

ফিচার ডেস্ক: দেশে প্রায় একযুগ আগে সর্বক্ষেত্রে সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার তথা ডিজিটাইজেশন শুরু হয়। এর ফলে সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনে ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। এখন সেবাগ্রহীতারা নিমিষে ব্যাংক, বিমা, শিক্ষা, যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সহায়তা পাচ্ছেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ডিজিটাইজেশনের ছোঁয়া তেমন লাগেনি। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা রেকর্ডরুম। মাত্র দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত এ শাখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত ফাইল আকারে সংরক্ষণ করা আছে। ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদবির একজন কর্মকর্তা ও একজন অফিস সহায়ক দিয়ে এ শাখাটি পরিচালনা করা হয়। এ গুরুত্বপূর্ণ শাখায় তথ্যপ্রযুক্তির সামান্য ছোঁয়াও আজ পর্যন্ত লাগেনি। ৫০ বছর আগের কোনো খ্যাতিমান শিক্ষক সম্পর্কে জানতে গেলে তার পারসোনাল ফাইল খুঁজে হয়রান হতে হয়। শিক্ষক কিংবা গবেষককে নিজেকেই ফাইল খুঁজে বের করতে হয়। সাহায্য করার কেউ নেই। যদিওবা ফাইলটি পাওয়া যায়, দেখা যাবে তার ভেতরে পাতাগুলো জীর্ণশীর্ণ হয়ে গেছে। ফাইলের ওপর ধুলার আস্তর পড়ে আছে। ফলে ফাইলের স্পর্শে গবেষকের পোশাক অপরিষ্কার হয়ে যায়। এসব কারণে বহু শিক্ষক ও গবেষক এ শাখায় কম আসেন। অথচ এ শাখাটি শিক্ষক-গবেষকের উপস্থিতিতে গমগম করার কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক সম্পর্কিত তথ্য সংরক্ষণে যদি দক্ষ জনবল দিয়ে ফাইলের ডেটাবেজ তৈরি করা হতো, তাহলে তা একটি মৌলিক কাজ হতো।
রেজিস্ট্রার অফিসের আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হচ্ছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিস। প্রতিদিন অসংখ্য সাবেক শিক্ষার্থী এ দপ্তরে সার্টিফিকেট ও মার্কশিট তুলতে আসেন। এখান থেকে ফরম নিয়ে পূরণ করে ডিপার্টমেন্ট ও হল অফিস থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে আবার এ দপ্তরে এসে সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য আবেদনপত্র জমা দিয়ে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়। যারা সার্টিফিকেট লেখেন, তারা বড় বড় খাতা বের করে নাম, বিভাগ, শ্রেণি মিলিয়ে দেখে সার্টিফিকেট লিখতে বসেন। শত বছর আগের সার্টিফিকেট হয়তো এখন আর কেউ চাইতে আসেন না, কিন্তু কেউ যদি ৪০-৫০ বছর আগের সার্টিফিকেট চাইতে আসেন, তাহলে কর্মচারীদের মহাবিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কারণ বড় বড় মোটা খাতার পাতায় লেখা রেজাল্ট প্রায় অস্পষ্ট হয়ে গেছে। পাতার রঙ কালচে হয়ে গেছে। কোনো কোনোটিতে পোকা ধরেছে। অথচ দক্ষ জনবল দিয়ে এ দপ্তরের সব সার্টিফিকেট ও মার্কশিট ডিজিটাইজেশন করে সেবাগ্রহীতাকে দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হচ্ছে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়। কিন্তু এ দপ্তরে ডিজিটাইজেশনের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার থেকে কয়টি ভবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে এবং এ পর্যন্ত কয়টি ভবন, বাংলো নতুন নির্মিত হয়েছে এবং হচ্ছে তার তালিকাসহ কত খেলার মাঠ, পুকুর, মসজিদ, মন্দির রয়েছে-তার একটি তালিকার জন্য এ দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরনা দিয়েছি। কিন্তু ওই দপ্তর আমাকে কোনো তালিকা দিতে পারেনি। মোটা খাতা বের করে দেখেছি পাতাগুলোতে লেখা ভবনের নাম ও বরাদ্দের টাকা প্রায় মুছে যেতে বসেছে। কোনো কোনটি নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ সময়মতো ডিজিটাইজেশন করে এসব তথ্য আপডেট করে রাখা যেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি অবহেলিত দপ্তরের নাম জনসংযোগ কার্যালয়। দেশের এ সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, অবসরগ্রহণ, ছাত্র ভর্তি, পরীক্ষার ফল, সিনেট-সিন্ডিকেট সভার কার্যবিবরণীর তথ্য, বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত খবরের পত্র-পত্রিকার কাটিং তথা যাবতীয় বিষয়ের একটি কপি এ দপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া না লাগায় এসব কপি আগের নিয়মেই ফাইলবন্দি করে রাখা হয়। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলো চাইলেই স্ক্যানিং করে রেখে ক্যাটালগ তৈরি করে রাখা যায়। কেউ চাইলেই বোতাম টিপে প্রয়োজনীয় তথ্যটি কয়েক মিনিটের মধ্যে দেওয়া যায়। কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল এবং যন্ত্রপাতির অভাবে এ সহজ কাজটিও আজ পর্যন্ত করা হয়ে ওঠেনি। ইতঃপূর্বে ফাইলের স্তূপ জমে কক্ষ ভরে গেলে একজন পরিচালক হকার ডেকে কয়েক মন ফাইল বিক্রি করে দেন। পরবর্তী পরিচালক তা না করে মূল্যবান ফাইলগুলো রেকর্ড রুমে জমা দিয়ে আসেন। অথচ ডিজিটাইজেশনের সুযোগ থাকলে ফাইলের প্রয়োজন হতো না এবং সেবাগ্রহীতাকেও তথ্য-উপাত্ত পেতে কষ্ট ও হয়রান হতে হতো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসেরও একই অবস্থা। এ পর্যন্ত বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় কতজন ছাত্র-শিক্ষক মারা গেছেন এবং পরীক্ষায় অসাধু উপায় গ্রহণ করতে গিয়ে ও বিভিন্ন অসদাচরণের কারণে কতজন ছাত্র-শিক্ষক বহিষ্কার হয়েছেন, তার কোনো তালিকা রাখা হয়নি।