কোনো ধনী ব্যক্তি যদি সম্পদের পুনর্বণ্টনের বামপন্থী বিষয়গুলোর পক্ষে তার অবস্থান তুলে ধরেন, তাহলে অন্য ডানপন্থীরা তাদের ভণ্ড বা হঠকারীর তকমা জুড়ে দেবেন। তাছাড়া স্বাভাবিক ও সমুচিত জবাব হিসেবে বলবেন, ‘সমতা প্রসঙ্গে আপনি যদি এত বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে প্রথমেই কেন আপনার আয়ের একটি বড় অংশ তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন না!’
এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার প্রভাবটা সাধারণত বিচ্ছিরি রকমের হতাশাজনক। কারণ আমরা মানুষরা নিজেদের কখনই হঠকারী বা ভণ্ড হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি না। এক্ষেত্রে তাই ধনীদের সামনে একটি মাত্র পথই খোলা থাকে—বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রচারণা না চালিয়ে সম্পদের একটি অংশ দান করে দেয়া অথবা চুপ করে থাকা। বেশির ভাগ ব্যক্তিই দ্বিতীয় পন্থাটি অবলম্বন করেন।
বৈশ্বিক অসমতা বর্তমানে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিষয়টিকে আমি নেহাতই অপ্রত্যাশিত ও দুর্ঘটনাজনক বলে উল্লেখ করব। ধনীদের সম্পদ পরিবারগুলোর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত থাকছে, তবে এর চেয়ে আর বেশি কী হতে পারে! অসমতা দিনে দিনে একটা রাজকীয় বিষয় হয়ে উঠেছে, কিছু মানুষ ধনী হিসেবে জন্মগ্রহণ করছে, আর অধিকাংশই যে মুহূর্তে পৃথিবীতে আসছে, তাদের ভাগ্যে জুটছে গরিবের তকমা।
এমন অবিচার চরম বিদঘুটে। তাই চিন্তা ও আলোচনার মাধ্যমে আমাদের সংশোধনমূলক পদক্ষেপের দাবি জানানো জরুরি। তাছাড়া সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশের মতো প্রকাশের বিষয়টিকে দমিয়ে রাখার মাধ্যমে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি শুরুতেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
বর্তমানে আমাদের কাছে বৈষম্যবিষয়ক হাজারটা তথ্য-পরিসংখ্যান রয়েছে। এক্ষেত্রে থমাস পিকেটি, ফ্রাঁসোয়া বুগিনিউ, ব্র্যাংকো মিলানোভিচ, টনি অ্যাটকিনসন এবং আরো অনেক গবেষকই ধন্যবাদ প্রাপ্তির দাবিদার। উদাহরণ হিসেবে এখানে অক্সফামের সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে, তালিকার নিচের দিকে অবস্থানরত ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষের যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, বিশ্বের মাত্র ২৬ জন ধনী ব্যক্তি ঠিক ওই পরিমাণ সম্পদের মালিক। অক্সফামের প্রতিবেদনে আরো তুলে ধরা হয়, গত বছর বিশ্বের বিলিয়নেয়ারদের মোট সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ ৯০০ বিলিয়ন ডলার কিংবা দিনে গড়ে তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করে।
বিভিন্ন দেশভেদে তীব্র হয়ে উঠেছে বৈষম্যের মাত্রাগুলোও। ২০১৮ সালের বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদনে দেখা যায়, ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণে এগিয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ভারত।
এটা সত্য, অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বৈষম্য অপরিহার্য ও অনিবার্য। তবে বর্তমানে বৈষম্যের মাত্রাটি ‘গোল্ডিলক’ স্তর ছাড়িয়ে বহুদূর ধাবিত। সম্পদ ও আয়বৈষম্যের পরিমাপটি ঠিক কীভাবে করা চাই, তা নিয়ে চলমান বিতর্ক সত্ত্বেও বিষয়টি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে দুটোই অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের বড় বড় শহরের বস্তির পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে কিংবা ধনী দেশের গৃহহীন দরিদ্র মানুষের দুর্দশাগ্রস্ত ও মালিন্যে ঘেরা জীবন দেখে কিংবা ধনীদের ঘরবাড়ি আর জীবনযাপন পদ্ধতির বিষয়গুলো অবলোকন করার মাধ্যমে বর্তমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আর এ প্রয়োজনীয়তা ঘিরে মনোযোগ আকর্ষণের বিষয়টি শুধু দরিদ্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াগুলো যা প্রথমত ধনী ব্যক্তিদের বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির অজুহাত দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়, তা মূলত অযৌক্তিক। আপনি একজন সচ্ছল ব্যক্তি হতে পারেন, হতে পারেন ধনী কিংবা অতিধনীদের একজন এবং একতরফাভাবে আপনি আপনার সম্পদের মালিকানা ছেড়ে দিতে অনিচ্ছুক, তবে আপনি মনে করেন, যে ব্যবস্থাটি এখনো আপনাকে আরো বেশি আয় কিংবা সম্পদের মালিক হওয়ার অনুমতি দেয়, তা অন্যায্য। এখানে এ ধরনের দ্বন্দ্ব কিংবা ভণ্ডামির কোনো জায়গা নেই।
বিশ্বের প্রাজ্ঞ ও মেধাবী বেশ কয়েকজন চিন্তাবিদ কিন্তু একমত হয়েছেন। ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত যুক্তিটি যেমন, ‘কেউ দামি সিগারেট খেলে তাকে সমাজতন্ত্রী হতে বাধা দেয়ার কিছু নেই।’ আমেরিকান অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসন যেমন ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তার ‘মাই লাইফ ফিলোসফি’ শিরোনামের নিবন্ধেও একই যুক্তি দেখিয়েছেন। অর্থনীতিবিষয়ক পাঠ্যবইয়ের সাফল্যের সূত্র ধরে স্যামুয়েল কিন্তু পরবর্তী সময়ে বেশ বড় অংকের অর্থের মালিক বনে যান। বেশ কয়েক দশক ধরেই বিশ্বজুড়ে স্নাতক পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তার বইটি পড়ে আসছেন। তবে স্যামুয়েল কিন্তু তার রাজনৈতিক অবস্থানে স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন, ‘আমার সহজ চিন্তাধারা হলো, অসহায় বা মজলুমকে অনুগ্রহ করো এবং বৈষম্যকে ঘৃণা করো।’
একই সঙ্গে তিনি এটাও স্বীকার করেন, ‘নিজের আয়ের পরিমাণ যখন মাঝারি থেকে উচ্চ হতে শুরু করে, তখন তার মধ্যে কোনো ধরনের অপরাধবোধ জন্মেনি।’ যদিও তিনি একতরফাভাবে তার সম্পদ ত্যাগের বিষয়টিকে নাকচ করে দেন, তবে তিনি অকপট সরলতা নিয়েই লিখেছেন, ‘সম্পদের পুনরায় বিতরণের প্রশ্নে আমি স্বয়ং আমার অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছি।’
যুক্তিসংগতভাবেই একজন ধনী হিসেবে সমতার পক্ষালম্বন করে ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণটি তৈরি করেছেন ফ্রেডরিখ অ্যাঙ্গেলস, ইংল্যান্ডের বনেদি ম্যানচেস্টার এলাকাসহ অন্য জায়গায় বড় বড় টেক্সটাইল কারখানার মালিক ছিলেন তার পিতা। শিশু শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশার চিত্র দেখতে দেখতে তরুণ ফ্রেডরিখের মধ্যে আমূল পরিবর্তন সূচিত হয় বা তিনি ক্রমে সংস্কারকামী মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
এক পর্যায়ে অ্যাঙ্গেলস কিন্তু তার পারিবারিক ব্যবসায় ফিরে আসেন, যাতে তিনি তার বন্ধু কার্ল মার্ক্সের প্রচেষ্টাগুলোকে সহযোগিতা জোগাতে পারেন এবং এ ধরনের মুনাফার অর্জনের প্রক্রিয়াকে রোধ করতে পারেন। কার্ল মার্ক্সের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার বাস্তবায়ন বা কার্যকারিতা সম্পর্কে কে কী ভাবছে, সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে অ্যাঙ্গেলসের সামগ্রিক সামাজিক বৈষম্য সংশোধনের আকাঙ্ক্ষাটি নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে।
আমি বলব, আশা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশের অনেক অতিধনী ব্যক্তিও খোলাখুলিভাবে বামপন্থা আর চরম বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের সমর্থক। তাছাড়া মহৎ লক্ষ্যের জন্য তারা তাদের মাথার ওপর নিছক ভণ্ডামির অপবাদটিও সহ্য করতে প্রস্তুত, কারণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান তাদের নৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে।
প্রগতিশীল ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায় নিজেদের আয়ের একটা অংশ ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই প্রশংসনীয়, কিন্তু এটি করতে তারা পদক্ষেপটি নিচ্ছেন কিনা! আমাদের সময়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশ্বিক ইস্যুর নাম তীব্র বৈষম্য। তাই বৈষম্যের এই চরম অবস্থা সামাল দিতে বা এটি মোকাবেলার ক্ষেত্রে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের অপেক্ষা নিয়ে তারা নির্বিকার বসে থাকতে পারেন না।