গাজার হাসপাতালে হামলা নিয়ে ইসরায়েলের দাবি ‘অসংগতিপূর্ণ’

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৩ years ago

Manual7 Ad Code

নিউজ ডেস্ক: গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর গাজা উপত্যকার আল আহলি-আরব হাসপাতালে ভয়াবহ হামলা ও বিস্ফোরণে অন্তত ৫০০ জন নিহত এবং আহত হয়েছে হাজারেরও বেশি মানুষ। এই হামলার জন্য ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ) দায়ী করেছে হামাস এবং মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশ। তবে দায় অস্বীকার করে আইডিএফ বলেছে, সশস্ত্র সংগঠন ইসলামিক জিহাদের একটি রকেট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সেই হাসপাতালে আঘাত করেছিল।

তবে হামলার পেছনে কারা দায়ী তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আল জাজিরাসহ বেশ কয়েকটি সংবাদ সংস্থা ঘটনার ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত করে দেখেছে যে, হাসপাতালে হামলার ব্যাপারে ইসরায়েলের দাবিতে অসংগতি রয়েছে।

যা ঘটেছিল সেদিন:
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিস্ফোরণটি ঘটে। আকাশে একটি উজ্জ্বল আলো দেখা গেছে আল জাজিরার লাইভ ফুটেজে। আকস্মিকভাবে দিক পরিবর্তন ও বিস্ফোরণের আগে আকাশেই দুবার ঝলসে ওঠে এই আলোর উৎস। এরপর কিছুটা দূরে মাটিতে ঘটে বিস্ফোরণ। এর কয়েক সেকেন্ড পর দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে। প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ছিল অনেক বড়।

পরবর্তী সময়ে হাসপাতালের কম্পাউন্ডের ভেতর থেকে পাওয়া ফুটেজ ও ছবিতে গাড়ি পার্কিংয়ে প্রায় দুই ডজন ধ্বংসপ্রাপ্ত গাড়ি দেখা যায়। গাড়ি পার্কিংয়ের পাশেই ছিল ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, যার জানালাগুলো উড়ে গেছে। আর দেয়াল ও মাটিতে লেগে ছিল রক্ত।

ফুটেজে কী প্রমাণ হয়েছে:
আল জাজিরার তদন্তে দেখা গেছে, ফুটেজে থাকা আলোর ঝলকানিগুলোর একটির কারণ হিসেবে যে লক্ষ্যভ্রষ্ট রকেট বিস্ফোরণকে সামনে আনার চেষ্টা করছে ইসরায়েল, তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। সব ফুটেজ পরীক্ষা করে সানাদ জানিয়েছে, রকেট বিস্ফোরণের চেয়ে সেই আলোর ঝলকানির সঙ্গে ইসরায়েলের আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বেশি মিল আছে। তখন গাজা থেকে নিক্ষিপ্ত একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে বাধা দিয়ে সেটিকে মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষের উপস্থাপিত প্রমাণগুলো পরীক্ষা করে একটি ভিডিও বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে চ্যানেল ফোর। সেখানে বলা হয়, মাঝ আকাশে এবং মাটিতে বিস্ফোরণের মধ্যে কোনো সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আল-আহলি হাসপাতালে আঘাত হানা দ্বিতীয় বিস্ফোরণের পেছনে কারা ছিল তা নির্ধারণের জন্য চূড়ান্ত প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনাস্থলে সৃষ্টি হওয়া অপেক্ষাকৃত ছোট গর্তটি ইসরায়েলের অস্ত্রের সাহায্যে হয়েছে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। তবে ভিন্ন ধরনের কামানের ব্যবহার সম্ভাবনাকে একদমই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

Manual8 Ad Code

অনুসন্ধানী সাংবাদিক সংগঠন বেলিংক্যাট সংগৃহীত ফুটেজ এবং ছবি বিশ্লেষণ করেছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণের পর তারা বলেছে যে, গর্তের চারপাশের মাটিতে দাগ এবং অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বেলিংক্যাটের প্রতিবেদন অনুসারে, প্যাক্স প্রোটেকশন অব সিভিলিয়ান দলের সামরিক উপদেষ্টা মার্ক গারলাসকো বলেছেন, ইসরায়েলের ব্যবহৃত জয়েন্ট ডিরেক্ট অ্যাটাক মিউনিশনে (জেডিএএম) ব্যবহৃত ৫০০, ১০০০ বা ২০০০ পাউন্ড বোমার সঙ্গে ইমপ্যাক্ট পয়েন্ট বা গর্তটিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না।

Manual2 Ad Code

চ্যানেল ফোরের সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারাও ছোট ছোট গর্তগুলোর সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র নয় বরং, মর্টার হামলার মিল খুঁজে পেয়েছেন। চ্যানেল ফোর বলছে, এখানে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাবনা কম। তবে এয়ারবার্স্টের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

Manual8 Ad Code

এদিকে গত বুধবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ড্যানিয়েল হ্যাগারির বক্তব্যে অসংগতি খুঁজে পেয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসি। ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিবিসি বলে, ড্যানিয়েল হ্যাগারি বলেছিলেন যে কাছের একটি কবরস্থান থেকে গুলি করা হয়েছিল এবং হাসপাতালের পাশে একটি কবরস্থানও রয়েছে। কিন্তু হ্যাগারির উপস্থাপিত মানচিত্রে গুলিবর্ষণের জায়গাটিকে আরও দূরে দেখা যাচ্ছে। আর সেই মানচিত্রে আমরা কোনো কবরস্থান শনাক্ত করতে পারিনি।

Manual5 Ad Code

বিবিসির মতে, নিখোঁজ আলামতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো। প্রজেক্টাইলগুলোকে প্রায়ই তাদের শেলের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে শনাক্ত করা যায়। প্রজেক্টাইল ছোড়ার স্থানও খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু এবার সেরকম কিছু পাওয়া যায়নি।

ইসরায়েলের বক্তব্যে অসংগতি:
ইসরায়েল দাবি করেছে যে হাসপাতালে আঘাত করা ফিলিস্তিনি রকেটটি ছোড়া হয়েছিল দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে। তবে গত শুক্রবার প্রকাশিত দুটি বিশ্লেষণেই বলা হয়, হাসপাতালে আঘাত করা ক্ষেপণাস্ত্রটি ইসরায়েলের দিক থেকেই নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

লন্ডন ইউনিভার্সিটিভিত্তিক গবেষণা দল ফরেনসিক আর্কিটেকচার ঘটনাস্থলে গর্তের ছবিগুলো পর্যালোচনা করে বলেছে যে, গর্তের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রশ্মিগত বিভাজন বা রেডিয়াল ফ্র্যাগমেন্টেশন বিশ্লেষণ এবং উত্তর-পূর্ব দিকে থেকে গর্তের দিকে তৈরি হওয়া একটি অগভীর চ্যানেল ইঙ্গিত করে যে, ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত উত্তর-পূর্ব দিক থেকেই এসেছিল। আর সেদিকটা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল।

ফরেনসিক আর্কিটেকচার অনুসারে, তদন্তকারী ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ক্রিস কোব-স্মিথও বলেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবিকৃত উৎসের উল্টো দিক থেকে প্রজেক্টাইলটি আসার ইঙ্গিত বেশি মিলছে।

এসব বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলে যায় ইয়ারশট অডিও তদন্তকারী দলের ‘ডপলার ইফেক্ট’ বিশ্লেষণ, যার সাহায্যে দূরত্বের সঙ্গে শব্দ তরঙ্গের সম্পর্ক খুঁজে বের করা হয়। এই বিশ্লেষণ বলেছে, আঘাত করা ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্ভবত উত্তর-পূর্ব, পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে এসেছে। কিন্তু ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর দাবি করা পশ্চিম দিক থেকে নয়।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code