মে দিবসের তাৎপর্য

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৩ years ago

Manual4 Ad Code

সম্পাদকীয়: মজুরি শ্রমিকের জন্ম ও বিকাশের সঙ্গে পুঁজিবাদের জন্ম ও বিকাশের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। মজুরি শ্রমিকের সংখ্যাবৃদ্ধি ছাড়া পুঁজিবাদের অস্তিত্ব ও বিস্তার সম্ভব হয় না। সেজন্য ইউরোপে শিল্পবিপ্লব কালে একদিকে যেমন পুঁজিপতি একটি শ্রেণি হিসাবে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি হয়েছে শ্রমিক শ্রেণি। একইসময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় একই চিত্র ছিল। কাজের সময় কিংবা মজুরির তখন ঠিক ছিল না। ক্রমেই নারী-শিশুসহ শ্রমিকদের অবর্ণনীয় জীবন পরিবর্তনের জন্য অসংখ্য প্রতিবাদ-বিক্ষোভ তৈরি হয়, সংগঠন গড়ে ওঠে।
উনিশ শতকের ৬০/৭০/৮০ দশকের এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতাতেই ১৮৮৬ সালের মে মাসের ১ তারিখে তিন লক্ষাধিক শ্রমিকের ধর্মঘট চলাকালে শিকাগো শহরের বড় সমাবেশে হামলা হয়। গুলিতে নিহত হন শ্রমিকরা, পরে আবার প্রহসনমূলক বিচারে শ্রমিক সংগঠকদেরই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এ জীবনদান বৃথা যায়নি। একসময়ে যে দাবিকে বলা হয়েছে উন্নয়নবিরোধী, সন্ত্রাসী-ক্রমে সারা বিশ্ব সেই দাবিই গ্রহণ করেছে, মে দিবস পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক দিবসে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেই ইতিহাস স্মরণ করতে ভয় পায়। তাই সারা বিশ্বে মে দিবস পালিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারিভাবে এটি পালিত হয় না। তারা শ্রম দিবস পালন করে ৪ সেপ্টেম্বর!

Manual7 Ad Code

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে সমাজ ও অর্থনীতির মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো হয়েছে তার একটি বড় বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির গঠনের পরিবর্তন। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কারের নামে ’৮০ দশক থেকে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষিত হয়েছে। ২০০২ সালে বন্ধ হয়েছে আদমজী জুট মিল, গত কয় বছরে বাকি সব জুট মিল, চিনিকল। ’৮০ দশক পর্যন্ত এ রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের শ্রমিকরাই ছিল দেশের শিল্পশ্রমিকদের প্রধান সংগঠিত অংশ। সরকার নির্বিশেষে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা বন্ধ করার প্রক্রিয়াটি শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ ব্যক্তি দখলে নেওয়ার প্রক্রিয়াই নয়, এটি একইসঙ্গে শিল্পশ্রমিকদের সংগঠিত শক্তিকে ভেঙে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অংশ। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে শিল্প খাতের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাতের খুবই প্রান্তিক। একই কারণে ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যাও তুলনায় অনেক কম। রপ্তানিমুখী খাত হিসাবে গার্মেন্টস শিল্প খাতের মধ্যে এখন প্রাধান্যে। শিল্প খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শ্রমিক এ খাতেই নিয়োজিত। এ খাত অনেক বেশি আলোচিত হলেও এখানেও ইউনিয়নের সংখ্যা হাতেগোনা, অন্যান্য সংগঠনের অবস্থাও খুবই দুর্বল।

Manual3 Ad Code

অন্যদিকে গত কয়েক দশকে একই অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে উদ্ভূত হয়েছে কয়েক হাজার দখলদার চোরাই কোটিপতি। তাদের রক্ষা করতে দাঁড়িয়েছে মাফিয়া রাষ্ট্র। উৎপাদনশীল প্রক্রিয়া অব্যাহত এবং বিকশিত করার চাইতে অতিশোষণ, দখল, লুণ্ঠন ও পাচারের মধ্য দিয়ে দ্রুত সম্পদ কেন্দ্রীভবন এবং তা নিশ্চিত করতে সর্বজনের গণতান্ত্রিক অধিকার চুরমার করাই তাদের প্রধান কাজ। বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি প্রধানত তাদের নিয়ন্ত্রণে। সেই কারণে জনগণের বৃহত্তম অংশ শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ তাদের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত-বেশিরভাগ শিল্প-কারখানায় কর্মক্ষেত্রে ন্যূনতম বাঁচার মতো মজুরি, ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবস, নিয়োগপত্র, সাপ্তাহিক ছুটি, কাজ ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা-এসবের অধিকাংশই অনুপস্থিত। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠা এখনো অব্যাহত নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিষয়। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য ধরপাকড়, হামলা, নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। যতগুলো আছে, তার মধ্যে পোষা ইউনিয়নেরই আধিক্য দেখা যায়।

Manual2 Ad Code

গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির গঠনে লিঙ্গীয় পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হয়েছে। এ খাতে অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। এর বাইরেও বিভিন্ন পেশাতেই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। নারী ক্ষমতায়নের বহু গল্প শুনি আমরা, কিন্তু প্রতিদিনের খবরের কাগজে এ শ্রমজীবী নারীর নিরাপত্তাহীনতা, খুন, ধর্ষণ, হয়রানির খবর আসে। অব্যাহত বঞ্চনা ও নিপীড়ন মোকাবিলা করতে গিয়ে নারীশ্রমিক এক নতুন প্রতিবাদী সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের সব অঞ্চলেই পুঁজির ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার কাছে শ্রমশক্তি বিক্রির মানুষ অর্থাৎ মজুরেরও বিস্তার ঘটে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বহুদূর। সেজন্য শুধু শিল্প খাতের মধ্যেই শ্রমিক পরিচয় সীমাবদ্ধ রাখলে পুঁজির আধিপত্য ও ক্রিয়ার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। প্রযুক্তি বিকাশের মধ্য দিয়ে শ্রমশক্তি বিক্রেতাদের মধ্যে বহু ধরন তৈরি হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত, কিন্তু সর্বক্ষণ অনিশ্চিত কাজে নিয়োজিত ডিগ্রিপ্রাপ্ত এখন অনেকেই। কাজেই মে দিবস যাদের ঐক্য ও সংহতির বার্তা দেয়, তারাই সমাজের ৯৯ শতাংশ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code