বিশেষ চাহিদানসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসা কার্যক্রমে স্থবিরতা

লেখক: Rumie
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual8 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট : বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসায় সরকারি শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে। বেতনের অভাবে বন্ধ রয়েছে অধিকাংশ সরকারি শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অর্ধলক্ষাধিক শিশু। দীর্ঘ ১০ মাস ধরে বেতন পাচ্ছে ওসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। ফলে সারা দেশের ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের প্রায় সবক’টিতেই সেবাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় ওসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও কর্মীদের অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। আর যারা আছেন তাদের বেতন কবে হবে তা কেউ নিশ্চিত নন। এমনকি তাদের তাদের চাকরি আছে কি নেই সে বিষয়েও কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য জানানো হচ্ছে না। ফলে শিশু বিকাশ কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবাদান কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।  স্বাস্থ্যসেবা অধিপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

Manual7 Ad Code

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা এবং ইন্দ্রীয় বিকাশের সুযোগ বাড়াতে ২০০৮ সালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা হয়। পরের বছর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির অধীন হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট শীর্ষক অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় পাঁচটি কেন্দ্রের মাধ্যমে এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১০ ও ২০১৪ সালে আরো পাঁচটি করে ১০টি কেন্দ্র বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০২১ সালের মার্চে এ প্রকল্পে আরো ২০টি কেন্দ্র যুক্ত হয়। মোট ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪টি ও জেলা সদর হাসপাতালে ১১টির কার্যক্রম রয়েছে।

Manual5 Ad Code

সূত্র জানায়, প্রতিটি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে রয়েছে একজন করে শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, শিশু মনোবিজ্ঞানী, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট, অফিস ম্যানেজার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তাছাড়া শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মাল্টিডিসিপ্লিনারি ট্রেনিং সেন্টারে বিভিন্ন বিষয়ের ইনস্ট্রাক্টর, কো-অর্ডিনেটরসহ রয়েছেন মোট ১১ জন। এ প্রকল্পের অধীনে কাজ করা সব মিলিয়ে মোট ১৮৬টি পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছিলো। কিন্তু চলতি মাসসহ ১০ মাস ধরে বেতন আটকে থাকায় ওসব স্বাস্থ্যকর্মী কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এরই মধ্যে সাতজন শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী ও দুজন ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট পদত্যাগ করেছেন।

সূত্র আরো জানায়, শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অটিজম, স্নায়ুবিকাশ বৈকল্যজনিত সমস্যা (এনডিডি), শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক সমস্যা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, দেরিতে কথা বলা ও কথা বলতে সমস্যা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, অতিচঞ্চলতা ও মনোযোগের অভাব, খিঁচুনি ও মৃগীরোগ, শিক্ষণ প্রতিবন্ধিতা, আচরণগত সমস্যার সেবা দেয়া হয়। বয়স অনুযায়ী নির্ণয় করা হয় শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ। পাশাপাশি শিক্ষণ প্রতিবন্ধকতা বুদ্ধি ও আচরণ মূল্যায়ন, পজিটিভ প্যারেন্টিং, কাউন্সেলিং (শিশু ও পরিবার), বিহেভিয়ার থেরাপি, ট্রমা থেরাপি (ইএমডিআর), কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (সিবিটি) এবং ট্রানজেকশনাল অ্যানালাইসিস থেরাপির (টিএ) সেবাও দেয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৪৪ হাজার ৪৪২টি শিশু এই সেবার আওতায় এসেছিল। এর আগের ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে যথাক্রমে ৫৩ হাজার ৮১৭ ও ৫৬ হাজার ১৭২টি শিশুকে বিশেষ সেবা দেয়া হয়। ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে কভিড-১৯ মহামারী চলাকালে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হলেও যথাক্রমে ২৬ হাজার ৪৭৫ ও ১৯ হাজার ২২১টি শিশু সেবা গ্রহণ করে। কিন্তু গত বছরের জুন থেকে চলতি এপ্রিল পর্যন্ত গত ১০ মাসে অর্ধলক্ষাধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ একটি প্রতিবন্ধী শিশুর একাধিক সমস্যা থাকতে পারে। ফলে তাকে একাধিক সেবা দিতে হয়। ওই ভিন্ন ভিন্ন সেবা দেয়ার জন্য শিশু বিকাশ কেন্দ্রে রয়েছেন শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্ট ও শিশু মনোবিজ্ঞানী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শিশুকে একই সেবা একাধিকবার নিতে হয়। সে হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোয় ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৯টি সেবা দেয়া হয়েছে। আর ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেয়া হয় যথাক্রমে ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৬৩ ও ১ লাখ ৬০ হাজার ২৭৮টি সেবা। তবে কর্মীদের বেতন না হওয়ায় বর্তমানে শিশু কেন্দ্রগুলোর সেবা বন্ধ রয়েছে।

এদিকে জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ প্রতিবেদন ২০২১-এর তথ্যানুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ প্রতিবন্ধী। তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা ব্যবহারে ব্যর্থ হলে ২০৩০ সালের মধ্যে সব প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করা সম্ভব হবে না। ফলে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সম্মিলিত স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন চিকিৎসাসেবা একান্ত জরুরি। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

Manual8 Ad Code

অন্যদিকে শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোর এমন পরিস্থিতি বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুপ্রিয় সরকার জানান, চতুর্থ স্বাস্থ্য সেক্টর কর্মসূচির মাধ্যমে ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের জন্য বার্ষিক ১০-১২ কোটি টাকা বাজেট দেয়া হতো। কিন্তু সেক্টর কর্মসূচি সমাপ্ত হওয়ায় এবং রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর না হওয়ায় শিশু বিকাশ কেন্দ্রে কোনো বরাদ্দ নেই। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাস জুন পর্যন্ত কর্মীদের বেতন দেয়া সম্ভব হয়েছে। তার পর থেকে ওসব কেন্দ্রের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বেতন বন্ধ রয়েছে। ওই হিসাবে তারা চলতি মাসসহ ১০ মাস ধরে বেতন পান না। প্রথম কয়েক মাস বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে অনেকে আর নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন না। এমন অবস্থায় তাদের জোর করাও যায় না। তাই কেন্দ্রগুলোয় সেবা অনিয়মিত হয় পড়েছে।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code