প্রথম দেখা ময়মনসিংহ

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual3 Ad Code

সাহিত্য ডেস্কঃ রইস উদ্দিন এবার গাড়ি চালিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পানে ছুটেন। বাগানঘেরা একটি রেস্ট হাউসে ঢুকে বুকিং খোঁজে পাওয়া গেলনা। ফোন আসে এই রেস্টহাউস নয়, আমাদেরকে নবনির্মিত বিনা আবাসিক এলাকার রেস্ট হাউসে যেতে হবে। এই বিনা (বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার এগ্রিকাচার) রেস্টহাউস বাগানঘেরা নিরিবিলি সুন্দর পরিবেশে অবস্থিত। রেস্টহাউস কর্মী তাজুল ইসলাম আমাদেরকে দু’তলার একটি দুইবেডের কক্ষের চাবি দেন। তিনি মর্টিন স্প্রে করে দেন ফলে রাতে মশারী লাগেনি। ব্রিজারে পানি গরম করে আমরা দু’জনে স্নান করি। আচমকা গড় গড় শব্দে রেস্টহাউস কেঁপে উঠে। পিছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি পাশ দিয়ে ট্রেন ছুটে যাচ্ছে।

বিকেলে ক্যাম্পাসে ঘুরতে বের হই। হল, বাগান, অনুষদ ইত্যাদি ঘুরে রাত হয়ে যায়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবে যাই। দুইজন পত্রিকা প্রতিনিধি ছাত্র মনযোগ দিয়ে লেখালেখির কাজ করছেন। তাঁরা আমাদেরকে তেমন গুরুত্ব দেন নি। আমরা পূবালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের লোক। আমাদের মাধ্যমে এই প্রেসক্লাব বিভিন্ন সময় অনেক অনুদান পেয়েছে। খানিকক্ষণ পর তাঁদের নেতা আসেন। তিনি এসে আমাদেরকে খুব সাদরে গ্রহণ করেন। সবার কাজকাম বন্ধ করে আমাদেরকে নিয়ে বসেন। আর কয়েকজন প্রেসক্লাব সদস্যকে ডেকে আনেন। চা-নাস্তা আসে, তাঁদের দুই বছরের ম্যাগাজিন উপহার আসে। ফটোসেশন হয়।

Manual7 Ad Code

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বিশাল, এত জায়গা খুবসম্ভব বাংলাদেশের অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গার পরিমাণ ৪.৮৫ বর্গকিলোমিটার। সক্রিয় জায়গা ১৩০০ একর, ভিতরে অবারিত খালি জায়গা। ১৯৬১ সালে এই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভোধন হয়। একজন মুরব্বী জানালেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে একজন সিলেটির অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি রণকেলী গ্রামের ডঃ এস ডি চৌধুরী। যিনি খান বাহাদুর মাহমুদ চৌধুরীর সন্তান। খান বাহাদুর মাহমুদ চৌধুরীর নামেই গোলাপগঞ্জের বিদ্যাপিঠ এম সি একাডেমি। ডঃ এস ডি চৌধুরী ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত সাফল্যের সাথে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চেন্সেলারের দায়িত্ব পালন করেন। আমি বেশ গর্বানুভব করলাম, ডঃ এস ডি চৌধুরী যে আমার ছোট সমন্দি আজিজ চৌধুরীর চাচা শ্বশুর।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাগানচর্চার জন্য বেশুমার অর্থ বরাদ্দ করা হয়। সারাটা ক্যাম্পাস নানা জাতের বৃক্ষলতায় ছেয়ে আছে।

যেদিকে তাকানো যায় রঙ বেরঙের ফুল আর ফুল, গাছ আর গাছ। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস শাখায় যাই। ক্যাম্পাস শাখার আশপাশ ঘুরে দেখি। মসজিদ, বাগান, স্মৃতিসৌধ, ছাত্রাবাস, সোহরাওয়ার্দী মিলনায়তন অপরূপ। পূবালীর ক্যাম্পাস শাখাটি যেন এক স্বর্গোদ্যান প্রাসাদে রয়েছে। শাখায় আছেন একজন প্রহরী ফিরোজ আলী, তিনি এক সড়ক দুর্ঘটনায় খোঁড়া হয়ে যান। আমরা শাখায় ঢুকি।

Manual1 Ad Code

গার্ড ফিরোজ আলী প্রাক্তন ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলামের প্রশংসা করে বললেন, স্যার খুব ভাল মানুষ, এক্সিডেন্টের পর তিনি ব্যাংক হতে সাহায্য না করলে পায়ের চিকিৎসা হতনা। ব্যবস্থাপক তালিকায় আমার দু’জন বস আবু হাবিব খায়রুল কবির, জগতচন্দ্র সাহা ও আরিফ রাব্বানীর নাম পাই। কয়েকজন ব্যবস্থাপকের নামের আগে ‘কৃষিবিদ’ শব্দটি সংযুক্ত আছে। তাঁরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং কৃষিপেশা বদলে ব্যাংকিং পেশায় যোগ দেন। নামের আগে ‘কৃষিবিদ’ লেখার কারণ হল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাইকে জানান দেয়া- আমি তোমাদেরই লোক।

তিনি কৃষিবিদ উজ্জ্বল কুমার সাহা। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে হন পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। এখন পূবালী ব্যাংক লিমিটেড, ময়মনসিংহ প্রধান শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক। উজ্জ্বল শ্যামলা মেদহীন তনু একজন মেধাবী বুদ্ধিমান মানব উজ্জ্বল কুমার সাহা। হ্যাঁ, এসব মেধাবীরা পূবালী ব্যাংককে বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতার যুদ্ধমাঠে সাফল্যের সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

রাতে এসে তিনি আমরা দু’জনকে ময়মনসিংহ শাখায় নিয়ে যান। তাঁর শাখায় বসেই আবার চোখ বুলাই ব্যবস্থাপক তালিকায়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শাখার প্রায় সকল ব্যবস্থাপকের পদোন্নতি পেলেই পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারিত হয় ময়মনসিংহ শাখা। আমার ঘনিষ্ঠজন আবু হাবিব খায়রুল কবির, জগত চন্দ্র সাহা, আরিফ রাব্বানী ও উজ্জ্বল কুমার সাহা সবাই এই একই রুটে এসে ময়মনসিংহ শাখার ব্যবস্থাপক হন। উজ্জ্বল কুমার সাহা আমাদেরকে পাশের গ্রিণপার্ক হোটেলে নিয়ে যান।

একটি ভবনের ছাদে স্থানীয় ঐতিহ্যে সাজানো হোটেল, সামনে জলফোয়ারা ও জলাধারে একুরিয়াম-ফিসের বিচরণ। রেস্টুরেন্টটি ময়মনসিংহকে তুলে ধরছে। উজ্জ্বল সাহার হেভি নাস্তা ও কফিতে সেইরাতে ডিনার সমাপ্ত হয়।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সাল। বসন্তের ভোর। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত ক্যাম্পাস। রোদ নেই, কুয়াশা ভিজিয়ে দিচ্ছে ফুলের পাপড়ি, সতেজ পাতার ধূলা ধুয়ে নিয়ে টপ করে ঝরে পড়ছে শিশির বিন্দু। আমি ও যীশু ভোরের আলোয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখতে বেরিয়ে যাই। ভিসি বাংলা পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্র পার, দেশী বিদেশী বৃক্ষপল্লী হরিক্যালচার পার্ক, স্মৃতিসৌধ ঘুরে দেখি। শিক্ষকদের নিরিবিলি আবাসিক এলাকায় ঢুকে মনে হল আমেরিকার কোন জনপদে হাঁটছি। পাখির কূজনে মুখরিত পুরো ক্যাম্পাস। কমছে কম দুই মাইল হাঁটি। কিছুক্ষণের জন্য আমাদের গাইড হন ক্যাম্পাস শাখার গার্ড ফিরোজ আলী।

আমরা তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি চা-স্টলে ব্রেকফাস্ট করি। আল মামুন একজন গরিব কিশোর। সে এই হোটেল কর্মি এবং আমাদেরকে নাস্তা পরিবেশন করে। হোটেল মালিক মামুনকে দ্রুত কাজ সেরে খেয়ে পড়তে যেতে তাগদা দিচ্ছেন। সাধারণত মালিকেরা কর্মচারীদেরকে সহজে ছাড়তে চায়না, যতক্ষণ সম্ভব বেশি খাটাতে চায়। কিন্তু এখানে উলটো চলে যাবার তাগদা দিচ্ছে দেখে আমরা কৌতুহলী হয়ে জানতে চাই-সে কোথায় যাবে। হোটেল মালিক বললেন, আল মামুন একজন এতিম কিশোর, বাড়ি নেত্রকোনা। তাঁর মাতা ও এক বোন।

বাবা না থাকায় মামুনের এই আয়ে সংসার চলে। সে চা-স্টলে কাজ করে স্থানীয় ঈশ্বরগঞ্জ বারহিত উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। খুব ভাল রেজাল্ট করে, তাই শিক্ষকরা তাঁকে সহায়তা করেন। হোটেল মালিক বললেন, আমরা স্কুলের সময় হলে তাঁকে ক্লাস করার জন্য ছেড়ে দেই। সংসারের হাল ধরার কেউ না থাকলেও পড়াশুনায় মামুনের আগ্রহ দেখে আমরা বিষ্মিত হই। মনে মনে ভাবি আমাদের জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের সাথে আল মামুনের শৈশব যেন একই রেখায় মিলে গেছে। মামুন স্বপ্ন দেখে বড় হবে, বোনের বিয়ে দিবে, মায়ের দুঃখ মুছে দিবে। জীবন সংগ্রামের কাহিনী শুনে আমি তাঁর দিকে ৫০০ টাকার একটি নোট এগিয়ে দেই। সে নিতে চায়নি। বললাম, তোমার লেখাপড়ার কাজে লাগাবে। এবার খুশী হয়ে হাতে তুলে নেয়।

Manual7 Ad Code

রেস্টহাউসে ফিরে ব্যাগ গুছিয়ে আমরা কেবিন ছাড়ার প্রস্তুতি নেই। বিনা রেস্টহাউসের বুড়ো কেয়ারটেকার তাজুল ইসলাম চাঁদপুরের লোক। বললেন, এই রেস্টহাউসে অনেক ভিনদেশীরা আসেন। দীর্ঘসময় এখানে অবস্থান করে তাঁরা গবেষণা কাজ করেন। নিজেরা পি এইচ ডি করেন, আবার অনেক দেশী বিদেশী মনীষীরা পি এইচ ডি গবেষণারত শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে আসেন। তিনি এসব বিদেশী ও বিদেশিনীদের কাছ থেকে মোবাইল সেটসহ নানা উপহার পাবার গল্প শুনান।

তখনি একজন বিখ্যাত ফরাসী লেখকের কাহিনী মনে পড়ে গেল। তিনি প্যারিসের এক বস্তি এলাকায় বসবাস করতেন। তাঁর উন্নত পান্ডুলিপি পড়ে একজন প্রকাশক প্রচুর রয়েলিটি মানি নিয়ে লেখকের ঠিকানায় রওয়ানা হন। ঘিঞ্জি বস্তিতে ঢুকতেই প্রকাশকের মনে হল এই নোংরা বস্তিবাসী লেখককে এত টাকা না দিলেও চলে। তিনি বান্ডিল হতে অর্ধেক টাকা সরিয়ে নেন। লেখকের বাসায় ঢুকে দেখেন সবকিছু এলোমেলো অগোছালো। ভাঙ্গা চেয়ারে বসতেই ম্যাচম্যাচ করে ওঠে আসন।

Manual1 Ad Code

এবার ভাবলেন নাহ, এই এত ফতুর লেখককে এত টাকা দেবার দরকার নেই, অর্ধেকের অর্ধেক দিলেই যথেষ্ট। লেখক চানাস্তা আনতে আড়ালে গেলে প্রকাশক খাম খোলে অর্ধেক টাকা সরিয়ে নেন।

কোয়ার্টার রয়েলিটি মানি হাতে দিতেই লেখক দারুন খুশি হয়ে বললেন, ধন্যবাদ প্রকাশক ভাই, আপনি বড় কষ্ট করে এতটাকা নিয়ে আমার বাসা পর্যন্ত ছুটে এসেছেন, এত বদান্যতা না দেখালেও হত, তাঁর চেয়ে আমাকে একটা ডাক দিলেই আপনার অফিসে গিয়ে টাকাগুলো নিয়ে আসতাম। প্রকাশক এবার সহাস্যে জবাব দেন, লেখক ভাই আপনি বড়ই ভাগ্যবান, আমি যে অনেক খোঁজে বাসা বের করে আপনার মেহমান হতে পেরেছি। আপনার বাসায় আসায় জরিমানা চার আনা, না এলে নিশ্চিত ছিল ষোল আনা। (অসমাপ্ত)

লেখক- চৌধুরী ইসফাকুর রহমান কুরেশী

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code