

ডেস্ক রিপোর্ট: সমাধানে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে এ সমস্যার পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। তবে সংকট মোকাবিলায় সরকার দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজ ও ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: নীতি সংস্কার থেকে কার্যকর বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সমস্যা ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।
আমীর খসরু বলেন, বর্তমান সরকার যে অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, সেখানে আর্থিক খাত, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ক্ষেত্রে ন্যূনতম দুই বছর সময় লাগবে।
তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া যে অর্থনীতির কথা বলছেন, তা আসলেই সামনে এগিয়ে যেতে পারে না।” তবে সংকট সমাধানে সরকার কোনো সময় নষ্ট করছে না বলেও ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন তিনি।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে। একই সঙ্গে স্থলভাগে গ্যাস সংরক্ষণের অনশোর স্টোরেজ সুবিধা নিয়েও কাজ চলছে। গ্যাসের ক্ষেত্রে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ও অনশোর স্টোরেজসহ বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সঞ্চালন ব্যবস্থা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “সরকারের কাছে যে পরিসংখ্যান আসছে, বাস্তবে বিদ্যুতের পরিমাণ তার চেয়েও অনেক কম।”
বিদ্যুৎ উৎপাদন, পাওয়ার মিক্স ও এনার্জি মিক্স নিয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলেও জানান তিনি। ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ থাকবে। দেশের কয়লা সম্পদ নিয়েও সরকার পর্যালোচনা করছে। সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত জ্বালানি মিশ্রণ নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ কাঠামো মোটামুটিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
আমীর খসরু বলেন, যথাসময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাবে। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও শক্তিশালী ইন্টারনেটকেও অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দেশের সব নাগরিকের কাছে প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
সংস্কার বাস্তবায়নে গুরুত্ব
ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু নীতি গ্রহণ নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অনেকগুলোই দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করেছে। কর ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা কমাতে বাজেটে নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বা ডিরেগুলেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে বলেও জানান আমীর খসরু।
তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী বা নাগরিক সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোথাও আটকে গেলে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। সরকার প্রতিদিন এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করবে। প্রয়োজনে কিছু আইন পরিবর্তনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
করনীতি প্রণয়নেও পরিবর্তন আনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলাদা করা হচ্ছে। করনীতি তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবসা ও রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর প্রভাব বোঝেন এমন বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, করনীতি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো নীতি প্রণয়নের আগে ব্যবসা, করদাতা, রাজস্ব আদায় ও ভোগের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
করব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনার কথাও জানান আমীর খসরু। তাঁর মতে, রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে করসংক্রান্ত অন্যান্য সেবা অনলাইনে রিয়েল টাইমে দেওয়া সম্ভব হলে হয়রানি ও অনিয়ম কমবে।
রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাস্তবায়ন ও নীতি বিভাগ আলাদা করা হবে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে করারোপের বিষয়েও কাজ চলছে এবং এ জন্য তথ্যভান্ডার তৈরি করা হচ্ছে।
ব্যাংক ও শেয়ারবাজার নিয়েও বক্তব্য
ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, এ খাতে মারাত্মক মূলধন ঘাটতি রয়েছে, যা সরকারের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণও অনেক বেশি। এ কারণে অর্থায়নের বিকল্প উৎস প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেয়ারবাজার নিয়েও সতর্কতার কথা জানান আমীর খসরু। তিনি বলেন, “শেয়ারবাজার নিয়ে সতর্কসংকেত পাচ্ছিলাম। এরপর সেখানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।” একই সঙ্গে দেশে আরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।ব্যবসায়ীদের অভিযোগের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী লালফিতার দৌরাত্ম্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, হয়রানি ও দুর্নীতিকে দীর্ঘদিনের এবং গভীরভাবে প্রোথিত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। এসব সমস্যা দূর করে ব্যবস্থাকে সঠিক পথে আনাকে সরকারের অন্যতম কাজ বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এতে সভাপতিত্ব করেন অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল।সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, “শুধু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা নয়, আমরা সমাধানের অংশ হতে চাই।” ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস তৈরিতে এ আয়োজন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি ভবিষ্যতে এমন আরও আয়োজনের কথা বলেন।