মৃত্যুর ওপাড় থেকে ফিরে আসা স্বর্ণার রোমহর্ষক বর্ণনা

লেখক:
প্রকাশ: ৮ years ago

Manual3 Ad Code

নেপালের কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হয়। সেই ফ্লাইটে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির পরিবারের ৫ জন মিলে কাঠমান্ডু ঘুরতে গিয়েছিলেন সৈয়দা কামরুন্নাহার স্বর্ণা। সাভারের গণস্বাস্থ্য মেডিকেল থেকে কয়েক দিন আগে এমবিবিএস পাস করেছেন। স্বামী মেহেদী হাসান জীবনবাজি রেখে বাঁচিয়েছেন তাকে। দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন ভাসুর (স্বামীর বড় ভাই) ও ভাসুরের আড়াই বছরের সন্তানকে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তার জা। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পাওয়া স্বর্ণা বর্তমানে কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ (কেএমসি) হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। বুধবার সকালে আইসিইউতে গিয়ে বাংলাদেশি সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি স্বেচ্ছায় কথা বলতে রাজি হন। দুর্ঘটনার সময় ফ্লাইটের ভেতরের অভিজ্ঞতার বর্ণনার অডিও রেকর্ড স্বর্ণার অনুমতি নিয়ে ধারণ করা হয়েছে।

Manual7 Ad Code

স্বর্ণার রোমহর্ষক বর্ণনা মতে, আমরা ১৪ নম্বর সিটে বসেছিলাম। পাঁচজন পাঁচটি সিটে ছিলাম। ১৪-এ এবং ১৪-সি’তে আমি আর আমার স্বামী, ১৪-ডি এবং ১৪-এফ সিটে আমার ভাইয়া ও ভাবি বসেছিলেন। ভাবি জানালার পাশে ছিলেন। প্রথমে আমি জানালার কাছে বসলেও ল্যান্ডিংয়ের সময় আমার স্বামী জানালার কাছে বসে।

অবতরণের সময় প্লেনটা একটু ঝাঁকি খেয়েছে। কেবিন ক্রুরা ল্যান্ডিংয়ের ঘোষণা ছাড়া কোনো ঘোষণা দেয়নি, কোনো সতর্ক সংকেত দেয়নি। তবে ওনারা বুঝতে পারছিলেন প্লেনটা ভালোভাবে চলছে না। প্লেন এয়ারপোর্টে আসার পর দেখছি রানওয়ে ও অন্যান্য প্লেন বাঁকা হয়ে আছে। বুঝতে পারছিলাম আমাদের প্লেনটিই বাঁকা হয়েছিল। এরপরও পাইলট প্লেনটা ল্যান্ড করানোর চেষ্টা করেছেন, বাঁকা থেকে সোজা করার চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণ পর আবার প্লেনটা কাঁপছিল, সঙ্গে সঙ্গে সামনের চার-পাঁচটা গ্লাস ভেঙে গেল, সামনের যাত্রীরা বলছিল ‘ব্ল্যাস্ট ব্ল্যাস্ট’।

Manual5 Ad Code

তখন প্লেনটি পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। আমার পায়ের নিচে আগুন ধরে গিয়েছিল। আমি তখন চিৎকার করে বলছিলাম, ‘আমি মরতে চাই না। আমি আগুনে পুড়ে মরতে চাই না।’ আমার স্বামী তখন কেডস পরা অবস্থায় পা দিয়ে জানালা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন।

Manual8 Ad Code

বিপদের সময় মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। আমার স্বামী অনেকটা মাথা খাটিয়ে চেষ্টা করেছে ওখান থেকে আমাকে বের করার। প্লেনের সামনের অংশটা ভেঙে গিয়েছিল। আমাদের কাছাকাছি চার-পাঁচটি সিটও ভেঙে গিয়েছিল, সেই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, সেই জায়গা থেকে আলো আসছিল। তখন আমার স্বামী কোনো মতে ওইদিক দিয়ে বের হয়েছে। তারপর উনি (স্বামী) আমাকে ডাকলেন, ‘তুমি আস।’ তখন ভাবি এগিয়ে এসে ওই ফাঁকাটা দিয়ে ঢুকে গেছেন। আমি বের হতে পারিনি। ওই সময় আমার মাথার উপর বক্সটা ভেঙে গিয়েছিল (মাথার ওপর হ্যান্ড ব্যাগেজ রাখার কেবিন)। সে সময় আমি আমার ভাসুরকে দেখতে পাচ্ছিলাম। উনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, শিশুটা ছিটকে পড়ে গিয়েছিল।

Manual1 Ad Code

অনেক মানুষের মাথা দেখতে পাচ্ছিলাম। তারা বের হওয়ার চেষ্টা করছিল অথবা বের হতে পারছিল না। কারণ তারা শরীর নাড়াতে পারছিল না। ভাইয়া (ভাসুর) যেখানে ছিল সেখান থেকে আগুন জ্বলছিল, ধোঁয়া এসে আমার নাকে লাগছিল। মনে হচ্ছিল এ আগুনে পুড়েই তো মরে যাব। এরপর আমার মাথাটা কোনো মতে প্লেনের ভাঙা অংশ দিয়ে বের করি। আমার হাসব্যান্ড যতটুকু গিয়েছিল ততটুকু আবার ফেরত এসেছে তারপর আমার হাত ধরে টেনে বের করেছে। তা না হলে আমি বের হতে পারতাম না, কারণ আমার শরীরে কোনো শক্তি ছিল না। বের হওয়ার পর ঘাসের উপর পড়েছিলাম।

নেপালের হাসপাতালে বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা

প্লেনটি ক্রাশ এবং ভেতরে ধোঁয়া সৃষ্টি হলেও কোনো অক্সিজেন মাস্ক বের হয়নি। ইমার্জেন্সি অ্যালার্মও দেয়নি। একটা প্লেনে অক্সিজেন মাস্ক থাকবে না? যখন দুর্ঘটনায় পড়বে তখন অক্সিজেন মাস্ক তো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হওয়ার কথা। অক্সিজেন থাকলে অনেক মানুষ সুস্থ থাকত, অন্তত শ্বাস নিতে পারত। যদি অক্সিজেন মাস্ক থাকত তবে অনেকে সজ্ঞান থাকত এবং বের হতে পারত। মানুষ বেরই হতে পারেনি। আমি ধোঁয়া খেয়েছি, আমি বুঝতে পারছি। ধোঁয়ার কারণে মাথাটা ঘুরে উঠে, কিছু বোঝা যায় না, অজ্ঞান অজ্ঞান লাগে।

আমার পর আরও দুই-তিনজন মানুষ বের হয়েছিল। আমরা বের হওয়ার ২ মিনিটের মাথায় বড় একটা ‘ব্ল্যাস্ট’ হয়। চোখের সামনে বিধ্বস্ত প্লেনের আগুন জ্বলতে দেখছিলাম। যারা উদ্ধারের জন্য গিয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিস, তাদের আমার অভিজ্ঞ মনে হলো না। তারা আগুন কন্ট্রোলে আনতে পারছিল না। তাদের কেউ ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল না। একটু ব্লাস্ট হলেই সবাই পেছনে দৌড়ে চলে যাচ্ছিল।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code