

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) :
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর ১০ টাকা কেজি চাল বিক্রয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার মাওহা ও ২নং গৌরীপুর ইউনিয়নের অনেক উপকারভোগী চার বছরেও জানেনা তারা তালিকাভুক্ত উপকারভোগী। ডিলারের দোকানের সামনে উপকারভোগীদের তালিকা সাঁটানোর ফলে চার বছর পর অনেক হতদরিদ্র জানতে পেরেছে তারা এই কর্মসূচীর তালিকাভুক্ত উপকারভোগী। চার বছর আগে উপকারভোগীদের মাঝে এ কর্মসূচীর কার্ড বিতরণ করা হলেও তাদের নামে যে কার্ড হয়েছে এ বিষয়টি ছিল অনেকের অজানা। অথচ বিগত চার বছরে হতদরিদ্রদের নামে বরাদ্দকৃত চাল মাস্টাররোলে যথারীতি টিপ সই দিয়ে ডিলারের কাছ থেকে উত্তোলন করে নিয়ে গেছে গৌরী সেন! এ যেন শুভঙ্করের ফাঁকি।
এক লিখিত অভিযোগে জানা যায়, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীতে উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের ১৯৪৭জন সুবিধাভোগীর মধ্যে অনেকেই এ সুবিধা পাচ্ছে না। এমনকি অনেক কার্ডধারী জানেই না তারা তালিকাভুক্ত উপকারভোগী। তালিকাভুক্তদের অনেকেই ধনাঢ্য ব্যক্তি, যাদের অনেক আবাদি জমি ও বাড়িতে পাকা ঘর রয়েছে। প্রতি বরাদ্দেই ইউপি চেয়ারম্যান ও ডিলারগণ মিলে কালো বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে।
এ বিষয়ে জানার জন্য মাওহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রমিজ উদ্দিনের মুঠোফোনে ফোন করলে তিনি তা রিসিভ করেননি।
২নং গৌরীপুর ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর ডিলার (৪,৫ও ৬ নং ওয়ার্ড) আরিয়ান ট্রেডার্সের প্রোপাইটর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রুকুনুজ্জামান পল্লবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে। তালিকা টানানোর পর এ এলাকার অর্ধশতাধিক হতদরিদ্র নারী-পুরুষ জানতে পারলেন তারা এ কর্মসূচী তালিকাভুক্ত। এ দুর্নীতির ঘটনা জানাজানি হলে ভুক্তভোগীরা তাদের কার্ড বুঝিয়ে দেয়ার জন্য ওই ডিলারের দোকান ঘরের সামনে ৪দিন ধরে বিক্ষোভ করে আসছে। কিন্তু তাদের কার্ড বুঝিয়ে দিচ্ছে না ডিলার। এ দুর্নীতির ঘটনার বিচার ও উপকারভোগীদের কার্ড উদ্ধারের জন্য শনিবার উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা।
উক্ত ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য মোঃ শহিদুল্লাহ জানান, চাল দেয়ার কথা বলে রুকুনুজ্জামান পল্লব তাঁর কাছ থেকে নিজ ওয়ার্ডের অর্ধশতাধিক হতদরিদ্র মানুষে কার্ড জমা নিয়েছিলেন আরো অনেক আগে। এরপর তিনি আর কার্ডগুলো ফেরত দেননি। মাস্টাররোলে ভূয়া টিপ সই দিয়ে হতদরিদ্রদের নামে বরাদ্দকৃত চাল ডিলার নিজেই উত্তোলন করে কালোবাজারে তা বিক্রি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরিয়ান ট্রেডার্সের প্রোপাইটর রুকুনুজ্জামান পল্লব বলেন, ইউপি সদস্য শহিদুল্লাহ তার কাছে কোন কার্ড জমা দেননি। তালিকাভুক্ত হতদরিদ্রদের মাঝে কার্ড বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব হচ্ছে জনপ্রতিনিধিদের, ডিলারের নয়। ডিলারের কাজ হচ্ছে তালিকাভুক্তদের মাঝে চাল বিক্রি করা।
চার বছর অর্ধশতাধিক হতদরিদ্র মানুষের চাল কে উত্তোলন করেছেন এমন প্রশ্নে জবাবে রুকুনুজ্জামান পল্লব বলেন, চলতি বছর তিনি দোকানে নিজে উপস্থিত থেকে চাল বিতরণ করছেন। এর আগে অন্য লোকদের মাধ্যমে চাল বিতরণ করাতেন তিনি। তাই অনিয়মের বিষয়টি তিনি জানতেন না।
গাভীশিমুল গ্রামের ভুক্তভোগী খোকন, রোজিনা, কল্পনাসহ আরো কয়েকজন জানান, ডিলার রুকুনুজ্জামান পল্লব তাদেরকে চলতি বরাদ্দের চাল দিতে চাইছেন। কিন্তু তারা পুরো চার বছরের চাল না নিয়ে ঘরে ফিরবেন না।
২নং গৌরীপুর ইউনিয়নের মোঃ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানান, সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি মেম্বারদের মাধ্যমে তিনি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর কার্ডগুলো বিতরণ করেছিলেন। ৫নং ওয়াডের্র মানুষ যে কার্ড বুঝে পায়নি এ পর্যন্ত তাকে কেউ জানাননি।
উল্লেখিত ডিলারের তদারকি কর্মকর্তা স্বাস্থ্য সহকারি আব্দুল মালেক জানান, তিনি দু’মাস হয়েছে উল্লেখিত ডিলারের তদারিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান। তাই অনিয়মের বিষয়টি তিনি জানতেন না। তাছাড়া চাল বিতরণের ক্ষেত্রে ডিলার তার সাথে কোন সমন্বয় করতেন না বলে জানান তিনি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেঁজুতি ধর জানান, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীতে স্বচ্ছতা আনতে এ উপজেলার প্রত্যেক ডিলারের ঘরের সামনে তালিকা সাঁটিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে বলা হয়েছে। কার্ড বঞ্চিতদের মাঝে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে চাল বিতরণের জন্য সংশ্লিষ্ট ডিলারকে নির্দেশ হয়েছে বলে জানান তিনি।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সরকার জানান, অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এ ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। ভুক্তভোগীদের মাঝে চাল বিতরণের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।