জনসেবায় আলেমরাই এগিয়ে

লেখক:
প্রকাশ: ৪ years ago

Manual4 Ad Code

আল্লামা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া :: সমাজসেবা ও জনসেবায় আলেমদের সরব অংশগ্রহণ সবসময়ই ছিল। কিন্তু আলেমরা সেসব প্রচার করেন না এবং নিভৃতে তাদের জনসেবামূলক কাজ চালিয়ে যান। ফলে তাদের জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের বেশির ভাগই আড়ালে থেকে যায়। তবে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে তাদের অক্লান্ত জনহিতৈষীমূলক কাজকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারছে সবাই।

বিশেষ করে ভয়াবহ করোনা মহামারীর সময় চিকিৎসকদের বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণাকালে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশের মুখ দেখতেও কেউ কাছে আসছিলেন না। এমনকি মৃতের স্বজনরাও ভয়ে লাশের কাছে যেতে চাচ্ছিল না। এতে গুরুতর এক মানবিক সঙ্কট দেখা দেয়। তখন মানবিক স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেসব মৃত লাশগুলোর দাফন-কাফনে সবার আগে এগিয়ে আসে দেশের আলেম সমাজ। ওই সময় তারা এগিয়ে না এলে করোনাকালীন সময়টা আরো বীভৎস হতে পারত।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কন্টেইনার ডিপোর ভয়াবহ বিস্ফোরণে অনেকে নিহত হন। নিহতদের অনেকের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। পোড়া ছিন্নভিন্ন অংশগুলো খুঁজে এনে জোড়া দিয়ে সেসব লাশের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে যথারীতি এগিয়ে আসে স্বেচ্ছাসেবী আলেমরা।

Manual5 Ad Code

সর্বশেষ সিলেটের ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়া অসহায়, নিঃস্ব ও অভুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের সহায়তায় সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে দেশের উলামায়ে কেরাম। এজন্য আলেমসমাজ দেশব্যাপী বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে।

দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা থেকেও ১১টি নৌকাসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে বন্যাগ্রস্ত সিলেটে। এ ছাড়া হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আল মুঈন ত্রাণ তহবিল, আল মানাহিল ফাউন্ডেশন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) সেবা সংস্থা থেকে শুরু করে আলেমদের অসংখ্য সেবামূলক সংগঠন সিলেট অঞ্চলের বন্যার্তদের সহায়তায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

আলেমদের তৎপরতায় অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজের অন্যান্য শ্রেণির মানুষও বন্যাগ্রস্তদের পাশে এসে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। ঠিক যখন ১১৬ জন প্রসিদ্ধ আলেমের আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবিতে কথিত গণকমিশন দুদকে শ্বেতপত্র জমা দিয়ে মিডিয়ায় হৈ চৈ ফেলে দিল, ঠিক তখনই সিলেটের বন্যার্তদের সহায়তায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কারণে দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, আস্থা ও প্রশংসায় ভেসেছে আলেমসমাজ।

দারুল উলূম হাটহাজারী কর্তৃক পরিচালিত আল-মুঈন ত্রাণ তহবিলসহ আলেমদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিভিন্ন সেবামূলক সংগঠন প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার জনসেবামূলক কাজ করে আসছে। তারা প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে শত শত মসজিদ-মাদরাসা-মক্তব, নলকূপ, টয়লেট ইত্যাদি স্থাপন করেছে। বছরজুড়ে তারা প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে খাবার ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে থাকে। প্রতি বছর প্রান্তিক, দুর্গম এলাকায় গরিব-দুস্থদের মাঝে কুরবানির গরুর মাংস বিতরণ করে থাকে।

সুতরাং, আলেমদের মানবসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজের পরিধি সুবিস্তৃত। অথচ এসব কখনো মূলধারার মিডিয়ায় তুলে ধরা হয় না। বরং সমাজে আলেমদের হেয় করার জন্য অধিকাংশ সেকুলার মিডিয়াকে বানোয়াট সংবাদ ও প্রোপাগান্ডা চালাতে তৎপর থাকতে দেখা যায়। এমনকি সিলেটের বন্যার্তদের সহায়তায় আলেমদের অগ্রণী ভূমিকার বিষয়টি মূলধারার মিডিয়া এড়িয়ে গেছে। মাত্র ২০০ বন্যার্তকে খিচুড়ি খাওয়ানোর জন্য একজন ছোট পর্দার অভিনেত্রীকে মিডিয়া-কাভারেজ দেয়া হলেও আলেমদের বিশাল ভূমিকা একটুও তুলে ধরা হয়নি। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সর্বস্তরের মানুষ দুর্যোগকবলিত সিলেটে আলেমদের নিরলস অবদান ও ত্রাণ বিতরণ স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন।

Manual5 Ad Code

যাই হোক, কিছুসংখ্যক মানুষ ভাবনাচিন্তা না করেই আলেমদের নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য করেন। সন্দেহ নেই, মাদরাসা-মসজিদ গড়ে ওঠা এবং সচল থাকার পেছনে আর্থিক চাকা হিসেবে সমাজের বিত্তবানদের ভূমিকা মুখ্য। কিন্তু খুবই স্বল্প ভাতায় আলেমরা এসব মাদরাসা পরিচালনা করতে কতটা মেহনত করেন, ত্যাগ স্বীকার করেন এবং এসব দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য দুনিয়াবি বিলাসিতা পরিহার করে তারা যে নিরন্তর সাধকের জীবনযাপন করেন, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত বলে আমরা মনে করি।

Manual3 Ad Code

অন্য দিকে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে দ্বীনশিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে কওমি মাদরাসাগুলোর অবদান ব্যাপক। বাংলাদেশে কয়টি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এতিমখানা রয়েছে, যেখানে এতিম ও গরিব শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও শিক্ষা লাভের সুযোগ রয়েছে?

অথচ কওমি মাদরাসাগুলোতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সন্তানদের সকলে সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষাগ্রহণ ও আবাসিক হলের সুযোগ পেয়ে থাকেন। পাশাপাশি এতিম ও দুস্থ পরিবারের লাখ লাখ শিক্ষার্থী কওমি মাদ্রাসায় বিনামূল্যে খাবার সুবিধা পেয়ে থাকেন। মাদরাসায় বিত্তবানদের মতোই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও সমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।

দেশে নিরক্ষরতা দূরীকরণে এবং সৎ ও আদর্শবান জাতি গঠনে কওমি মাদরাসার ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। দ্বীনশিক্ষার প্রসার অব্যাহত থাকার কারণেই নানা সংকটের মধ্যেও আমাদের সামাজিক স্থিতিশীলতা, পারিবারিক বন্ধন এবং নীতিনৈতিকতা ও মানবিকতাবোধ এখনো টিকে আছে।

লেখক : মহাপরিচালক, জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

Manual7 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code