

নিউজ ডেস্কঃ
ছেলেবেলায় ঘরের দেয়ালময় আঁকিবুঁকি করে বেড়াতো ছোট্ট মেয়েটি। রঙতুলি আর প্রিয় আঁকার খাতার সাথেই ছিল তার নিত্য সখ্যতা। কে জানতো, একদিন সেই মেয়েটির লেখা কোনো গবেষণাপত্র জিতে নেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার কিংবা বড় হয়ে সে সুন্দরী প্রতিযোগিতার র্যাম্পে হেঁটে বেড়াবে খালি পায়ে? সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটিই আজকের মাসুদা খান। আর সবাই তাকে চেনে ‘মাসু আকে’ নামেই।
অনেকটা মজার ছলেই শুরু মাসুদার ‘জলতরঙ্গ: মাসু আকে’স আর্ট জার্নাল’ পেজটির। বন্ধুদের জন্যই বানাতেন তার ছবি আঁকার ভিডিও টিউটোরিয়ালগুলো। একটা সময় পর তিনি দেখলেন তার একটু ভিন্নধর্মী টিউটোরিয়ালগুলো সবাই বেশ পছন্দ করছে। ধীরে ধীরে তার পেজটিতে বাড়তে থাকে অনুসারী সংখ্যা। আর মাসুদা খান থেকে তিনি হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় ‘মাসু আকে’। তবে শুরুর সেই ভিন্নধর্মীতা মাসুদা ধরে রেখেছেন তার পরবর্তী সব ভিডিওতেই।
মাসুদা খানের জন্ম ইতালিতে। ২০০৬ সালে মায়ের হাত ধরে প্রথম দেশে আসা। এরপরই বাংলাদেশে তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়। ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা এবং এদেশের সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে থাকেন মাসুদা। এরমাঝে বছরখানেক ছিলেন দার্জিলিংয়ের একটি বোর্ডিং স্কুলে। স্কুলজীবনের কিছু সেরা সময় কাটিয়েছেন তিনি কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলঘেষা সেই বোর্ডিং স্কুলে। সেখানকারই একজন বয়োবৃদ্ধ ছবি আঁকার শিক্ষক ছিলেন। যিনি মাসুদার জন্য এক অন্যরকম অনুপ্রেরণার জায়গা হয়ে উঠেছিলেন। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে স্কুলের গন্ডি পেরোনোর আগেই মাসুদা বদলেছেন ১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে সবকিছুর মাঝেও তার ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা সব সময়ই ছিল।
এ লেভেল এবং ও লেভেলের গন্ডি পেরোনোর পর মাসুদার ইচ্ছে ছিল বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাবেন বাইরের কোনো দেশে। তবে সব মিলিয়ে নানা প্রতিকূলতার জন্য তা আর হয়ে ওঠেনি। ভর্তি হয়ে যান ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। সেখানেই পুরোদমে চলতে থাকে পড়াশোনা। এর মাঝেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কোর্সের জন্য মাসুদাকে লিখতে বলা হয় একটি গবেষণাপত্র। খানিকটা সময় নিয়ে তিনি লিখে ফেলেন তার গবেষণাপত্র— ‘সিডিএ অন দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইউনূস ভার্সেস সুকি।’ পরবর্তীতে তার এক বন্ধুর অনুপ্রেরণায় তিনি তার গবেষণাপত্রটি জমা দেন ‘দ্য গ্লোবাল আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাওয়ার্ড ২০২১’ আয়োজনে। সেখানেই মাসুদার গবেষণাপত্রটি প্রায় আড়াই হাজার সাবমিশনের মধ্য থেকে ‘লিঙ্গুয়েস্টিকস’ শাখায় সেরা হওয়ার খেতাব অর্জন করে। এই পুরষ্কারকে ‘জুনিয়র নোবেল প্রাইজ’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।
মাসুদার অর্জনের গল্প এখানেই শেষ নয়। অনেকটা কৌতুহলের বশেই ‘মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ ২০২০’ এ নাম লেখান মাসুদা। ধাপে ধাপে সেরা দশেও পৌঁছে যান তিনি। সবসময়ই পড়াশোনা আর রংতুলি নিয়ে মেতে থাকা মেয়েটিই সুন্দরী প্রতিযোগিতায় যেয়ে যেন নিজেকে খুঁজে পান নতুন করে। তার মতে, ‘মিস ইউনিভার্সের পুরো আয়োজনটির মাধ্যমে আমি ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে নতুন একটি আদলে খুঁজে পেয়েছি।’
মাসুদা স্বপ্ন দেখেন একদিন ঘুরে দেখবেন পুরো পৃথিবী। একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে তিনি শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে নিজের পদচিহ্ন রাখতে চান। আর তাই এখনই জীবনের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলতে নারাজ মাসুদা। তবে তার আঁকা ছবির মাধ্যমে তিনি ছড়িয়ে দিতে চান দেশের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে। সবসময়ই সৃষ্টিশীলতায় বিশ্বাস করেন তিনি। মাসুদা বলেন, ‘সৃজনশীলতাই পারে মানুষের সব রকম অনুভূতিকে সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে। আর শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যম এর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সৃষ্টির আনন্দ সবসময়ই অন্যরকম আত্মতৃপ্তি দেয়।’
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মাসুদা খানের অর্জনের মুকুটে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন পালক। আর তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন তার স্বপ্নের পথে।