দারিদ্র্য বিমোচনে ৬ উপায়

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual5 Ad Code

মাওলানা মো. আব্দুল মান্নান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) -এর ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির আলোকে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ২৮ লাখ যা মোট জনসংখ্যার ২০.৫ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী দিনে ১ ডলার ৯০ সেন্ট বা ১৬২ টাকার কম যাদের আয় তারাই দরিদ্র। আমাদের সরকারের হিসেব অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার কমলেও বিবিএসের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে যে হারে দারিদ্র্যের হার কমেছে এখন সেই হারে দারিদ্র্যের হার কমছে না। মহামারী করোনা ভাইরাস উপলক্ষে ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে মানুষ ঘরবন্দি ও কর্মহীন থাকায় এর হার আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারে ঢুকে পড়েছে দারিদ্র্যতা। তারা দৈনন্দিনের ব্যয়ভার বহণ করতে পারছে না। জমি বিক্রি করতে চাইলে ন্যায্য মূল্যে জমিও বিক্রি করা যাচ্ছে না। এদিকে, এ দুর্যোগ মূহুর্তে কোন কোন এলাকায় কয়েক গুণ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল করে বাসায় পাঠানো হয়েছে। ঘর মালিকদের পক্ষ থেকে ঘরভাড়া ও এনজিওসহ দাদন ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধের চাপ দেওয়া হচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারে বিরাজ করছে এক অসহনীয় অবস্থা। এ অবস্থা থেকে মুক্তি চায় মানুষ। কেননা, দারিদ্র্যতা একটি অভিশাপ। এর কারণে মানুষের ঈমান আকীদা নষ্ট হয়ে যায়। পরিবারে ও সমাজে মূল্যায়ণ কমে যায়। পরের উপকার তো দূরের কথা এর কারণে নিজের প্রয়োজনও মেটানো যায় না। এ অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য সরকারকে স্থায়ী পথ বের করতে হবে। তবে দারিদ্র্যতা বিমোচনে ইসলাম কিছু উপায় বলেছে। যা অবলম্বন ও কার্যকর করলে এ অভিশাপ থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ইসলাম দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর বিরুদ্ধে তীব্র অবরোধ আরোপ করেছে। এর জন্য সকল প্রতিরোধ দূর্গ গড়ে তুলেছে। যাতে আকীদা-বিশ্বাসের এবং নৈতিকতা ও আচরণের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যতার হুমকি মোকাবেলা করা যায়। পরিবার ও সমাজ রক্ষা করা যায়। সমাজের স্থিতিশীলতা ও সংহতি রক্ষা করা যায়। সমাজের ভেতরে ভ্রাতৃত্বের চেতনা অক্ষুন্ন রাখা যায়। এ কারণে ইসলাম সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এমনসব মৌলিক উপাদান নিশ্চিত করেছে, যা দিয়ে সে মানুষের মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ জীবন-যাপন করতে পারে, যেখানে কমপক্ষে তার জন্য জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাবার নিশ্চয়তা থাকবে। যেমন খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান, গ্রীষ্ম ও শীত বস্ত্র। এছাড়া তার পেশা সম্পর্কিত সরঞ্জাম এবং বিবাহে ইচ্ছুক ব্যক্তির বিবাহের ব্যয়। মোট কথা, মানুষের জীবনের একটা মান নিশ্চিত হওয়া অত্যাবশ্যক, যা তার অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি তাকে আল্লাহর ফারায়েয বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্যাদি পালনে সাহায্য করবে। জীবনের দায়িত্ব কর্তব্য পালনে সক্ষম করবে। তাকে ক্ষুধা, বাস্তুহীন হওয়া, বিপর্যয় ও বঞ্চনা থেকে রক্ষা করবে। এমনকি ইসলামী সমাজে বসবাসকারী কোন ব্যক্তি অমুসলিম হলেও ক্ষুধার্ত, উলঙ্গ অথবা আশ্রয়বঞ্চিত এবং বিবাহ ও পরিবার গঠন থেকে সে বঞ্চিত অবস্থায় থাকবে তা কাম্য নয়। কেননা, ইসলাম দরিদ্রকে ভালবাসে কিন্তু দারিদ্র্যতা কামনা করে না। এজন্যে দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলাম ৬টি উপায় অবলম্বন করতে বলেছে।
১. শ্রম : শ্রমই দারিদ্র্য বিমোচনে প্রথম হাতিয়ার এবং সম্পদ উপার্জনের প্রধান উপায়। ইসলামের দাবি হলো সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ কাজ করুক। তবে রাষ্ট্রের বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নাগরিককে নির্দিষ্ট কোন কর্মক্ষেত্র গ্রহণ করতে রাষ্ট্র বাধ্য করে না। আবার ব্যক্তি ও সমাজের জন্য বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক ক্ষতিকর কর্ম ছাড়া অন্যকোন কাজে ইসলাম বাধার সৃষ্টি করে না। শ্রম তার কর্মীকে পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করে । যা তাকে তার মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম করে। শ্রমের মাধ্যমে পর্যাপ্ত অর্থ উপার্জন করে শ্রমিক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হতে পারে। কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক কাজ-কর্ম ছেড়ে দেয় আল্লাহ তা’য়ালার আনুগত্য এবং তাঁর পূর্ণ ইবাদতে নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার অজুহাতে। যেহেতু সূরা যারিয়াতের ৫৬ নং আয়াতে আছে, ‘এবং আমি জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি, তারা কেবল আমার ইবাদত করবে এই উদ্দেশ্যে।’ এই আয়াতের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে না পেরে তারা বলে, মানুষ তার রবের ইবাদত থেকে বিমুখ হয়ে নিজের জীবিকার জন্য কাজ করবে তা জায়েজ নয়। রাসূলে কারীম (সা.) এদের উদ্দেশ্যেই বলেছেন যে, ইসলামে কোন বৈরাগ্য নেই। দুনিয়াবি কাজকর্ম যখন বিশুদ্ধ নিয়তে ইসলামের বিধি বিধান অনুসরণ করে দক্ষতার সাথে করা হয় তখন তা ইবাদত বলে বিবেচিত হয়। কাজ ও পরিশ্রম থেকে বিমুখ হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা ইসলাম সমর্থন করে না। তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ শরীফে আছে, এক বেদুঈন তার উটকে বিচরণ অবস্থায় রেখে আল্লাহর উপর ভরসা করেছিল। তখন নবী করীম (সা.) তাকে বলেন, আগে উটটি বেঁধে রাখ তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর। সুফীবাদীদের একটি ঘটনা থেকে জানা যায়, শাকীক আল বালখী নামে একজন সৎকর্মশীল ব্যক্তি ব্যবসা উপলক্ষে লম্বা সফরের উদ্দেশ্যে বের হন। কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই হঠাৎ ব্যবসা গুটিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। পরে তার বন্ধু ইবরাহীম আদহাম তার নিকট এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সফরে এক বিরানভূমিতে বিশ্রাম নিতে গিয়ে দেখলাম, একটি অন্ধ খোঁড়া পাখিকে আরেকটি ভাল পাখি খাবার এনে খাওয়াচ্ছে। তখন ভাবলাম, আল্লাহ যদি বিনা পরিশ্রমে এই অন্ধ খোঁড়া পাখিটিকে খাওয়াতে পারেন তাহলে আমাকে কেন পারবেন না? এই ভেবে ফিরে এলাম। তখন ইবরাহীম বললেন, হে শাকীক! তুমি অন্যের সাহায্যে বেঁচে থাকতে কেন ওই অন্ধ খোঁড়া পাখিটির মত হতে চাইলে? ভাল পাখিটির মত কেন হতে চাইলে না? তুমি কি জানো না, উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম? সূরা মুলকের ১৫ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, তোমরা দিকদিগন্তে বিচরণ কর এবং তার দেয়া জীবনোপকরণ থেকে আহার্য গ্রহণ কর। সূরা জুমু’আর ১০ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, সালাত বা নামাজ শেষ হলে তোমরা জমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ কর। বুখারী শরীফে আছে, নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজহাতে উপার্জিত খাদ্য গ্রহণ করতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে হাকিম উল্লেখ করেছেন, দাউদ (আ.) অস্ত্র প্রস্তুতকারক ছিলেন। আদম (আ.) কৃষক ছিলেন। নূহ্ (আ.) ছুতার ছিলেন। ইদরীস (আ.) দর্জি ছিলেন। মূসা (আ.) মেষপালন করতেন। কাজেই যে শ্রমবিমুখ ও অলস হবে সে বঞ্চিত হওয়ার যোগ্য।
২. সচ্ছল আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক দরিদ্রদের ভরণ-পোষণ : ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেই শ্রম ও কর্মের হাতিয়ার দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন করবে। কিন্তু যারা অক্ষম কাজ করতে পারে না, বিধবা, ইয়াতীম, সম্পদহীন, রোগী, প্রতিবন্ধী তারা কি করবে? ইসলাম তাদের দারিদ্র্য ও অভাবের থাবা এবং ভিক্ষার লাঞ্ছনা থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করেছে। এরজন্য ইসলাম সর্বপ্রথম যে নিয়ম চালু করেছে তা হলো, একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংহতি। ইসলাম আত্মীয়-স্বজনকে ঐক্যবদ্ধ ও পরস্পরের পৃষ্ঠপোষক করে দিয়েছে। তারা একে অন্যের হাত শক্তিশালী করবে। ধনী-দরিদ্রের দেখাশুনা করবে। সক্ষম অক্ষমদের সাহায্য করবে। ভরণ-পোষণ করবে। ভরণ-পোষণ বলতে খাদ্য ও পানীয়, শীত ও গ্রীষ্মের উপযোগী বস্ত্র, বাসস্থান এবং বিছানাসহ আনুষাঙ্গিক আসবাবপত্র, যে নিজের সেবা করতে অক্ষম তার জন্য সেবকের ব্যবস্থাকরণ, বিয়ের প্রয়োজন থাকলে বিয়ে দেওয়া, স্ত্রী-পরিজনের খরচ ইত্যাদি। আত্মীয় স্বজনকে দানের ব্যাপারে সূরা নাহলের ৯০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন। সূরা বনী ইসরাঈলের ২৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে, আত্মীয়-স্বজনকে দিবে তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না। বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, আত্মীয়তার বন্ধন আরশের গোড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় বলতে থাকে, যে ব্যক্তি আমাকে যুক্ত করে দেয় আল্লাহ তাকে যুক্ত করে দেন। আর যে ব্যক্তি আমাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে আল্লাহ তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। মহানবী (সা.) মাতাপিতা ও আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আবু দাউদ শরীফের এক হাদীসে তিনি বলেন, তোমার মাতা, পিতা, বোন, ভাই ও অধীনস্থ দাসের সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। এটি ওয়াজিব হক এবং যুক্ত বন্ধন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, প্রত্যেক আত্মীয়ের উপর তার আত্মীয়ের ভরণ-পোষণ করা ওয়াজিব। তবে শর্ত হলো, আত্মীয়ের দারিদ্র্যতা থাকাকালীন ভরণ-পোষণ করা। দারিদ্র্যতা কেটে গেলে ভরণ-পোষণ ওয়াজিব নয়। আর নিজের, স্ত্রীর ও পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ করে যা অতিরিক্ত থাকে তা দিয়ে আত্মীয়দের ভরণ-পোষণ করা। এ ব্যাপারে তিরমিযী শরীফে বর্ণিত আছে, নবী করীম (সা.) বলেন, তুমি নিজেকে দিয়ে শুরু কর। এরপর তোমার পোষ্যকে দাও। কেননা, সূরা তালাকে আছে, আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। আত্মীয়ের ভরণ-পোষণের বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামী রাষ্ট্র হলে এই হক অনাদায়কারীর বিরুদ্ধে মামলা করা যেত। অতএব, দারিদ্র্যের বিষদাঁত ভেঙে ফেলার লক্ষ্যে ধনী আত্মীয়রা ভরণ-পোষণের মাধ্যমে গরিব আত্মীয়-স্বজনকে সচ্ছল করে তুলতে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
৩. যাকাত : যেসব দরিদ্র ব্যক্তির ভরণ-পোষণ করার মত ধনী আত্মীয়-স্বজন নেই তাদের কি হবে? দারিদ্র্য তাদের উপর আক্রমণ চালাবে আর সমাজ উহা চেয়ে চেয়ে দেখবে, তা কি হয়? হয় না। ইসলাম এ ব্যাপারে সুন্দর ও স্থায়ী ব্যবস্থা দিয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য ধনীদের সম্পদে সুনির্দিষ্ট হক রেখে দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে যাকাত। যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। কুরআন ও সুন্নাহ সর্বদা সালাতকে যাকাতের সাথে যুক্ত করে বর্ণনা করেছে। তাফসীরে তাবারীতে আছে, নবী করীম (সা.) বলেন, যে (ধনী ব্যক্তি) যাকাত দিল না, তার কোন সালাত নেই। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, যে সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্যের দেয়াল সৃষ্টি করবে আমি তার বিরুদ্ধে লড়াই করব। বুখারী শরীফে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) বলেন, আল্লাহ যে ব্যক্তিকে অর্থ-সম্পদ দিয়েছেন এরপর সে ওইগুলোর যাকাত দিলো না, কিয়ামতের দিন ওই ধন সম্পদকে তার জন্য একটি টাক মাথাওয়ালা বিষধর সাপে রূপান্তরিত করা হবে। যার চোখ দুটোর উপর দুটি কালো বিন্দু থাকবে এবং ওই সাপ তার গলদেশে পেঁচাতে থাকবে। অত:পর সাপটি ওই ব্যক্তির উভয় অধর প্রান্ত কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার ধন-সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন-ভান্ডার। যাকাত অস্বীকারকারী কাফের হয়ে যায়। ইবনে হাযম (রহ.) বলেন, যাকাত অস্বীকারকারীর বিধান হলো, তার নিকট থেকে যাকাত আদায় করে নিতে হবে। এতে সে খুশি থাকুক অথবা অখুশি। যাকাত আদায়ের ফায়দা সম্বন্ধে সূরা মুমিনূনের ১-৪ আয়াতে বলা হয়েছে, ওইসব লোক সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়ী ও ন¤্র, যারা অর্থহীন কথাবার্তা ও কাজকাম থেকে বিরত থাকে এবং যারা যাকাতদানে সক্রিয় থাকে। ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচনে এক শক্তিশালী মাধ্যমের নাম যাকাত। এছাড়া সাদকাতুল ফিতর। যাকাতের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে এর মাধ্যমে দরিদ্রকে সচ্ছল করা। আল- কাসানী তার আল- বাদাই গ্রন্থে লিখেছেন, যাকাত আদায় হচ্ছে দুর্বলের সাহায্য, দুস্থের ত্রাণ ও ফরজ পালনে অক্ষমকে সক্ষম করে তোলা। উহা মানুষের মনকে পাপ থেকে পবিত্র করে। নৈতিকতাকে বদান্যতা ও মহানুভবতার বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল করে। কৃপণতা দূর করে। আত্-তাফসীরুল কাবীরের ১৬তম খন্ডের ১০৩ পৃষ্ঠায় ইমাম রাজী বলেন, দরিদ্র ব্যক্তি আল্লাহর পোষ্য। আর ধনীরা আল্লাহর ভান্ডার। কারণ, তাদের হাতে যে সম্পদ রয়েছে তা আল্লাহর সম্পদ। সুতরাং মালিক কর্তৃক তার রক্ষককে এ কথা বলা অসম্ভব নয় যে, আমার পোষ্যদের মধ্যে যারা অভাবী তাদের জন্য এই কোষাগার থেকে কিছু (শতকরা আড়াই টাকা) ব্যয় কর। ইসলাম সুষমভাবে অর্থ সম্পদের যাকাত নির্ধারণ করেছে। এতে ধনীর প্রচেষ্টা ও দরিদ্রের অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। ধনীকে নির্মূল করেনি আবার দরিদ্রের অভাবও উপেক্ষা করেনি। যাকাতের সময়, পরিমাণ, নিসাব, কার উপর ফরজ, বরাদ্দের খাত ইত্যাদি বিষয়ে নবী করীম (সা.) পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি অর্থ সম্পদের মালিক এবং মিসকীন বা কপর্দকহীনদের স্বার্থ বিবেচনায় এনেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা যাকাতকে অর্থ সম্পদ ও তার মালিকের পবিত্রকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি যাকাত দিবে তার সম্পদ কমবে না বরং বৃদ্ধি পাবে এবং উহা তার অবশিষ্ট সম্পদ হেফাজতের কারণ হবে। এগুলোর প্রবৃদ্ধি ঘটাবে, তার বিপদাপদ দূর হবে এবং তার জন্য এগুলোকে বহুমুখি করবে। উল্লেখ্য, আট শ্রেণীর মানুষ যাকাত পাবে। আল্লাহ নিজেই তাদের তালিকা করে দিয়েছেন। তারা হলেন, ক. ফকীর খ. মিসকীন গ. মুক্তিকামী দাসদাসী ঘ. মুসাফির ঙ. যাকাত সংগ্রহকারী চ. যাদের অন্তরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা হয় তারা ছ. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ও জ. আল্লাহর পথের যোদ্ধা। যাকাত ব্যক্তিগত কোন অনুকম্পা বা ইহসান নয় যে, ইচ্ছা হলে দিবে না হলে না দিবে বরং উহা আল্লাহর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি একটি সামাজিক বিধান যা রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে সুশৃঙ্খল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বভুক্ত থাকবে। এই প্রতিষ্ঠান সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। যাদের উপর যাকাত প্রদান করা আবশ্যক তাদের নিকট থেকে উহা আদায় করবে এবং যারা প্রাপ্য তাদের মধ্যে তা ব্যয়-বন্টন করবে। ইসলাম যাকাত সংগ্রহ ও বন্টনের দায়িত্ব অর্পণ করেছে রাষ্ট্রের উপর। রাষ্ট্র যদি উহা সঠিকভাবে তদারকি করে, ধনীদের নিকট থেকে যথাযথভাবে যাকাত উঠিয়ে প্রকৃত দরিদ্র ও পাওনাদারদের মাঝে বন্টন করে দেয় তবে দারিদ্র্য বিমোচনে এটাই হবে প্রথম ও প্রধান উৎস।
৪. বিভিন্ন উৎসের মাধ্যমে ইসলামী কোষাগারের পৃষ্ঠপোষকতা : আমরা জানি যে, ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচনে প্রথম ও প্রধান সরকারী উৎস হলো যাকাত। এর সঙ্গে এ কথাও যোগ করতে চাই যে, বাইতুল মালের অর্থ সরবরাহকারী সকল উৎসেরই দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রয়েছে। গনীমতের এক পঞ্চমাংশ, ফাই ও খারাজসহ সকল ধরনের রাজস্বে অভাবী ও অসহায়দের অধিকার রয়েছে। এ বিষয়ে সূরা আনফালের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আরো জেনে রাখো, যুদ্ধে তোমরা যা লাভ কর তার এক পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের ও মুসাফিরদের। ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো ন্যায় বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। আর সমাজে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা থাকা সত্বেও দরিদ্ররা অর্ধাহারে অনাহারে থাকবে, কাপড়-চোপড় বা বাসস্থান থেকে বঞ্চিত থাকবে তা কখনো ইনসাফ হতে পারে না। হযরত উমর (রা.) মদীনার নিকটবর্তী রাবাযা নামক স্থানে একটি চারণভূমিকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ওটাকে বিশেষ করে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন যাতে ওটা তাদের পশু সম্পদ ও আয় উপার্জনের উৎস হয়। স্বল্প সম্পদ, দুর্বল শ্রেণী ও নি¤œ আয়ের লোকদের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য আমাদের সরকারকেও এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ।
৫. যাকাত ব্যতিত অন্যান্য আর্থিক খাত : যাকাত ছাড়াও এমন কিছু আর্থিক দায়িত্ব রয়েছে যা আদায় করা বিভিন্ন কারণে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের উপর বাধ্যতামূলক। এ সবই দরিদ্র ব্যক্তির সাহায্য সহযোগিতা ও ইসলামী সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণের উপায় হিসেবে গণ্য। এ ধরনের কিছু হক হলো : ক. প্রতিবেশীর হক : প্রতিবেশীর হক রক্ষা করা বিষয়ে স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা নিসার ৩৬ নং আয়াতে বলা হয়, তোমরা আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করবে ও কোন কিছুকে তার সঙ্গে শরীক করবে না। পিতা মাতা, আত্মীয় স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও দাসদাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে। ঘর ঘেঁষে যে বসবাস করে শুধুমাত্র সেই প্রতিবেশী নয় বরং চারদিকের প্রত্যেক দিকে ৪০ ঘর প্রতিবেশীর মধ্যে গণ্য। ইসলাম চায়, প্রতিটি জনগোষ্ঠী সহমর্মিতাপূর্ণ সামাজিক ইউনিটে পরিণত হোক। সুখে-দুখে একে অপরের সহযোগী হোক, যদি সে অমুসলিমও হয়। তবেই দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।
খ. ঈদুল আজহাতে কুরবানী করা: হানাফী মাজহাব অনুসারে ঈদুল আজহার দিন সচ্ছল মুসলিমের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। কেননা, আহমদ ও ইবনে মাজাহ শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করবে না, সে যেন ঈদগাহের নিকটে না আসে।
গ. শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা : কেহ কোন বিষয়ে শপথ করে ভঙ্গ করলে তাকে কাফ্ফারা দিতে হয়। কাফ্ফারা আদায় করা ওয়াজিব। এ বিষয়ে সূরা মায়িদার ৮৯ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, অত:পর এর কাফ্ফারা হলো ১০ জন দরিদ্রকে মধ্যম মানের খাবার প্রদান করা, যা তোমরা তোমাদের পরিজনদের খেতে দাও অথবা তাদের বস্ত্র দান করা কিংবা একজন দাসমুক্ত করা। এমনিভাবে জিহারের কাফ্ফারা, রমজানে দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাসের কাফ্ফারা, ফিদইয়া, হাদী ও ফসল তোলার সময় ফসলের হকসহ বিভিন্ন হক আদায় করার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে হবে।
৬. ঐচ্ছিক সাদাকা এবং ব্যক্তিগত দান : ফরজ অধিকার এবং আবশ্যকীয় বিধি-বিধানের উর্ধ্বে উঠে পরোপকারী উদার দানশীল হতে উৎসাহিত করে ইসলাম। প্রত্যেক মুসলমানকে এমন একটি মনমানসিকতা তৈরি করতে হবে, যে মন তার নিকট যা চাওয়া হয় তারচেয়ে বেশি দান করবে বরং চাওয়া ও হাত পাতা ছাড়াই দান করবে, সুখে দু:খে, দিনে রাতে, প্রকাশ্যে ও গোপনে দান করবে। সেরকম মনের ব্যক্তি নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্যেও তা পছন্দ করে বরং নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অন্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার প্রদান করে, যদিও সে অভাবে দিন কাটায়। এ ধরনের ব্যক্তিরা অর্থ সম্পদকে জীবন ধারণের উপায় হিসেবে গণ্য করে, চূড়ান্ত টার্গেট হিসেবে নয়। কেউ কেউ ধারণা করে, আইন কানূন আরোপিত সিদ্ধান্ত ও বিধি বিধানই মানব জীবনের সব কিছু। এরা আসলে অগভীর জ্ঞানের অধিকারী, তারা মানুষের হাকীকত অনুধাবণ করতে পারে না। মানুষ এমন যন্ত্র নয় যে, তাকে ঘোরানো হলে ঘুরে এবং থামানো হলে থামে বরং এটি একটি সূক্ষ্ম ও জটিল যন্ত্র যা বস্তু ও আত্মা, শরীর ও মন, যুক্তি ও আবেগ, শিরা-উপশিরা ও বোধশক্তি এবং চিন্তা ও অনুভূতির সমন্বয়ে গঠিত। সুতরাং কেহ ইচ্ছা করলে যতটুকু দান করার বিধান রয়েছে এরও উর্ধ্বে উঠে আরো অধিক দান করতে পারে। দরিদ্র মানুষের সকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে, বিকশিত করতে, তার দারিদ্র্যতা বিমোচন করতে করজে হাসানাসহ সর্বোতভাবে তাকে সহযোগিতা করতে হবে। যদি কেউ কারো উপকারার্থে করজে হাসানা বা নি:স্বার্থ ঋণ দেয় তবে সে যেন আল্লাহকে করজে হাসানা দিল। এর উত্তম প্রতিদান সে আল্লাহর নিকট থেকে পাবে। এ বিষয়ে সূরা বাকারার ২৪৫ নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, কে সে যে আল্লাহকে করজে হাসানা বা নি:স্বার্থ ঋণ প্রদান করবে? তিনি তার জন্য উহাকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে দিবেন। একই সূরার ২৭৪ নং আয়াতে তিনি আরো বলেন, যারা রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে তাদের পূণ্যফল তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দু:খিতও হবে না। অতএব, সমাজের দরিদ্রদের জন্য ব্যয় করতে হবে। যা ব্যয় করা হবে উহা পরকালে পাওয়া যাবে। মানুষ মাঠভরা জমি, ঘরভরা ফার্ণিচার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কোটি কোটি টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স করে আর বলে এগুলো আমার সম্পদ, আমার সম্পদ। অথচ মুসলিম শরীফে নবী করীম (সা.) বলেন, আসলে তিন ধরনের সম্পদই তার নিজের সম্পদ। ক. যা সে খেয়ে ফেলেছে খ. যা পরিধান করে ছিঁড়ে ফেলেছে আর গ. যা সে দান করেছে। এতদ্ব্যতীত যে সম্পদ রয়েছে ওইগুলো তার নয়। ওইগুলো তার উত্তরাধিকারীর সম্পদ। উত্তরাধিকারীরা নেক সন্তান হলে ওই সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় কাজে লাগাবে। আর তা নাহলে উহা এমন কাজে ব্যয় করবে যা সম্পদ উপার্জনকারীর জন্য উভয় জাহানে ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই ভেবে চিন্তে সম্পদ ব্যয় করতে হবে। উপরিউক্ত ৬টি উপায় অবলম্বন করে সম্পদশালীরা যদি কুরআন ও হাদীস মুতাবেক তাদের সম্পদ ব্যয় করেন তাহলে উভয় জাহানের সফলতা লাভ করাসহ দেশে দারিদ্র্যমুক্ত আদর্শ ও শান্তিময় উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে এর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code