গে দানিয়েল সাহিত্য সম্পাদককে অনুরোধ করেছিল লেখাটি অন্য কাউকে দিয়ে লেখাতে। কিন্তু মাসুদ মনসুর বিপন্ন কণ্ঠে বলল- ‘যথার্থ লোক পাওয়া যাচ্ছে না ভাই। তা না হলে আপনাকে এমন করে অনুরোধ করতাম না। আপনিই এখন শেষ ভরসা।’ অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হল ঠিকই কিন্তু এখন সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে সে। মাত্র দু’দিনে যে কীভাবে লেখাটা তৈরি করবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। সমস্যা হল ভেবেচিন্তে ছাড়া কোনো লেখাই লিখতে পারে না দানিয়েল। কোনো লেখা শুরুর আগে দু-চার দিন শুধু ব্রেইন স্টোর্মিং করতে হয় তাকে। আধাসেদ্ধ, আধপোড়া লেখা কিছুতেই নিতে চায় না সে পাঠকের পাতে। সে যত কষ্টই হোক তার। এসব চিন্তা করতে গিয়ে দানিয়েলের মনে পড়ল সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর কিছু কথা। তিনি তার এক লেখায় আক্ষেপ করে লিখেছেন- ‘ভাগ্যিস সাহিত্যের বাজারে পুলিশ, হোমগার্ডের দৌরাত্ম্য নেই। তাহলে ভেজাল সাহিত্য পরিবেশনের দায়ে কত লোককে যে জেল খাটতে হতো কে জানে?’

তার অনুভূতিতে সূক্ষ্ম এই আঘাতপ্রাপ্তির ক্ষেত্রটি যেন আগেই তৈরি করে দিয়েছে মাসুদ মনসুর। সে যাক, তবে দানিয়েল কিন্তু খুবই আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ করল রিকশাওয়ালা ছেলেটি কথা বলছে শুদ্ধ বাংলা ও প্রমিত উচ্চারণে। তার কণ্ঠস্বর মার্জিত ও উচ্চারণ স্পষ্ট। শুধু কথাবার্তাতেই নয় ছেলেটির পোশাক পরিচ্ছেদও অন্যান্য রিকশাওয়ালাদের তুলনায় ভিন্ন। বেশিরভাগ রিকশাওয়ালা সাধারণত লুঙ্গি পরে রিকশা চালায়। কিন্তু এ ছেলেটি পরেছে খাটো একটি প্যান্ট। হালজামানার ছেলেপুলে যাকে ‘থ্রি কোয়ার্টার’ বলে সে রকম কিছু। ঊর্ধাঙ্গে কুচকুচে কালো রঙের হুডিওয়ালা সোয়েটশার্ট।

হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বলে মাথাটি হুডি দিয়ে ঢাকা। রিকশাওয়ালা রিকশা চালাচ্ছে আস্তে আস্তে। জোরে প্যাডেল চালালে রিকশাওয়ালা বেচারার শীতও কম লাগত সেই সঙ্গে গন্তব্যেও দ্রুত পৌঁছানো যেত। রিকশা চালাতে চালাতে রিকশাওয়ালা দানিয়েলকে জিজ্ঞেস করল- ভাই, আপনি কি সাংবাদিক? দানিয়েল বলল- না, রিকশাওয়ালা ঈষৎ দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল- ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো চাকরি করেন সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকায়।’ দানিয়েল সহাস্যে বলল- ‘আমি সাংবাদিক নই, তবে লেখালেখি করি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।’

দানিয়েল রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল- আপনার কী নাম? দীর্ঘ জ্যামের সারিতে রিকশার গতি স্লথ হতেই মাথাটি ঈষৎ ঘুরিয়ে সন্তর্পণে হুডিটা মাথা থেকে ঘাড়ে ফেলে দানিয়েলকে উদ্দেশ করে রিকশাওয়ালা বলল- ‘আমার নাম সোহরাব।’ দানিয়েল এই প্রথম রিকশাওয়ালার মুখাবয়বটি দেখতে পেল। লম্বাটে ধরনের মুখ। বয়স মেরেকেটে পঁচিশ। এই এক অদ্ভুত বিষয়, মানুষের মুখ না দেখে বয়স আন্দাজ করা বেশ দুষ্কর। চুল ধূসরায়মান ও ঈষৎ বিস্তৃত। মুখের ছাদ তাম্রাভ হলেও দৃষ্টি উজ্জ্বল। বাহ্ বেশ সুন্দর নাম তোমার সোহরাব। অর্থবহ নাম। তোমাকে তুমি করে বললাম, কিছু মনে করো না। তুমি বয়সে আমার অনেক ছোট হবে। কণ্ঠে হাসি ফুটিয়ে সোহরাব বলল- কী যে বলেন ভাই, আমাদের মতো মানুষদের বেশিরভাগ মানুষই তো তুই করে বলে। আপনি তো তবুও শুরুতে আপনি করে বলেছেন। তা ছাড়া বয়সে আমি তো আপনার অনেক ছোটই হব। আমার বয়স এখন বাইশ।

চলার পথে, হাট-বাজারে, ডাক্তার, সেলুন কিংবা অফিসের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে অর্থহীন সংলাপ দানিয়েলের বিশেষ পছন্দ নয়। জনস্রোতের মধ্যেও দানিয়েলের সময় কাটে নিরিবিলি, চিন্তামগ্ন। অধিকাংশ সময়ই তার আপনমনে শব্দহীনভাবে ব্যাপৃত। কিন্তু সোহরাব নামের এ ছেলেটি প্রথম থেকেই আজ তার দৃষ্টি আকর্ষিত করেছে। আচরণে কোথাও জড়তা নেই। নেই এতটুকু আরষ্টতা।

 

Manual7 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code