নিউজ ডেস্কঃ দূর পরবাসে থেকেও বহু মুক্তিকামী বাঙালি এবং অবাঙালি নাগরিক বাংলাদেশের স্বাধীনতার উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। দেশের রণাঙ্গণে তারা যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও বিদেশে থেকে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিয়েছেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিদেশের অনেক মানবতাবাদী ব্যক্তি। মুক্তিযুদ্ধের বহু অজানা ইতিহাসের সাক্ষী ইংল্যান্ড।
অপারেশন ওমেগা
বাংলাদেশের মুক্তি-আন্দোলনের পক্ষে ইংল্যান্ডে জন্ম নেয় অনন্য উদ্যোগ ‘অপারেশন ওমেগা’। এর সদস্যরা মনে করেন বাংলাদেশের ভেতরে দুর্গত জীবনযাপন করছেন যেসব মানুষ, তাদের কাছে খাবার, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সাহায্য পৌঁছে দেয়া অপর মানুষের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সীমান্তরেখা তাঁরা মানেন না, বিপন্ন মানুষের কাছে অপর মানুষের পৌঁছে যাওয়ার অধিকার তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ১৭ আগস্ট এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। ভারত থেকে একদল বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী এদিন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েন। তাঁরা শামিল হন অপারেশন ওমেগা নামের একটি অহিংস অভিযানে। বাংলাদেশের ভেতরে ত্রাণ অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেন লন্ডনের সমাজসেবী, রাজনৈতিক কর্মী এবং পিস নিউজ পত্রিকার সম্পাদক রজার মুডি। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল দুটো: এক. দুর্দশাগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ; দুই. বাংলাদেশের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ। ১৬ এপ্রিল তিনি অপারেশন ওমেগার জন্য জনবল সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে পিস নিউজ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেন। বিজ্ঞপ্তিটি ছিল এরকম: ‘লন্ডনবাসীদের ছোট একটি দল পূর্ব বাংলায় ত্রাণসামগ্রীসহ অভিযানের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করছে। …শারীরিকভাবে সক্ষম এবং ব্যক্তিগত বন্ধনে আবদ্ধ নন, এমন সম্ভাবনাময় স্বেচ্ছাসেবীদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পিস নিউজ-এর রজার মুডিকে লেখার অনুরোধ করা হলো (দয়া করে ফোন করবেন না)।’
রজার মুডির ডাকে যুক্তরাজ্যের আটজন ও যুক্তরাষ্ট্রের তিন অধিবাসী সাড়া দেন। এই ১১ জনকে নিয়েই মে মাসে গড়ে ওঠে অপারেশন ওমেগার মূল দল। তাঁদের মধ্যে চারজন ছিলেন নারী। লন্ডনের ৩ কেলডোনিয়ন রোডে স্থাপন করা হয় অপারেশন ওমেগার সদর দপ্তর । তাঁরা অর্থ তুলে অ্যাম্বুলেন্স কিনেন। ১৯৭১ সালের পহেলা জুলাই অ্যাম্বুলেন্সসহ সাহায্য-কর্মীরা রওয়ানা হয় বাংলাদেশের উদ্দেশে। প্রথম অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রার পর পহেলা আগস্ট ট্রাফালগার স্কোয়ারের বিশাল জনসভা শেষে রওয়ানা হয় আরেক অ্যাম্বুলেন্স ওমেগা-টু।
ত্রাণ কর্মসূচি চালানোর জন্য টাকা জোগাড় করেছিল সাধারণ মানুষের দেয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার অনুদান থেকে এসেছিল। বেশির ভাগ অনুদান আর প্রশাসনিক সাহায্য এসেছিল যুক্তরাজ্যের বাঙালিদের কাছ থেকে।
যখন প্রায় সব বড় বড় ত্রাণ সংস্থা বাংলাদেশিদের দুর্দশায় স্তব্ধ, ওমেগা সদস্যরা তখন এগিয়ে এলেন তাঁদের ক্ষুদ্র সাহায্য নিয়ে। শত বাধা. হুমকি, ভয়ভীতি ও গ্রেপ্তার – এসবের পরও তাঁরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে ত্রাণ তত্পরতা চালিয়েছিলেন। সৃষ্টি করেছিলেন মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত। সেইসঙ্গে তাদের কর্মকা্ল গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় তা বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনেও ভূমিকা রাখে।
স্বাধীনতার পর ২০১৩ সালের অক্টোবরে আবার বাংলাদেশে এসেছিলেন ওমেগা দলের অন্যতম সদস্য এলেন কনেট। ৫ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানে ’৭১-এ অপারেশন ওমেগার ত্রাণ তত্পরতা ও নিজের কারাবাসের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন তিনি ।
