

মুজিবনগর (মেহেরপুর) :
মেহেরপুরের মুজিবনগরে আগান,বাগান, সহ অনআবাদি জমিতে তুলা চাষ আশার আলো দেখাচ্ছে মেহেরপুরের মুজিবনগরের অঞ্চলের কৃষকদের। মুজিবনগরের প্রায় আগান,বাগান সহ অনাবাদী জমিতে অন্য ফসল চাষ করে খরচ উঠানোই যেখানে কষ্টসাধ্য ছিল সেসব জমিতে তুলা চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন কৃষকরা। ফলে মেহেরপুরের মুজিবনগর অঞ্চলে দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তুলা চাষ।
অন্য ফসলের চেয়ে তুলার ফলন ভালো এবং দাম বেশি হওয়ায় প্রতি বছর কৃষকদের তুলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে। মুজিবনগরে আগান, বাগান, অনআবাদি জমি এক সময় পতিত পড়ে থাকবো। এসব পতিত জমিতে চাষিরা বিগত দিনে বিভিন্ন ফসল ফলানোর চেষ্টা করে নিষ্ফল হয়ে আসছিলো। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতায় এসব অনাবাদি জমির মধ্যে হাইব্রিড ও উন্নত জাতের তুলা চাষ করা চাষিরা শুরু করে। অন্যান্য ফসলের চেয়ে তুলার চাষে খরচ কম এবং ফলন অত্যাধিক ভালো এমনকি বেশি মুল্যে বিক্রি করে লাভবান হওয়া যায়। তাই প্রতি বছর মুজিবনগরের আগান,বাগান,সহ অনআবাদি জমিতে তুলার চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বস্ত্র খাতের প্রধান কাঁচামাল হলো তুলা। দেশে তুলার বর্তমান চাহিদা প্রায় ৪০ লাখ বেল। এসব তুলার চাহিদা পূরণ করতে সিংহভাগ তুলা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে বেশি তুলা চাষ করা হলে, তুলার উৎপাদন ও ক্রমশই বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিদেশ থেকে তুলা আমদানি হ্রাস পাবে। দেশ-বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় থেকে সাশ্রয়ী হবে।
দেশে বর্তমানে দুই ধরনের তুলার চাষাবাদ হচ্ছে। সমতল ও পাহাড়ি ভ্যালিতে সুতা কলগুলোর জন্য বার্ষিক প্রায় ৪২ লাখ বেল আঁশ তুলার চাহিদা রয়েছে। এ পরিমাণ তুলা আমদানি করতে হয় দেশের বাইরে থেকে। প্রায় ২ থেকে আড়াই হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করে স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ মেটানো সম্ভব। যার আনুমাণিক মূল্য ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তুলা উৎপাদনের জন্য জমি তৈরি থেকে শুরু করে বীজতুলা বাজারজাতকরণ, জিনিং, আঁশতুলা বিপণন, তুলাবীজ থেকে তেল উৎপাদন ও পরিশোধনসহ বিভিন্ন কাজে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এ ফসলে নারী চাষিরা বেশি কাজ করার সুযোগ পান।
এছাড়া তুলার বীজ থেকে উপজাত দ্রব্য হিসেবে ভোজ্য তেল ও খৈল পাওয়া যায়। তুলার খৈল গবাদি পশু ও মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শুকনা তুলার গাছ কাগজ তৈরির পাল্প, পার্টিকেল বোর্ড তৈরির পাল্প ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তুলা চাষ বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি ইতিবাচক।
মুজিবনগরে আগান,বাগান সহ অনআবাদি জমিতে ধান ফলানো কঠিন। আখ, পাট, সরিষা, কলাইসহ অন্য ফসল করেও খুব একটা লাভের মুখ দেখা যায় না। প্রায় অনাবাদী সেই জমিতে তুলা চাষ করে লাভের মুখ দেখছেন কৃষকরা। ফলে তুলা চাষের প্রতি ক্রমশ: ঝুঁকে পড়ছে মুজিবনগরেন কৃষকরা। মুজিবনগরেপ উপজেলায় অনাবাদী খাস জমি রয়েছে সাড়ে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি। চরের খাস ভূমিগুলো সরকার তুলা চাষিদের নামে বরাদ্দ দিলে আরো ব্যাপকভাবে চুলা চাষের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে কৃষকরা। এছাড়া তুলা ক্ষেতে কাজ করে দু’পয়সার মুখ দেখছে গ্রামের দরিদ্র নারী শ্রমিকেরা।
মুজিবনগর উপজেলার মহাজনপুর ইউনিয়নের তুলা চাষী মুজিবনগর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হেলাল উদ্দীন বলেন, বাগান সহ ভিটা জমিতে আখ, পাটসহ অন্য ফসল চাষ করে লাভের মুখ দেখতে না পেরে এখন তুলা চাষ শুরু করেন তিনি। এরপর থেকে আর
লোকশানে পড়তে হয়নি তাকে। এবছরও তিনি ৬ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের তুলা চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমিতে তার খরচ হয়েছে বিঘা প্রতি প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। আর প্রতিবিঘা জমিতে তিনি তুলা বিক্রি করতে পারবেন প্রায় ২০-২৫ হাজার টাকা। সর্বমোট খরচ হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। সেখানে তিনি প্রায় ২ লক্ষ টাকার তুলা বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।
একই উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নেন আনন্দবাস গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ জানান, এবার ২ বিঘা জমিতে তুলা আবাদ করতে তার খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকার মত তাতে আমি আয় হবে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
বোরহান উদ্দিন বলেন, অন্যান্য ফসলের চেয়ে তুলা চাষের খরচ কম। আর তুলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে তুলার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয় বলে তুলা চাষ করে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন।
চাষি আব্দুল করিম বলেন, অন্যান্য ফসলে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা ঝুঁকি থাকে। তুষা চাষ তেমন বড় কোনো ঝুঁকি নিতে হয় না। ফলে সামান্য খরচে লাভের অংশই বেশি থাকে। তাই দিনে দিনে চাষিরা তুলা চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
চলতি বছর মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলায় ২২৫ হেক্টর জমিতে সিবি ১২, সিবি-১৪, সিবি হাইব্রিড-১, রুপালী-১ ও ডিএম ৩ জাতের তুলার চাষ হয়েছে। গত বছর তুলার আবাদ হয়েছিল ২১৭ হেক্টর জমিতে। দাম ভালো থাকায় এবার তুলা চাষিরা বেশ লাভের মুখ দেখবে বলে আশা করছেন তুলা উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা। এবছর তুলা উন্নয়ন বোর্ড প্রতিমণ তুলার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫শ টাকা। তুলা চাষ করতে প্রতি বিঘা জমিতে কৃষকদের গড়ে খরচ হয় ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। আর জাত ভেদে বিঘা প্রতি তুলার ফলন পাওয়া যায় ৮ থেকে ১৬ মণ পর্যন্ত।
জামালপুর জেলা তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, তুলা উন্নয়ন বোর্ড তুলা চাষের শুরু থেকে বাজারজাত পর্যন্ত চাষিদের সব ধরণের সহায়তা দিয়ে থাকে। এবছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তুলার উৎপাদন ভালো হয়েছে। পাশাপশি এবার দাম ভালো থাকায় তুলা চাষিরা আরো বেশ লাভবান হবেন বলে আশা প্রকাশ করছি। জামালপুরের চরাঞ্চলের অনাবাদী জমিগুলো তুলা চাষের আওতায় আনা গেলে তুলার উৎপাদন যেমন বাড়বে তেমনি তুলা চাষ করে চাষিরাও বেশ লাভবান হতে পারবেন।