নারী জাগরণের পূজারী সুফিয়া কামাল

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual8 Ad Code

পুরুষ  নির্বিশেষে বাঙালি জাতির মোহনিদ্রার আবর্তনকে একটা ধাক্কা দিয়ে কেবল জাগানোই নয়, সেই জাগরণকে চিরস্থায়ী করে একুশের পদপ্রান্তে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সুফিয়া কামাল যেভাবে তার গোটা জীবনটিকে নিরলস ভাবে উৎসর্গ করে গিয়েছেন, তেমন দৃষ্টান্ত ভারতীয় উপমহাদেশে আর দ্বিতীয়টি মেলে না।

Manual1 Ad Code

মানুষকে আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা- এর বাইরে সুফিয়া কামালের জীবনে দ্বিতীয় কোনও উদ্দেশ্য বা স্বার্থ একটি মুহূর্তের জন্যে কখনো ফুটে ওঠেনি। মেয়েদের জন্যে একটি গোটা আকাশ উন্মোচিত করার সাধনায় সুফিয়ার মননে কখনোই নারীবাদের সঙ্কীর্ণ আবর্ত ফুটে ওঠেনি। তাই নারীবাদ নয়, মানুষ, মানুষের জন্যে চিন্তা, মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক- সার্বিক শোষণমুক্তি, বাঁধনের আগল ছিন্ন করা- এই সাধনার একমনে নিজের একতারাতে একটি সুরের মতো সুফিয়া কামাল তার গোটা জীবনটা ধরে সেধে গেছেন। লোকের কথা নিস নে কানে, ফিরিস নে আর হাজার টানে, যেন রে তোর হৃদয় জানে হৃদয়ে তোর আছেন রাজা… এটি ই ছিল বঙ্গজননী সুফিয়া কামালের জীবনবেদ।
যাপনচিত্রের কাঠামো নির্মাণে সৃষ্টির আনন্দে সুফিয়া যেন ছিলেন বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালি-র অপূ আর দুর্গার এক আশ্চর্য সমন্বয়। শৈশবে বরিশালের শায়েস্তাবাদের নবাববাড়ির আয়মাদারি সুফিয়ার মননলোকে সবথেকে বড়ো করে খোদাই করে দিয়েছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এ চেতনার ঋদ্ধতাতেই খণ্ড-ক্ষুদ্র করে বসুধাকে একটিবারের জন্যেও নিরীক্ষণ না করবার অনন্যসাধারণ প্রবৃত্তিতে সুফিয়াকে বিশ শতকের অন্যতম সেরা হিউম্যানিস্টে পরিণত করেছিল। অচেনা আনন্দকে উপলব্ধির ভিতর দিয়েই একদিকে যেমন তিনি নিজের চেষ্টায় পরিবারের রক্ষণশীল পরিবেশের ভিতরে থেকেই আধুনিক শিক্ষার সমস্ত রূপ-রস-গন্ধকে নিজের জীবনে আত্মস্থ করবার সাধনায় শৈশবেই নিমগ্ন হয়েছিলেন, তেমনই স্বচেষ্টায় অর্জিত শিক্ষাকে সমস্ত রকমের সঙ্কীর্ণবোধের উর্ধে স্থাপন করে মানবসেবা, মানুষকে আপন মর্যাদার উপরে প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে পরিচালিত করে গিয়েছেন। সেই কারণেই সুফিয়া কামাল নিছক নারীবাদী ছিলেন না। ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষবাদী। এই মানুষে সেই মানুষের সন্ধান- বাউল ফকির তত্ত্বের সেই মানুষ রতনের সন্ধান তাই হয়ে উঠেছিল তার জীবনবেদ।
শৈশব-কৈশোরে পারিবারিক আভিজাত্যের ভিতরে যে বিষয়টি সুফিয়ার কাছে সব থেকে বেশি মনে দাগ কাটবার মতো পর্যায় বলে মনে হয়েছিল, সেটি হল; সামাজিক মণ্ডলের বহু অপূর্ণতার মাঝেই একটা পরিপূর্ণতার আভাস হিসেবে নারী আর পুরুষের ভিতর একটা আপাত সাযুজ্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ, শ্রদ্ধা। শৈশবে তাদের শায়েস্তাবাদের নবাব বাড়িতে মেয়েদের প্রথাগত পড়াশোনার তেমন একটা প্রচলন না থাকলেও সুফিয়া তার মামাদের কাছ থেকে পড়াশোনার বিষয়ে পেয়েছিলেন সব রকমের সহযোগিতা। বাড়ির রক্ষণশীলতাকে অতিক্রম করে, আভিজাত্যেরই অংশীদার মামারা যেভাবে শিশু সুফিয়াকে ধর্মশিক্ষার পরিমণ্ডলেই কেবল আবদ্ধ না রেখে, আধুনিক বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার প্রতি নানাভাবে আগ্রহান্বিত করে তুলেছিলেন, সেই গোটা ঘটনাক্রমটিই পরবর্তী জীবনে লিঙ্গসাম্যের প্রতি লড়াইয়ের ভিত্তিভূমি রচনা করেছিল সুফিয়ার জীবনে। প্রকৃত শিক্ষার আঁতুর ঘর যে হলো নিজের বাড়ি, প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে আত্মীয় পরিজনেরাই শিশুর কোমল বৃত্তিতে জল, মাটি , আগুনের স্পর্শ দিয়ে , সেই দলা পাকানো কাদার কালকে একটি পরাপূর্ণ ভাস্কর্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়, সুফিয়া সে শিক্ষা অতি শৈশবে নিজের বাড়িতে, নিজের পরিবার পরিজনদের ভেতর থেকেই তা পেয়েছিলেন।
সুফিয়া কামালের জীবনের প্রেক্ষিত আলোচনার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান সমাজের অবরোধপ্রথাকে ঘিরে নানা ধরনের ভাবনার প্রাবল্য দেখা যায়। এই প্রবল্য উৎপাদনে বিশ শতকের অভিজাত মুসলমান পরিবারের প্রেক্ষিতকে আচ্ছন্ন করে ফেলে উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমান জীবনের ছায়াবর্তকে । অনেকক্ষেত্রেই এই ছায়ার কালো ঘূর্ণায়মান আবর্তন রচনার ক্ষেত্রে অবাঙালি সমাজের ছায়াচিত্রের অনুরণনের ভিতর দিয়ে একাংশের বাঙালি একটা বিশেষ ধরনের আয়মাদারির মৌতাত উপভোগ করতে চায়। বাংলা ও বাঙালি পরিমণ্ডল থেকেই সংশ্লিষ্ট পরিবারটি বিকশিত হয়েছে- এটা বলবার থেকে তাদের একাংশ বেশি তৃপ্তি অনুভব করে মুঘল-পাঠান, সুলতান-বাদশাদের সঙ্গে তাদের একটা কাল্পনিক যোগসূত্রের মৌতাতকে ঘিরে।

Manual1 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code