প্রতিনিয়ত সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলছে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা। ধারাবাহিক জীবনযাত্রার মান আরও সহজ করতে প্রযুক্তির নিরলস চেষ্টায় বিশ্ব দেখছে নতুন চমক। সমগ্র পৃথিবীতে ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে জনসংখ্যা। আর সেই সঙ্গে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে রয়েছে পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার। জ্বালানি সংকটে ইতোমধ্যেই ভুগছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। আর তখনই ইলেকট্রিক গাড়ির ধারণা নিয়ে বিশ্বের সামনে নতুন এক মোড়ক উন্মোচন করে ইলেকট্রিক গাড়ির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘টেসলা’।
টেসলা বিশ্বের অন্যতম একটি ইলেকট্রিক গাড়ির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো গ্রাহকদের হাতের নাগালের মধ্যে দাম সীমাবদ্ধ রেখে সবার জন্য ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবস্থা করে পরিবেশ দূষণ রোধ করা। টেসলা কোম্পানির ফাউন্ডার এলন মাস্ক নন, ফাউন্ডার হিসাবে ছিলেন মার্টিন এবারহার্ড, মার্ক টারপেনিং। তবে, এলন মাস্ক কোম্পানিতে নিজের অবস্থান পাকা করে নেন তার উচ্চমানের আইডিয়ার কারণে। এলন মাস্কের আইডিয়া অনুসরণ করেই টেসলা কোম্পানি আজ মাল্টি বিলিয়নিয়ার কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এলন মাস্ক যখন টেসলা কোম্পানিতে আসেন তখন কোম্পানি ভরাডুবি অবস্থায় ছিলো, তিনি কোম্পানির বাজে প্ল্যান থেকে তখনকার সিইও’কে বহিষ্কার করে দেন এবং নিজেই সিইও পদে চলে আসেন। তার আইডিয়া অনুসরণ করেই টেসলা কোম্পানিটি হাজারপতি কোম্পানি থেকে কোটিপতি কোম্পানিতে এসে দাঁড়িয়েছে আজ। ২০১৩ সালের শুরু দিকে টেসলা কোম্পানিটি প্রায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। তখন এলন মাস্ক গুগলের কাছে প্রায় অল্পের জন্য বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি কোম্পানিতে সর্বশেষ প্রচেষ্টা চালিয়ে প্রায় চমকপ্রদ লাভজনক অবস্থায় নিয়ে আসেন।
টেসলা কোম্পানির নামকরণটি সায়বেরিয়ান ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং পদার্থবিদ ‘নিকোলা টেসলা’ এর নাম থেকে অনুকরণ করা হয়েছে। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরাঞ্চলের সিলিকন ভ্যালি থেকে টেসলা’ই সর্বপ্রথম গাড়ি মেনুফ্যাকচার কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে উক্ত অঞ্চলের জন্য গাড়ি তৈরির সুনাম বয়ে এনেছে টেসলা কোম্পানি। কোম্পানির মডেল-এস গাড়িটি ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের বিশ্বের বেস্ট-সেলিং প্লাগ-ইন ইলেকট্রিক গাড়ি হিসেবে রেকর্ড বুকে স্থান করে নিয়েছে। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত কোম্পানিটি তাদের ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ইলেকট্রিক গাড়ি বিক্রি করতে সক্ষম হয়। টেসলা মডেল-এস গাড়িটি বিশ্বের সর্বপ্রথম ইলেকট্রিক গাড়ি হিসেবে ২০১২ সালে আত্মপ্রকাশ করে। গাড়িতে প্রায় ৭ জন যাত্রী বসতে পারবে এবং গাড়িটি ১০০% ইলেকট্রিক গাড়ি। গাড়িটি ০ থেকে ৬০ মাইলস গতিতে মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে যেতে পারে, এছাড়াও গাড়িতে রয়েছে ছোট্ট একটি এআই সিস্টেম যেটি গাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সর্বদা মনিটরিং করে থাকে।
এর পরেই কোম্পানির নতুন গাড়ি টেসলা মডেল-২০১৭ সালের ৩ জুলাই প্রথম বাজারে আসে। সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সালের মধ্যেই কোম্পানিটি প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ইলেকট্রিক গাড়ি বিক্রির মাইলফলক অর্জন করে ফেলে। ইলেক্ট্রনিক গাড়ি ছাড়াও টেসলা কোম্পানি টেসলা পাওয়ার ওয়াল, পাওয়ার প্যাক ব্যাটারিজ, সোলার প্যানেল এবং সোলার রুফ টাইলস উৎপাদন এবং বিক্রি করে থাকে। ২০১৪ সাল থেকে টেসলা কোম্পানির সকল প্রযুক্তিগত পণ্যসমূহকে ওপেন সোর্স হিসেবে মুক্তি দিয়ে দেয়। ফলে, যে কেউ টেসলা কোম্পানির টেকনোলজিগুলো ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়াও আপনার যদি কোনো টেসলা গাড়ি থাকে এবং ভবিষ্যতে গাড়ির সিস্টেমের জন্য কোনো আপগ্রেড আসলে সেটা স্মার্ট আপগ্রেডের মাধ্যমে ঘরে বসেই সেটা আপগ্রেড করা যাবে, যেমনটা আমরা মোবাইল আপগ্রেড করে থাকি। ইলেকট্রিক গাড়ির দুনিয়ায় এই ফিচারটি সর্বপ্রথম টেসলা কোম্পানিই চালু এবং ব্যবহার করা শুরু করেছে।
বর্তমানে টেসলা কোম্পানির সুপার কার হিসেবে টেসলা মডেল-এক্স রয়েছে। গাড়িটির বর্তমান মূল্য রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এসইউভি টাইপের বডিতে এটিকে স্পোর্টস কার হিসেবে বানানো হয়েছে। গাড়িটি মাত্র ৩ দশমিক ২ সেকেন্ডে ০ থেকে ৬০ মাইল গতি তুলতে পারে আর গাড়ির সর্বোচ্চ গতিবেগ হচ্ছে ঘণ্টায় ১৫৫ মাইল। গাড়িতে বায়োওয়েপন মাইন্ড সিস্টেম রয়েছে এবং সম্পূর্ণ গাড়িটি কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এ পর্যন্ত টেসলা কোম্পানির সবথেকে দামী গাড়িটি হচ্ছে তাদের মডেল-এস এর একটি আপগ্রেডেড সংস্করণ। মডেল-এস গাড়িটির মূল ১ লাখ ২৩ হাজার ডলার এবং গাড়িটির এই আপগ্রেডেড সংস্করণে প্রায় ৮২ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যে আপগ্রেডিং করেছে টি স্পোর্টস লাইন। এতে গাড়িটির মূল্য রাখা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৮২০ ডলার। গাড়িতে রয়েছে ২৫ হাজার ডলারের ইন্টেরিওর আপগ্রেড, কার্বন ফাইবার বডি কিট এবং দামী হুইলসেট।
২০১৬ সাল থেকে টেলসা কোম্পানির সকল গাড়িগুলো সেলফ ড্রাইভিং টেকনোলজি সমৃদ্ধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গাড়িগুলোর চারিপাশে ৮টি হাই কোয়ালিটির ক্যামেরা রয়েছে, রয়েছে ১২টি আপগ্রেডেড আল্ট্রাসনিক ডিটেকটিভ মোশন সেন্সর, এছাড়াও অন্ধকারে, বৃষ্টিতে, ধোঁয়া, বালু এবং কুয়াশার মধ্যে দেখার জন্য গাড়িতে রয়েছে একটি ফ্রন্ট ফেসিং রাডার সিস্টেম। গাড়িটির সেলফ ড্রাইভিং টেকনোলজি মানুষের থেকে সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এছাড়াও গাড়িটির একটি ফিচার বর্তমানে বেটা সংস্করণে রয়েছে। এই ফিচারটির মাধ্যমে গাড়ি নিজে নিজেই আপনার কার্যকলাপের উপর নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ধরুন অফিসে যাবেন, গাড়িটি আপনাকে অফিসে পৌঁছে দিয়ে নিজে নিজেই ড্রাইভ করে আপনার বাসায় ফিরে আসবে, আবার অফিস টাইম শেষ হলে নিজে নিজেই আপনাকে অফিস থেকে পিকআপ করে নেবে। এছাড়াও গাড়িটির এই ফিচারের মাধ্যমে টেসলা গাড়িগুলোকে আপনি পার্টটাইম ট্যাক্সি হিসেবেও ব্যবহার করে টাকা উপাজর্ন করতে পারেন।
টেসলা কোম্পানির সর্বপ্রথম মডেল দ্য রোডস্টার’কে এলন মাস্ক একটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রজেক্ট হিসেবে দেখে থাকেন। ২০০৮ সালে টেসলা রোডস্টার গাড়িটি বাজারে মুক্তি পেলেও এটা বাজার মাতাতে পারেনি। তবে, টেসলা কোম্পানির সর্বশেষ গাড়ি মডেল টেসলা মডেল-এসপি১০০ডিহচ্ছে পৃথিবীর সবথেকে উচ্চগতির গাড়ি। গাড়িটি মাত্র ২ দশমিক ২৮ সেকেন্ডে ০ থেকে ৬০ মাইল গতি তুলতে পারে। যা বিশ্বের দামী মডেলের গাড়ি যেমন ল্যাম্বরগিনি, বুগাতির থেকে উচ্চগতির এক্সিলারেশন সম্পন্ন। আর গাড়িটি মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
টেসলা কোম্পানির সুপারচার্জার স্টেশন এখন দুনিয়ার অনেক জায়গাতেই স্থাপন করা হচ্ছে। টেসলা এর ইলেক্ট্রনিক গাড়িগুলো সাধারণ বাসাতে বসেই আপনি চার্জিং করতে পারবেন, কিন্তু লং ড্রাইভ বা দূরে কোথাও ভ্রমণে গেলে মাঝ পথে গাড়ির চার্জের সমস্যা সমাধানের জন্যই কোম্পানিটি বিশ্বব্যাপী তাদের সুপারচার্জার স্টেশনের পরিধি বৃদ্ধি করা শুরু করেছে। কোম্পানির বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে ২০১৭ সালের মধ্যে তাদের সুপারচার্জার স্টেশনের পরিমাণ দ্বিগুণ করা। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ গাড়ি হিসেবে টেসলা মডেল-এক্স রেকর্ডে রয়েছে। ৫ নম্বরের মধ্যে রেকর্ডমুলক ৫.৪ পয়েন্ট নিয়ে কোম্পানির এই মডেলটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ গাড়ি। গাড়িটি বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় যেকোনো দুর্ঘটনায় গাড়িটি বিস্ফোরিত হবে না, এই জন্য গাড়িটি ৫ এর মধ্যে ৫.৪ পয়েন্ট পেয়েছে।
টেসলা কোম্পানির সিইও এলন মাস্ক বর্তমানে বিশ্বের ২য় বৃহৎ ফ্যাক্টরি ‘গিগাফ্যাক্টরি’ নির্মাণ করছেন। কারণ তার স্বপ্ন হচ্ছে তিনি সম্পূর্ণ বিশ্বকে ব্যাটারি এনার্জির আওতায় বা সাসটেইনেবল এনার্জি প্রোডাকশন এন্ড কনজাম্পশনের আওতায় নিয়ে আসতে চান। তার এই স্বপ্নকে পূরণ করতে হলে তার প্রচুর পরিমাণের ব্যাটারির দরকার, যে পরিমাণ ব্যাটারি পুরো বিশ্ব এক বছরে উৎপাদন করতে পারবে না, তাই তিনি নিজেই নিজস্ব ফ্যাক্টরি নির্মাণ করা শুরু করে দিয়েছেন। এই ফ্যাক্টরির নির্মাণ কাজ শেষে প্রতি বছর এমন পরিমাণ ব্যাটারি উৎপাদন করতে সক্ষম হবে, যা পুরো বিশ্বের সকল ফ্যাক্টরির ব্যাটারি উৎপাদন ক্ষমতার থেকে বেশি হবে। থিউরি অনুযায়ী পৃথিবীতে এই রকম আরো ৯৯টি ফ্যাক্টরি থাকলে পুরো দুনিয়া একেবারেই ব্যাটারি এনার্জির উপর নির্ভরশীল হতে পারবে।
এছাড়াও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যাটারি তৈরির ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত বিখ্যাত উদ্যোক্তা এলন মাস্কের গাড়ি, বিদ্যুৎ ও সোলার প্যানেল নির্মাতা কোম্পানি টেসলা। লিথিয়াম আয়ন প্রযুক্তির এই ব্যাটারিটি ১০০ দিনের মধ্যে তৈরি করা হবে। মূলত দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি সংকট মেটাতে এই ব্যাটারি ব্যবহার করা হবে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যে ব্যাটারি রয়েছে, সেটিরও নির্মাতা টেসলা। আগামী ডিসেম্বর মাসে এটি শক্তি উৎপাদনের উপযুক্ত হবে। মাস্ক জানিয়েছেন, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার জন্য যে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি তৈরি করা হবে, সেটির ক্ষমতা থাকবে ১০০ মেগাওয়াট। প্রায় ৩০ হাজার আবাসিক ভবনে এটি প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে।