নানা সঙ্কটে তলানিতে নামছে দেশের মেডিকেল শিক্ষার মান

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ৫ ঘন্টা আগে

Manual6 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট:  নানা সঙ্কটে তলানিতে নামছে দেশের মেডিকেল শিক্ষার মান। দেশের ৩৯টি সরকারি মেডিকেল কলেজের প্রায় সবটিতে শিক্ষক, জনবল সংকটসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে মোট শিক্ষক পদের ৪৩ দশমিক ৩৮ শতাংশই শূন্য। আর সব মেডিকেল কলেজেই শূন্য রয়েছে মৌলিক বিষয়ে শিক্ষকের পদ। বর্তমানে মেডিকেল কলেজগুলোয় মৌলিক বিষয়ে মোট ২ হাজার ৬৯টি শিক্ষকের পদ রয়েছে। কিন্তু মাত্র ১ হাজার ৫৬০ জন শিক্ষাদান করছে। অর্থাৎ মৌলিক বিষয়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ পদই শূন্য। বিশেষ করে নতুন কলেজগুলোতে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেসিক সাবজেক্টে শূন্য পদের হার। তাছাড়া নতুন মেডিকেল কলেজগুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা, শিক্ষক সঙ্কটের পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ, আবাসন ও ল্যাব সংকট রয়েছে। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিজিএমই) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো সংবেদনশীল ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে মৌলিক সুবিধার অভাব দক্ষ চিকিৎসক তৈরিতে অন্তরায়। ফলে স্বাস্থ্য খাত ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীরা প্রস্তুত হতে পারছে না। ২০১৮ সালে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ নেত্রকোনা ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের কোয়ার্টারে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু দীর্ঘ ৮ বছরেও প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। বরং শিক্ষক, আবাসন ও ক্লাসের সংকট, সীমিত হাতেকলমে শেখার সুযোগ নিয়েই ৩৩৩ শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে পড়াশোনা করছে। বলা হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত পেলেই শুরু হবে মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাসের কাজ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিকে যে জায়গাটা দেয়ার কথা তা অনেকটা রাস্তা ঘুরে যেতে হবে। ফলে মেডিকেল কলেজের সুবিধা পেতে মানুষকে ঘুরে আসতে হবে দীর্ঘ পথ। আবার নতুন করে জায়গা নির্বাচন করার সুযোগ নেই।

Manual4 Ad Code

সূত্র জানায়, বর্তমানে যেসব মেডিকেল কলেজ অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে তার মধ্যে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ, চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ, মাগুরা মেডিকেল কলেজ, নওগাঁ মেডিকেল কলেজ, নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ, নীলফামারী মেডিকেল কলেজ ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ রয়েছে। আর স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় ওসব মেডিকেল কলেজে সঙ্কট রয়েছে শ্রেণিকক্ষ, আবাসন ও ল্যাবের। বিগত ২০১৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র মেডিকেল কলেজ হিসেবে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ যাত্রা করে। কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিট ভবনে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শুরু হয়। কিন্তু দীর্ঘ এক যুগেও মেডিকেল কলেজটির কোনো স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ হয়নি। আর বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানে বেসিক ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ে শিক্ষকের ৫৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র ২৫ জন কর্মরত আছেন। অধ্যাপকের ৭টি পদ আর সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপকের ১৩টি করে পদ শূন্য। ৩৩ শূন্য পদে বর্তমানে ১৮ জন শিক্ষক সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করছে। যদিও রাঙ্গামাটি শহরের সুখী নীলগঞ্জ এলাকায় ২৮ একর জমির ওপর ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তাছাড়া নওগাঁও মেডিকেল কলেজেরও নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই নওগাঁ। পাশাপাশি কাটেনি জনবল সংকটও। বর্তমানে কলেজটিতে একজন অধ্যক্ষ, ১২ জন অধ্যাপক, ২৩ জন সহযোগী অধ্যাপক, ২৬ জন সহকারী অধ্যাপক, ২৬ জন প্রভাষক এবং দুজন কিউরেটরসহ মোট ৯০টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। কিন্তুএকজন অধ্যক্ষ, তিনজন অধ্যাপক, ৯ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৬ জন সহকারী অধ্যাপক, ২৪ জন প্রভাষক এবং দুজন কিউরেটরসহ মাত্র ৪৫ জন কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে আবার একজন কিউরেটর প্রেষণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আছেন। আর চাঁদপুর মেডিকেল কলেজে অনুমোদিত লোকবল ১০৯ জন হলেও কর্মরত আছেন ৪৭ জন। বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক সংকট থাকায় একজন শিক্ষককে ৩-৪টা দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আর জামালপুর মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ এবং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ নিজস্ব ক্যাম্পাস পেলেও কাটেনি জনবল সংকট কাটেনি। সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজে শিক্ষকসহ মোট পদ রয়েছে ১৭৩টি। তার মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে ৫৯ জন কর্মরত আছেন। পদ শূন্য ১১৪টি। পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজে ৯৪টি পদের মধ্যে ৫১টি পদ শূন্য আর জামালপুর মেডিকেল কলেজে ৮৬টি পদের বিপরীতে ৩১টি শূন্য। শিক্ষকের সঙ্গে অনেক কলেজের শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকটেও ভুগছেন। সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ১০০ আসনের হোস্টেলে ৩১৮ জন ছাত্রীকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।

Manual6 Ad Code

সূত্র আরো জানায়, সরকার স্থায়ী ক্যাম্পাসবিহীন সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্যে ৬টি মেডিকেল কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্গঠন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ভবন, অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ এবং নার্সিং কলেজের পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি ৫০ শয্যার মেডিকেল কলেজের জন্য আদর্শভাবে ১৫ একর জমিই যথেষ্ট। নতুন পরিকল্পনায় বহুতল প্রশাসনিক ভবনের মাধ্যমে জায়গা ও নির্মাণ ব্যয় কমানো হবে। তাছাড়া মেডিকেল কলেজগুলোর সংকট বিশেষ করে শিক্ষক কাটাতে সরকার প্রণোদনা দেয়ার বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা করছে।

Manual5 Ad Code

এদিকে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বেসিক সাবজেক্টে শিক্ষক সংকটের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন জানান, ক্লিনিক্যাল বিষয়ের তুলনায় অ্যানাটমি, ফিজিওলজি ও বায়োকেমিস্ট্রির মতো বেসিক বিষয়ে শিক্ষক ঘাটতি বেশি। সংকট মোকাবিলায় বেসিক বিষয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য প্রণোদনা চালুর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষকদের আর্থিক প্রণোদনা, অবসরপ্রাপ্ত যোগ্য শিক্ষকদের পুনর্নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোর সংকট সমাধানের আগেই নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও সরকার উদ্যোগী হয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে দুটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদী জেলায় নতুন একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সরকার আরো ৭টি জেলায় নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code