মার্কিন-চীন শুল্কযুদ্ধ: জার্মান কোম্পানিগুলোর নজর বাংলাদেশে

লেখক:
প্রকাশ: ২ years ago

Manual6 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

চলতি মাসে উচ্চপর্যায়ের একটি জার্মান ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। এই প্রতিনিধিদলে জার্মান পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, দেশটির রপ্তানি ঋণ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তারাও ছিলেন।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রতিনিধিদল ঢাকায় বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫-এ অংশ নেন। এরপর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করেন। জার্মান এশিয়া-প্যাসিফিক বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন (ওএভি) এশিয়াজুড়ে জার্মান ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রচারের জন্য কাজ করে। এই প্রতিষ্ঠানটি এ সফরের সমন্বয় করে।

সফরকালে জার্মান পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অস্পিগ জিএমবিএইচের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রতিনিধিদলের সদস্য থমাস ক্যোনিং বলেন, ‘উদীয়মান বাজার হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। এ ছাড়া, বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাক্রোইকোনমিক তথ্য ও উপকরণগুলো ব্যাপক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

এশিয়া-প্যাসিফিক বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন বা ওএভির নির্বাহী বোর্ডের সদস্য আলমুট রোসনার বলেন, এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা গ্রহণ, তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগ স্থাপন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জার্মান কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশের সংস্কার নীতি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে সঠিক ও আপডেটেড তথ্য প্রদান করা।

জার্মানি ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো (৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার)। এ ছাড়া, জার্মানি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দেশে বাংলাদেশের রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি বস্ত্রপণ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জার্মানি থেকে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পণ্য এবং বৈদ্যুতিক সামগ্রী আমদানি করে।

পোশাক এবং চামড়াজাত পণ্য খাতে বেশ কয়েকটি জার্মান কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন কারখানা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে থমাস ক্যোনিংয়ের কোম্পানি অস্পিগ কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়োগ করে জিনস ও জ্যাকেট উৎপাদন করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-জার্মান জয়েন্ট ভেঞ্চার্স কোম্পানি পিকার্ড ১৯৯৫ সাল থেকে চামড়াজাত হ্যান্ডব্যাগ এবং অন্য আনুষঙ্গিক পণ্য তৈরি করছে।

কিছু জার্মান কোম্পানি যৌথ উদ্যোগে কাজ করছে, যেমন—হানা সিস্টেম লিমিটেড। এটি বাংলাদেশের মেঘনা গ্রুপের সহযোগিতায় কিউব তৈরির কাজ করছে।

Manual4 Ad Code

ওএভির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৮০টি জার্মান কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম, সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা প্রতিনিধি অফিস পরিচালনা করছে, যার মধ্যে বাসফ, বায়ার, বশ এবং সিমেন্সের মতো বহুজাতিক কোম্পানিও রয়েছে।

এদিকে জার্মান ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল এমন একসময়ে ঢাকা সফর করেছে, যখন বিশ্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আক্রমণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। ট্রাম্প ২ এপ্রিল বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করেন। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেশির ভাগ বাণিজ্যিক অংশীদারদের জন্য ৯০ দিনের ছাড় দিয়েছেন। তবে এই নীতির কারণে ইতিমধ্যে বাংলাদেশি সরবরাহকারী এবং তাদের অর্ডারের ওপর প্রভাব পড়েছে।

গত বছর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। সামগ্রিকভাবে, বস্ত্র এবং পোশাক উৎপাদন বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ। গত বছর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর এই শিল্প পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

ক্যোনিং বলেন, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ও চীনের ওপর উচ্চ মার্কিন শুল্ক জার্মান কোম্পানিগুলোকে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র অনুসন্ধানে উৎসাহিত করছে। তিনি বলেন, ‘বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা এবং অতিরিক্ত শুল্কের কারণে বাংলাদেশ ভোগ্যপণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য শিল্পপণ্য উপাদানে চীনের বিকল্প হিসেবে সম্ভাবনা রাখে।’

Manual8 Ad Code

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ থিংক ট্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ ক্যোনিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য এক প্রজন্মে একবারের সুযোগ।’ তিনি বাংলাদেশ সরকারকে পুরোনো নিয়মকানুন, বাণিজ্য লজিস্টিক দুর্বলতা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা উন্নত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি আমরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করি, অন্যরা করবে।’

তবে বিনিয়োগকারীদের কিছু সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বিদ্যুৎসংকট, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ এবং দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জার্মান বিনিয়োগকারীরা জানান, তাঁরা এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সচেতন।

ক্যোনিং উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বেশ উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পোশাক খাতে বাংলাদেশের সাফল্য প্রমাণ করে, দেশটি অন্যান্য শিল্প ক্ষেত্রেও একই রকম সাফল্য অর্জন করতে পারবে।’

Manual7 Ad Code

ওএভির রোসনার বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিনিয়োগকারীরা এসব বিষয়ে সতর্ক আছেন।

প্রসঙ্গত, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস হাসিনার পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং আগামী বছরের জুনের মধ্যে নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code