মৌচাক বেঁচে থাক যুগযুগ মানুষের অন্তরে  

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual7 Ad Code

মাহবুবুর রহমান

একই ছাদের  নিচে থাকার উদ্দেশ্যে  সবার সাথে সবার ভাব আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে কিছু সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য অংগীকারাবদ্ধ হয়ে একই অঞ্চলের মানুষগুলোকে একই সুঁতায় বেঁধে একে অপরকে সুখে দু:খে প্রয়োজনে – অপ্রয়োজনে পাশে থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে  সমাজের অবহেলিত মানুষগগুলোকে সঠিক রাস্তা দেখানোর শপথ নিয়ে সব অঞ্চলেই গড়ে উঠে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সংগঠন।

Manual1 Ad Code

Manual3 Ad Code

সামাজিক সংগঠন গড়ার সময় একটি কথা প্রায়ই  উচ্চারিত হয়    “কিছু গড়া   সহজ কিন্তু টিকিয়ে রাখা কঠিন “। সমমনা কয়েকজন এক হয়ে প্রায়শই আমরা ক্লাব সংগঠন গড়তে দেখি। কয়েক মাস-বছর তাদের কার্যক্রম খুব প্রশংসা কুড়ায়। তারপর ধীরে ধীরে সেই জৌলুস হারিয়ে একটা সময় বিলীন হয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু সংগঠন যে ব্যাতিক্রম নয় তা নয়। কিছু সংগঠন যুগযুগ ধরে স্বমহিমায় টিকে আছে মানুষের সেবায় মানুষের মাঝে। তেমনি একটি সংগঠন “মৌচাক সাহিত্য কেন্দ্র”।

পশ্চিমে শুকনা ছড়া আর পূর্বে ফানাই নদী। চারপাশে সবুজের সমারোহ। নীল আকাশের নিচে যেন সবুজ গালিচা পেতে আছে সজীব প্রকৃতি। উঁচু-নিচু টিলা এবং টিলাঘেরা সমতলে সবুজের চাষাবাদ। শুধু সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে টিলা বেষ্টিত ছোট ছোট জনপদ। পাহাড়ের কিনারা ঘেষে ছুটে গেছে আকাবাঁকা মেঠোপথ। কোন যান্ত্রিক দূষণ নেই। কোথাও আবার ধাবমান পথে ছুটে চলছে রূপালী ঝর্ণাধারা। প্রকৃতির সকল সৌন্দর্যের সম্মিলন যেন এখানে। এমন অন্তহীন সৌন্দর্যে একাকার হয়ে আছে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার সীমান্ত    ঘেঁষা   বিশাল   এলাকা    নিয়ে    অবস্থিত   কর্মধা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের কিছু চৌকষ মেধাবীর হাত ধরে ১৯৯৬ সনে প্রতিষ্ঠিত হয় সামাজিক সংগঠন  “মৌচাক সাহিত্য কেন্দ্র “।

Manual6 Ad Code

প্রতিষ্ঠা কাল থেকে আজ-অবধি সংগঠনটি আপন আলোয় আলোকিত করে চলছে উপজেলার পুরো দক্ষিণ অঞ্চলকে। সাহিত্য সংস্কৃতি ও সমাজসেবায় আজও বিশেষ অবদান রেখে চলছে দুই যোগ আগে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি।

মৌচাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য “কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয়ের’ প্রাক্তন শিক্ষার্থী হওয়ায় এর সাহিত্য কর্মসূচি শুরুতে ছিল কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রীক। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে মৌচাকের দেয়ালিকা প্রকাশিত হত যা আমরা যারা তখন কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তাদের কাছে এটি ছিল নতুন এক  বিষ্ময়!

১৯ ৯৭ সালে মৌচাক গ্রহণ করলো আরো সাহসী উদ্যোগ। একদিন স্কুল শেষে সব ছাত্র ছাত্রীদের এক করে মৌচাকের সভাপতি এম. এ আজিজ ভাই ও সম্পাদক আজিজুর রহমান রাসেল ভাই  জানালেন মৌচাক প্রকাশ করতে যাচ্ছে তাদের প্রথম সাহিত্য ম্যাগাজিন “প্রবল রোদের হাতছানি’। বিজয় দিবসে এক আড়ম্বরপূর্ণ  প্রকাশনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছিল কর্মধা ইউনিয়নের প্রথম সাহিত্য ম্যাগাজিন “প্রবল রোদের হাতছানি”।

১৯৯৮ সন থেকে  (শুধু রমজান মাস ব্যাপী )   কয়েক বছর  “বিদ্যানিকেতন কোচিং” পরিচলনা করে মৌচাক সাহিত্য কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর মৌচাক থেকে শিক্ষা অনুদান ও পাঠ্যবই পেয়ে গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা  নিসন্দেহে উপকৃত হয়েছে যা দেখে এ অঞ্চলে অন্য বিত্তবানরাও এগিয়ে এসেছেন  এই রকম কার্যক্রম ছড়িেয় দিতে বিভিন্ন এলাকায়।কর্মধা ইউনিয়নে  এই মহতি কাজ শুরু করেছিল মৌচাক। সে সময় প্রতি বছর এসএসসি উত্তীর্ণদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনে মৌচাক কখনো কার্পণ্য করেনি।

২০০০ সালে মৌচাকের দ্বিতীয় প্রকাশনা “অবিনাশী উচ্ছ্বাস”। এবার আরো প্রকাশিত হলো আরও বর্ধিত  কলেবরে। প্রথম ম্যাগাজিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় প্রকাশনা। আমি তখন কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী। এই ম্যাগাজিনে  ‘রবির হাট”  নামক আমার একটি ছড়া স্থান করে নিয়েছিল।  জীবনে প্রথম কোনো লেখা মৌচাকের ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। তখনকার অনুভূতি এখন  বলে বুঝাতে পারবোনা।
প্রকাশনা অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল বিশাল আয়োজন। কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিশাল মঞ্চ আর  সামিয়ানা টাঙানো  হয়েছিল ; যদিও প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে মূল অনুষ্ঠান স্কুল অডিটোরিয়ামে করতে হয়েছিল সেদিন । মৌচাক সাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান উপদেষ্টা সাবেক চেয়ারম্যান   জনাব নজিব আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক সচিব কবি ও সাহিত্যক এ. এইচ. মোফাজ্জল করিম। সেই অনুষ্ঠানে কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় সাতশো ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে স্বাগত বক্তব্য প্রদানের জন্য আমাকে মনোনীত করায় আবারও কৃতজ্ঞতা সেদিনের মৌচাক কর্মকর্তাদের । প্রয়াত প্রধান শিক্ষক বাবু নবেন্দু দাস স্যারের আন্তরিকতায় মৌচাকের প্রতিটি কার্যক্রম অনায়াসে বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে দেখেছি।

মৌচাকের কোনো সদস্য পদ আমার ছিলনা। কিন্ত আজিজ ভাই, রাসেল ভাই, জামিল ভাই,খায়রুল ভাই, কাদির ভাই জালাল ভাই, রসিদ ভাইয়ের স্নেহস্পর্শ থাকায় মৌচাকের কার্যক্রম কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল যা পরবর্তীতে বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করতে আমার উপকারে এসেছিল।

Manual5 Ad Code

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ২০০১ সালে কর্মধা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হই (আতিক-ময়নুল-মাহবুব কমিটি হয়)।  দক্ষিণ লংলার জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন “আনন্দ ধারা “-র সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন কালে বহু  অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও মঞ্চ নাটকে অভিনয় করার সুযোগ হয়।  “রাইজিং স্টার ক্লাব” দক্ষিণ লংলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সহ অনেক সংগঠনের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য  হয়েছে ।  কিন্তু স্কুলজীবনের  কৈশোরে মনের মণিকোঠায় মৌচাকের জন্য যে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জন্ম নিয়েছে তা আজও অম্লান আছে।

২০০৩ সালে “প্রকৃতির পাদদেশে”, ২০০৮ সালে “তরী বেয়ে তীরে” সহ মোট চারটি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় মৌচাক সাহিত্য কেন্দ্রর হাত ধরে। শিক্ষা বিস্তার কিংবা সাহিত্য কর্মসূচির পাশাপাশি মৌচাকের রয়েছে সমাজ সেবার অনন্য নজির। বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থের সহযোগিতায় মৌচাকের হাত প্রশস্ত ছিল সবসময়। বন্যা  দুর্গত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ, শীতার্তদের মধ্যে শীত বস্ত্র বিতরণ, করোনা দুর্যোগে টনা পাঁচ বার গরীব মানুষের মানুষের পাশে দাঁড়ায় মৌচাক।

মফস্বলের একটি সংগঠন সরকারি কোনো  সাহায্য না পেয়েও দুই যোগ পেরিয়ে আজ রজত জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। দোয়া করি মৌচাক যেন একদিন তার সুবর্ণজয়ন্তী – হীরক জয়ন্তী পালন করে এবং  এভাবে মানুষের সেবায় কাজ করার মাধ্যমে সগৌরবে  যুগ যুগ বেঁচে থাকে মানুষের অন্তরে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code