

সম্পাদকীয়: দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে, বিশেষত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও জ্বালানির মতো
খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে
না। এক্ষেত্রে বড় বাধা দুর্নীতি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে মধ্যাহ্নভোজ
সভায় যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির মিশন ডিরেক্টর
রিড জে অ্যাচিলম্যান এ কথা বলেছেন। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ
(অ্যামচেম) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উত্তরণ : ইউএসএআইডির সঙ্গে অংশীদারত্বের
অগ্রগতি’ শীর্ষক ওই সভায় অ্যাচিলম্যান আরও বলেছেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের
ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সেবা পেতে বেশি দুর্নীতি হয়। তিনি
জানান, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় বেসরকারি খাতের সহযোগিতায় বছরে ২০ কোটি
ডলারের বাজেট রয়েছে তাদের। এর বাইরে বিভিন্ন ধরনের মানবিক সহায়তায় বছরে ১৪
কোটি ডলার ব্যয় করে থাকে ইউএসএআইডি। সুতরাং দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই এ
খাতে দুর্নীতি রোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে।
দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি যে বড় বাধা, তা আগেও বারবার বলা হয়েছে। আমরা
জানি, বিনিয়োগকারীদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। অভিযোগ আছে, ঘুস না
দিলে ফাইল আটকে রাখা, অতিরিক্ত করারোপসহ পড়তে হয় নানা জটিলতায়। এসবের
পরেও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দৃশ্যমান কঠোর শাস্তি হয় না। পরিতাপের বিষয়
হচ্ছে, রাঘববোয়ালদের তো ধরা হয়ই না, বরং অনিয়মের তথ্য প্রকাশের কারণে
গণমাধ্যমকে অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হতে হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ
(দুদক) রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। গত বছর
বিনিয়োগকারীদের ভাষ্যে এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে দেশে বিদেশি বিনিয়োগে
বড় যে সাতটি বাধার কথা উঠে এসেছিল, তাতে দুর্নীতি ছিল শীর্ষে। এরপরেই ছিল বিদেশি
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে আইনের দ্রুত প্রয়োগের অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মাত্রাতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ, দুর্বল অবকাঠামো ও গ্যাস-
বিদ্যুৎ সংকট, জমির অভাব ও ক্রয়ে জটিলতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের
ঋণ জোগানে সক্ষমতার অভাব এবং স্থানীয়দের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের
যোগসূত্র ও সমন্বয়ের অভাব। এর বাইরেও বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও
সুশাসনের অভাবকে দায়ী করেছিলেন। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক
প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, প্রায় সব স্তরেই দুর্নীতি বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত
করছে।
বস্তুত সমস্যাগুলো চিহ্নিত হওয়ার পরও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং দুর্নীতি রোধ
করতে না পারায় সম্ভাবনাময় দেশটি থেকে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে অন্যত্র চলে
যাচ্ছেন। বিদেশি তো বটেই, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ সম্ভাবনাও শতভাগ কাজে লাগানো
যাচ্ছে না। এর ফলে ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশে
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জ্বালানির মতো বিভিন্ন খাতে এফডিআই বাড়ানোর অনেক
সুযোগ রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে পিপিপি মডেলও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা
রাখতে পারে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তাই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
পাশাপাশি আইনের কার্যকর প্রয়োগও বাড়াতে হবে।