জনদুর্ভোগ কমাতে ডিজিটাল নামজারি 

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual6 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ 

Manual4 Ad Code

এক বছরে ২২ লাখ আবেদনের ১৯ লাখই নিষ্পত্তি হয়েছে

ভ্রমজনিতকারণে রেকর্ড সংশোধনের ক্ষমতা ভূমি অফিসের

জালিয়াতি বন্ধে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সঙ্গে ভূমি অফিসের অনলাইন সংযোগ

ভূমি মন্ত্রণালয়

ভূমির মালিকানা সহজীকরণ করে দুর্নীতি ও জনদুর্ভোগ কমাতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নেওয়া ডিজিটাল পদ্ধতির সুফল ইতিমধ্যে মিলতে শুরু করেছে। এখন আর জমির নামজারি, খাজনা পরিশোধ ইত্যাদিতে সময়ের অপচয় হয় না; কমেছে দুর্ভোগ আর দুর্নীতিও। ভ্রমজনিত রেকর্ড সংশোধনের ক্ষমতা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) হাতে দেওয়ায় এখন আর মালিকানা ফিরে পেতে বা রেকর্ড সংশোধনের জন্য দেওয়ানি আদালত করতে হচ্ছে না। একের জমি অন্যকে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার ভয়ানক জালিয়াতি বন্ধেও নেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল ব্যবস্হা। তবে জনসাধারণের মধ্যে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে জানাজানি না থাকায় সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির দালাল। তারা নাম পত্তনের আবেদন অনলাইনে পাঠানোসহ অন্যান্য কার্যক্রম করে দেওয়ার নামে কামিয়ে নিচ্ছে দেদার।

এ প্রসঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, যে কোনো সংস্কারকাজে কিছু অসংগতি থাকতে পারে। মানুষও সহজে সংস্কার মানতে চান না। তবে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে কীভাবে জানানো যায়, সে বিষয়ে শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ব্যবহার করে স্বল্প খরচে নামজারি, খাজনা পরিশোধসহ ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা মানুষ যাতে পায়, সেটি নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, ভূমির ডাটা ব্যাংক করা হচ্ছে। মৌজাওয়ারি কোন জমি কী নামে ছিল, এখন কী নামে আছে, কোনটা সরকারি, কোনটা বেসরকারি, কোনটা উপাসনালয়—সব বিস্তারিত থাকবে ভূমি ডাটা ব্যাংকে।

আরো দক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ভূমিসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেবাদান প্রক্রিয়া অধিকতর সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এজন্য জনবান্ধব ভূমিসেবা প্রদানে ভূমি অফিসগুলোর জবাবদিহি আরো বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, ভূমিসেবা অটোমেশন সিস্টেমের জন্য কার্যকর তথ্যব্যবস্হা তৈরি করা হবে। দুই শতাধিক বিভিন্ন ধরনের ভূমিসেবা পর্যালোচনা করে একই রকম ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে আলাদা তালিকাভুক্ত সেবা বাতিল এবং প্রয়োজনীয় নতুন সেবা অন্তর্ভুক্ত করে গুচ্ছ (ক্লাস্টার) ও শ্রেণিভিত্তিক (গ্রুপ) একটি কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ ভূমিসেবা তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। ভূমির মালিকানা প্রতিষ্ঠায় নামজারির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘদিন ধরে এই খাত দুর্নীতি-অনিয়মে ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। জনহয়রানিসহ নামজারির প্রক্রিয়া নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগের কমতি ছিল না। সামান্য ভুলে বা কর্মকর্তাদের ইচ্ছাকৃত একের জমি অন্যের নামে রেকর্ড করে দেওয়ায় তা আদালত পর্যন্ত গড়াত।

হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টেও প্রতিকার পেতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পার হয়ে যায়। ভূমি মন্ত্রণালয় ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে প্রক্রিয়াধীন আবেদনসহ মোট ৫৫ লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৪টি ই-নামজারি আবেদন পেয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৪ লাখ ১৪ হাজার ৩১৯টি আবেদনের। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ২২ লাখ ই-নামজারির আবেদনের মধ্যে ১৯ লাখের নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ২২ লাখ নামজারির আবেদন করা হয়। ই-নামজারির ক্ষেত্রে ব্যক্তি আবেদনে বা এলটি নোটিশ পাওয়ার পর সাধারণ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৮ কার্যদিবস, প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক হলে মহানগরীর জন্য ৯ কার্যদিবস ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ১২ কার্যদিবস এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলার বিনিয়োগবান্ধব শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাত দিনের মধ্যে নামজারি সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া সাধারণ ক্ষেত্রে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জমির নামজারি সেবা পাচ্ছেন। ক্রয়, উত্তরাধিকার বা যে কোনো সূত্রে জমির মালিক হলে নতুন মালিকের নাম সরকারি খতিয়ানভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বলা হয়। ভূমি জরিপকালে ভূমি মালিকের মালিকানা নিয়ে যে বিবরণ প্রস্তুত করা হয়, সেটাই খতিয়ান।

Manual2 Ad Code

ভূমি মন্ত্রণালয় জানায়, ই-নামজারিসহ অন্যান্য সব ভূমিসেবার ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর একটি অংশ। ই-নামজারি কার্যক্রম ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সাতটি উপজেলায় পাইলট আকারে শুরু হয়েছিল। ভূমিসেবা সহজ করতে ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় ভূমি ব্যবস্হাপনায় চলমান উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করা হয়। ঐ সভায় পাইলট আকারে গৃহীত ই-নামজারি সিস্টেমটি পর্যবেক্ষণ করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ দ্রুত সারা দেশে ই-নামজারি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ভূমি সংস্কার বোর্ড উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে হার্ডওয়্যার সরবরাহসহ কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করে এবং এটুআই প্রশিক্ষক-প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারকারী প্রশিক্ষণে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। পরে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে সারা দেশে একযোগে শতভাগ ই-নামজারি বাস্তবায়ন শুরু হয়। এখন তিনটি পার্বত্য জেলা ছাড়া উপজেলা ভূমি ও সার্কেল অফিসে এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ই-নামজারি চালু রয়েছে। মুজিব শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে নামজারির ম্যানুয়াল আবেদন গ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে।

আইসিটি বিভাগ এবং এটুআই প্রকল্পের সার্বিক সহায়তায় ভূমি সংস্কার বোর্ডের মাধ্যমে অন্যান্য ভূমিসেবা ডিজিটালাইজেশনের সঙ্গে ই-নামজারিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নামজারি আরো সহজ করতে দলিল মূলে নামজারি ও অনলাইনে নামজারি ফি প্রদানের ব্যবস্হা করা হচ্ছে। ভূমি সচিব জানান জমির মালিককে ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিপ্ট) কাটার টাকা জমা দিতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যেতে হবে না। জালিয়াতি ঠেকাতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সঙ্গে ভূমি অফিসের অনলাইন সংযোগ দ্রুত কার্যকর করা হবে। এর ফলে বিক্রেতার দলিল দাখিলেও সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জমির বিষয়ে শুরু থেকে সর্বশেষ তথ্য দেখতে পারবেন। সন্দেহ হলে তিনি আর রেজিস্ট্রেশন করবেন না। ফলে ভূমি অফিসের ওপর চাপ কমবে আর জালিয়াতিও বন্ধ হবে বলে মন্ত্রণালয় আশা করছে।

কিছু ভিন্ন চিত্র:ডিজিটালাইস করা হলেও ক্ষেত্রবিশেষে দুর্নীতি-অনিয়মের চিত্র কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে। জমির মালিকদের অধিকাংশই ‘অন-লাইন সার্ভিস’র সঙ্গে পরিচিত নন। তাদের টাচ মোবাইল কিংবা কম্পিউটার-ল্যাপটপ নেই। অধিকাংশই ইন্টারনেট চালাতে পারেন না। এ অবস্হায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ‘ই-নামজারি’। এ জন্য জমির মালিকদের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে এসিল্যান্ড কিংবা ভূমি অফিসসংলগ্ন আইটি সেন্টারে। প্রায় সব এসিল্যান্ড ও ভূমি অফিস ঘিরে গড়ে উঠেছে আইটি সেন্টার। সেখানে একটি নামজারির ই-ফাইলিংয়ে খরচ যাচ্ছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। নামজারির ই-ফাইলিং শেষে জমির সর্বশেষ দলিল, খাজনা রসিদ, ডিসিআর, ভায়া দলিল ও আনুষঙ্গিক রেকর্ডপত্রের হার্ড কপিও সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ড অফিসে জমা দিতে হচ্ছে। ‘ই-নামজারি’র কারণে অতিরিক্ত ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ বেড়েছে। অনেক এসিল্যান্ড অফিসে নামজারি আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছে সপ্তাহের নির্ধারিত এক বা দুই দিন। সপ্তাহের কোন কোন বারে আবেদন জমা নেওয়া হবে, অধিকাংশ ভূমি মালিকই সেটি জানেন না। ফলে শুধু আবেদন জমা দিতেই ভুক্তভোগীদের একাধিকবার এসিল্যান্ড অফিসে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

Manual2 Ad Code

হয়রানি এড়াতে অনেকে দালালের মাধ্যমে আবেদন জমা দিচ্ছেন। ই-ফাইলিংয়ের পর মোবাইলে পরপর কয়েকটি এসএমএস আসে। প্রথম এসএমএস-এ বলা হয়, ‘আপনার নামজারি এর আবেদন (নং–) ওটিপি (–) কোর্ট ফি ২০ টাকা অফিস ই-ক্যাশ এ জমা দিন। কোর্ট ফি পরিশোধ না করলে আবেদন গ্রহণ হবে না।’ দ্বিতীয় এসএমএস-এ বলা হয়, নামজারি আবেদন (নং–) এর কেস (নং–) ধার্য করা হলো।’ তৃতীয় এসএমএস-এ বলা হয়, ‘সেবা : ই-নামজারি আবেদন (নং–) কেস (নং–) অবস্হা: তদন্েতর জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসে প্রেরণ করা হয়েছে। রসিদের নির্দেশনা এবং ই-ফাইলিংয়ের এসএমএস অনুযায়ী জমির মালিক সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন কিংবা পৌর ভূমি অফিসে ছুটে যান। কিন্তু গিয়ে দেখেন এসিল্যান্ড অফিস বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে নামজারির কোনো আবেদন ভূমি-সহকারী কর্মকর্তার (তহশিলদার) কাছে আসেনি। তহশিলদার পরে যোগাযোগ করার জন্য আবেদনকারীকে জানিয়ে দেন। ভূমি মন্ত্রণালয় জানায়, ৭৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশে ৫০০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও ১৩৮টি উপজেলা ভূমি অফিস ভবন নির্মাণ হচ্ছে। আরেকটি প্রকল্পের আওতায় ৭৪৭ কোটি টাকা খরচে ১৩৯টি উপজেলা ভূমি অফিস নির্মাণ হচ্ছে। এসব প্রকল্পের আওতায় এর মধ্যেই তহশিল অফিসের নিজস্ব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভোগান্িতমুক্ত দ্রুত ভূমিসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ভূমি অফিসগুলো ডিজিটালাইজ করা হয়েছে।

Manual7 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code