ভারত-ইইউ সম্পর্কে বাণিজ্যে প্রাধান্য?

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual3 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট : ভারত-শাসিত কাশ্মীরে হামলার পর পরমাণু শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ভারতের সঙ্গে ইইউর সম্পর্ক যে মূলত বাণিজ্যই নির্ধারণ করে দেবে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলায় ২৬ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এরপর দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দুই দেশকেই সামরিক ক্ষেত্রে সংযম এবং সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে ভারতের প্রতিক্রিয়ার “পদ্ধতি, লক্ষ্য এবং সময় নির্ধারণ” করার পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছেন। এদিকে, পাকিস্তান সতর্ক করে দিয়েছে যে ২৪ থেকে ৩৬ ঘন্টার মধ্যে ভারতীয় আক্রমণ আসন্ন।

ব্রাসেলসে দৈনিক সংবাদ সম্মেলনে ইইউ এর মুখপাত্র আনোয়ার এল আনুনি ডিডাব্লিউর প্রশ্নের উত্তরে জানান, “ইইউ ধারাবাহিকভাবে সংলাপ এবং সম্পৃক্ততার (দুই দেশের) উপর ভিত্তি করে পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে। এই সন্ত্রাসী হামলার পরে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

আনুনি বলেন, “আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, এমন সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইনি বা অন্যান্য পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা এবং সংযম প্রদর্শন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরো বলেন, ইইউ আশা করে যে দক্ষিণ এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেলগুলো খোলা থাকবে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে

২২শে এপ্রিল ভারত-শাসিত কাশ্মীরে “মিনি-সুইজারল্যান্ড” হিসাবে পরিচিত পহেলগামের পাহাড়ি রিসোর্টে সামরিক পোশাক পরিহিত বন্দুকধারীরা পর্যটকদের উপর হামলা চালায়। সেদিনই ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডেয়ার লাইয়েন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ শোক প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “আজকের পহেলগামে জঘন্য সন্ত্রাসী হামলা অনেক নিরীহ জীবন কেড়ে নিয়েছে। তবুও আমি জানি যে ভারতের চেতনা অটুট থাকবে। এই অগ্নিপরীক্ষায় আপনারা দৃঢ় অবস্থান নিবেন। এবং ইউরোপ আপনাদের পাশে থাকবে।”

২০১৯ সালে ভারত ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর গড়ে ওঠা কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট- টিআরএফ নামে স্বল্প পরিচিত কাশ্মীরি জঙ্গি গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করে। তবে পরবর্তীতে তারা এই দাবি প্রত্যাহার করে নেয়।

ভারত সরকার এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভারতীয় কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, টিআরএফ পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার প্রতিনিধিত্ব করে। লস্করের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাই শহরে হামলা চালানোর অভিযোগও রয়েছে।

Manual4 Ad Code

পহেলগামে সাম্প্রতিক হামলা আবারও দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। দুই দেশই সম্পূর্ণ কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ দাবি করে।

Manual6 Ad Code

ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত ইইউ

ফ্রাই ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস- ভিইউবি‘র সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজি, ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটির একজন ভিজিটিং ফেলো ড. ক্লড রাকিসিটস ডিডাব্লিউকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক কোনও পক্ষই উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বিবৃতি ছাড়া আর কিছু বলেনি। তবে তিনি মনে করেন, এর অর্থ এই নয় যে নয়াদিল্লি এবং ইসলামাবাদে তারা যোগাযোগ করছে না।

রাকিসিটস বলেন, “প্রকাশ্যে তারা খুব বেশি কিছু করছে না, তবে পর্দার আড়ালে অ্যামেরিকান, চীনা, এমনকি ইইউ কর্মকর্তারাও নিশ্চয়ই প্রচুর ফোন করছে যাতে উত্তেজনা না বাড়ে।”

তবে তিনি মনে করেন, ইইউ কখনোই ভারতীয় উপমহাদেশে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো বড় খেলোয়াড় ছিল না এবং এই মুহূর্তে ইউক্রেনের যুদ্ধসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে এই জোট ব্যস্ত।

তিনি বলেন “মূল কথা হলো, এখন ইইউ -র অগ্রাধিকার ইউক্রেন এবং গাজা। কেবল ইইউ নয়, পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই সাধারণত একই সঙ্গে কেবল একটি বা দুটি বিষয় মোকাবিলা করতে পারে।”

Manual1 Ad Code

ভারতের সঙ্গে ইউরোপের ‘রেয়াল পলিটিক’

অন্য অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আন্তআটলান্টিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা রূপ নিতে শুরু করেছে। এর ফলে ব্রাসেলসেও ভারতের গুরুত্ব  হঠাৎ করে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজনৈতিক ঝুঁকি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের দক্ষিণ এশিয়া প্রধান এবং ভারতের অনন্ত আস্পেন সেন্টারের ফেলো প্রমিত পাল চৌধুরী মনে করেন, পহেলগামে হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত যেভাবেই নেওয়া হোক না কেন, ভারত ব্রাসেলসের দিক থেকে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে করে না।

ইইউ ব্যবসাকেই এক্ষেত্রে প্রাধান্য দিবে, উল্লেখ করে ডিডাব্লিউকে তিনি বলেন, “ইইউ কিছুই করবে না। যুক্তরাষ্ট্র ইইউর বিরুদ্ধে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, (ইইউর নেতারা) বুঝতে পেরেছেন যে তাদের বাণিজ্য সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজন এবং ভারত মাঝারি স্তরের শক্তি হলেও অর্থনীতি হিসাবে জাপানকে ছাড়িয়ে যেতে প্রস্তুত।”

নিজের এমন মতের সপক্ষে যুক্তি হিসাবে প্রমিত এই বছরের শুরুতে ফন ডেয়ার লাইয়েনের ভারত সফর এবং ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দীর্ঘস্থায়ী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার ঘোষণার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ভারত-ইইউ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাশ্মীর একটি কাঁটা হয়ে ছিল। তবে এখন এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করেন প্রমিত। এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন, কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইইউ কম আগ্রহী হয়ে উঠেছে এবং তথাকথিত ‘রেয়াল পলিটিক’ বা “বাস্তবতা-ভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান” নিয়েছে। বিশেষ করে এমন একটা সময়ে, যখন কাঁচামাল ও পণ্য আমদানিতে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। ভারতকে এক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখছে ইইউ। রাকিসিটসের মতে, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোও প্রতিরক্ষা চুক্তি নিশ্চিত করার জন্য ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, “তারা বৃহৎ চিত্রের দিকে তাকিয়ে আছে, তারা বড় প্রতিরক্ষা চুক্তির সন্ধানে ভারতকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় না। ফ্রান্সের দিকে তাকান, তারা সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে কিছু বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।”

ভারতের সাথে ইইউ এর সম্পর্কের সাম্প্রতিক উন্নয়নে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় একই ধরনের অভিজ্ঞতাও একটি কারণ বলে মনে করেন প্রমিত। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত এক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে এবং অনেক ইইউ নেতাই এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

Manual1 Ad Code

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ পহেলগাম হামলার পরপরই এক্স-এ দেয়া এক পোস্টে বলেছেন, এই শোকের মুহূর্তে ভারত এবং তার জনগণের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে ফ্রান্স। তিনি বলেন, “ফ্রান্স যেখানেই প্রয়োজন সেখানেই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তার মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে।”

Desk: K

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code