রবীন্দ্রনাথের সন্ধানে

লেখক:
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual3 Ad Code

 

মিহিরকান্তি চৌধুরী::: 

 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান সাহিত্যপ্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাই।

 

রবীন্দ্রনাথ আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রধান স্তম্ভ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিশ শতকের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি অসংখ্য মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা করেছেন। শুধু বাংলা বা ভারত নয় পুরো বিশ্বকেই প্রভাবিত করেছেন। আর এখনও রবীন্দ্র্রনাথ আমাদের জীবনকে একইভাবে প্রভাবিত করে চলেছেন কারণ তাঁর পর এতো বড় মাপের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব আমাদের সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতিতে আসেননি। তিনি তো শুধু সাহিত্যচর্চা করেননি। গ্রাম-সংগঠনে নিরলসভাবে কাজ করেন যিনি, মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ান যিনি, নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখেন যিনি, শিক্ষা বিস্তারে উন্নয়নের তত্ত্ব দেন যিনি- তিনিই রবীন্দ্র্রনাথ। কতভাবেই তো রবীন্দ্র্রনাথের পরিচয় তুলে ধরা যায়! রবীন্দ্রনাথ আজও যে আগের মতোই প্রাসঙ্গিক তার বেশ কিছু কারণ ও পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে।

Manual8 Ad Code

 

জন্মের পর একশ’ ষাট বছর অতিক্রান্ত; মৃত্যুর পরও আমরা পেরিয়ে এসেছি আশি বছর; তবু বাংলাভাষী মানুষের কাছে রবীন্দ্র্রনাথের অব্যাহত প্রভাব দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিমাণ বিপুল; লিখেছেন আড়াই হাজারের মতো গান, এঁকেছেন দু’সহস্রাধিক চিত্র, প্রতিষ্ঠা করেছেন মানবকল্যাণমূলক অনেক প্রতিষ্ঠান। কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রবন্ধকার, ছড়াকার, ভ্রমণসাহিত্যিক, গীতিকার, গায়ক, সুরকার, অনুবাদক, চিত্রশিল্পী, সমাজ সংস্কারক, পরিবেশবিদ কতই না তাঁর পরিচয়। তাছাড়া, সাহিত্যমাধ্যমে কত পরীক্ষানীরিক্ষা করেছেন তাও বিষ্ময়কর। কাব্যনাট্য, নাট্যকাব্য, প্রতীক নাটকের মতো বিষয় ও মাধ্যম তাঁর হাত ধরেই এসেছে। যে কোনও একটা দিয়েই তিনি খ্যাতিমান হতে পারতেন। সেখানে বহুমাত্রিক সত্ত্বার এক অভূতপূর্ব সহাবস্থানে তিনি সত্যিকারভাবেই ছিলেন অনন্য, এখনও আছেন। তাঁর সাহিত্য ও সংগীত বাঙালির চিরকালীন সম্পদ, বাঙালির আত্মমুক্তির অফুরন্ত উৎস। শুধু প্রেরণার উৎসই নয়, আগামী সৃষ্টিরও ভিত্তি।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ চর্চার অনেক সমস্যা আমাদের দেশে, বিশ্বে।

 

১. রবীন্দ্রনাথ চর্চার সুযোগ অনেক কম। আনুষ্ঠানিকভাবে ছোটো ক্লাসে একটি কবিতা, জুনিয়র, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিটি পর্যায়ে একটি করে কবিতা বা একটি ছোটোগল্প। এর বেশি কিছু নয়। শুধু বাংলা অনার্স, মাস্টার্স পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীরা রবীন্দ্রনাথকে ভালো করেই চেনেন, চেনার সুযোগ থাকা ছাড়াও সাহিত্য পড়ার মানসিক অবকাঠামো তৈরি হয়।

 

২. রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলা বিভাগেই কেন পাঠ্য হবেন? ইংরেজি বিভাগে কেন নয়? ইংরেজি বা অন্য যেকোনও সাহিত্য পড়তে গেলে বিশ্বসাহিত্যের অন্য যেকোনও প্রধান সাহিত্যের একটি পড়তে হয়। দুএকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ভারত বা বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ বিশ্বসাহিত্যের ওই নৈতিক বাধ্যবাধকতা মানতে বাংলাকে পাত্তাই দেয় না, রবীন্দ্রনাথ তো আরও পরে।

 

৩. রবীন্দ্রনাথ অর্থনীতি বিভাগে কেন পাঠ্য নন? রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন ভাবনা, সমবায় ভাবনা ওই সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী চিন্তা ছিল। শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে গ্রামোন্নয়ন ও পুনর্গঠনের লক্ষে বহুমুখী প্রকল্প চালু করেছিলেন। নিজের ছেলেকে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিয়ে হালচাষে লাগিয়েছিলেন। ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ হাতে ট্রাক্টর চালিয়েছেন। রবীন্দ্র্রনাথ ক্ষুদ্র ঋণের প্রথম তত্ত্ববিধ। নোবেল পুরষ্কারের টাকা দিয়ে কৃষি ব্যাংক চালু করেছিলেন। এত কিছুর পরও অর্থনীতি বিভাগে জায়গা হয় না।

 

৪. রবীন্দ্রনাথ সমাজকর্ম, সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদি বিভাগে কেন পাঠ্য নন? তাঁর সমাজ সংস্কার শুধু কি গল্প, সাহিত্য, উপন্যাস, নাটকে? আজ থেকে একশ এগারো বছর আগে নিজের ছেলেকে বিধবার সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন।

Manual8 Ad Code

 

৫. রবীন্দ্রসাহিত্যের ব্যাপক অনুবাদ হয়নি, হচ্ছে না। যা কিছু হয়েছে বা হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। জীবদ্দশায় নিজেই করেছেন কিছু, কিছু করেছেন আত্মীয়স্বজন।

 

Manual2 Ad Code

৬. রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি বলা হয়। এক হিসেবে ঠিক আছে। একটি আঞ্চলিক ভাষাকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই বিশ্বভাষার প্রধান কবি অবশ্যই বিশ্বকবি। অন্য বিবেচনায় এই অভিধা যথোপযুক্ত নয়। তিনি যে বিশ্ব কবি হবেন পৃথিবীর অনেক দেশের মূল ¯্রােতধারার কবি-সাহিত্যিকরা রবীন্দ্রনাথের নামই শোনেননি। আবার অনেক জায়গায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পঠিত হচ্ছেন, তাঁর মূল্যায়নও হচ্ছে। পৃথিবীর কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে গ্যালারি আছে, আছে অন্যান্য প্লাটফমে। তাঁর স্ট্যাচু আছে কোনও কোনও জায়গায়। কথা হল, বিষয়টি ইউনিফর্ম নয়। ওইসব দেশের পাশের দেশই হয়ত আরেক দেশ চেনে না। রবীন্দ্রনাথ চর্চিত হচ্ছেন, তাঁকে নিয়ে পৃথিবীর নানা জায়গায় কাজ হলেও তা ছিটমহলের মতো, এখানে, সেখানে, বিশেষ বিশেষ জায়গায়। তিনি মুলত বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপূর্বাঞ্চল এবং সারা পৃথিবীর নানা জায়গায় বাংলাভাষী ছোটোবড়ো পকেটের কবি। আমরাই তাঁকে বিশ্বকবি হতে দেইনি। অনুবাদ তো পরে, পড়িই তো না। আমাদের ব্যবসা, দোকান চালাতে যতটুকু দরকার ততটুকুই।

Manual6 Ad Code

 

৭. তাঁকে ‘কবিগুরু’ অভিধাও দেওয়া দেওয়া হয়। সাম্মানিক অভিধা হিসেবে এটাকে মানা গেলেও ‘গুরুদেব’ একবারেই মানানসই নয়। খুব বেশি হলে আশ্রমিকরা যতদিন আশ্রম ছিল ততদিন এটা বলতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর আশ্রমিকরা এবং অ-আশ্রমিকরা কোনও কালে তাঁকে ‘গুরুদেব’ ডাকার যৌক্তিকতা নেই। একটি মসজিদের ইমাম বা টোলের পণ্ডিত কোনও স্কুলে ধর্মশিক্ষার শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হলে ছাত্ররা তাঁদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতে হয়; ‘হুজুর’, ‘ইমাম সাহেব’, ‘গুরুজী’ কিছুই চলে না। গুরুবাদী দর্শনে আশ্রিত হয়ে কবি, নাট্যকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করা সম্ভবপর নয়। প্রকৃত কবিগুরু তো ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশের শিক্ষক।

 

৮. একটা মহল রবীন্দ্রনাথকে পৌরাণিক চরিত্র বানিয়ে ফেলছেন। মুনিঋষির স্তর যাকে বলে। মনে রাখতে হবে তিনি একজন কবি, নাট্যকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী এবং সাহিত্যের ধারায় আরও অনেক কিছু । তাঁর রচনাসমূহ পড়তে হবে, তাঁকে সমালোচনা করতে হবে, তাঁর লেখার ব্যবচ্ছেদ করতে হবে, কোনও সমস্যা নেই। সাহিত্যপ্রতিভার পাঠ প্রয়োজন, আরাধনা নয়। অ্যা লিটারেরি ফিগার ইজ মেন্ট টু বি রেড, নট টু বি ওযারশিপড। যা কাম্য নয় তাই হচ্ছে। ভালো পাঠক বা ভালো শিষ্য কোনওটাই তৈরি হচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন রক্তমাংসের মানুষ, আমাদের মতো। তিনি নিজেও তো বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’।

 

৯. রবীন্দ্রনাথের গানই শুধু গাওয়া হচ্ছে। গানের কথার চর্চা নেই। আর গান যে গাওয়া হচ্ছে তা সর্বোচ্চ দুইশ, তিনশ, এর বেশি নয়। আছে প্রায় আড়াই হাজার।

 

১০. রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে কোনও কোনও পণ্ডিত মাজারের মহিমায় নিজের প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। সাধারণ জনগণের কাছে রবীন্দ্রনাথ সেভাবে পৌঁছচ্ছেন না। বিশ্বভারতীও কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় অনেক সুবিধার সাথে অনেক অসুবিধারও সম্মুখীন। আর ছোটোবড়ো লেখক, গবেষকরা কিছু কাজ করেই মূল্যায়ন আশা করেন, পুরষ্কার আশা করেন। এটা কি খাবার পানি যে কিছুদূর হাঁটার পর চাইতে হবে।

 

১১. রবীন্দ্রনাথ পুরো বাঙালি জাতির কাছে এখনও সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারেননি, কারণ যাই হোক। মুসলমান সমাজের একটা অংশ তাঁকে অ্যাকাডেমিক বাধ্যবাধকতায় পাঠ করলেও, পেশাগত বাধ্যবাধকতায় সমীহ করলেও, রবীন্দ্রঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও হৃদয় দিয়ে, অন্তরের অন্তস্থল দিয়ে তাঁকে নিজের করে নিতে নিজের সাথেই তাঁদের লড়াই করতে হচ্ছে। কোথাও না কোথাও একটা গ্যাপ আছে। কেউ মানুক বা না মানুক, এটাই বাস্তবতা। আবার মুসলমান সমাজেরই অনেক পণ্ডিত রবীন্দ্রচর্চার দিকপাল, সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, অনেক রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছেন। যাঁরা এমন হয়েছেন তার অনেকটা নির্ভর করে কে কোথায় পড়েছেন, কে পড়িয়েছেন। সাধারণভাবে কেন ভিন্ন ? রবীন্দ্রনাথের সাথে মুসলমান সমাজের কোনও বিরোধ ছিল না। অধ্যাপক ভুঁইয়া ইকবালের ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’ শীর্ষক বড়ো কলেবরের আকর গ্রন্থটি অনেক সন্দেহ দূর করবে। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আছে, তাঁর লেখায় মুসলমান চরিত্র কম। কথা সত্য কিন্তু কেন কম? মুসলমান সমাজের জীবনযাত্রা, মনস্তত্ত্ব জানার সুযোগ কম ছিল। যে কোনও রাজা, জমিদার, মিরাসদার বা অন্য কোনও ভূস্বামীর (হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে আমাদের বাংলাদেশসহ) নিজ বা ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রথম বা নিকটতম প্রতিবেশীও অনেক দূরে অনেক বাস করে। তাছাড়া, মুসলমান সমাজের প্রাত্যহিক বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনযাত্রার কিছু কঠিন (রিজিড) বাধ্যবাধকতা তাঁকে সতর্ক করে তোলে। তবে তিনি বেশ লিখেছেনও। অন্তত, বারেটি ছোটোগল্প রয়েছে যেগুলোতে মুসলমান সমাজের প্রাত্যহিক বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনযাত্রা, তাঁদের মূল্যবোধ, আবেগ প্রতিফলিত হয়েছে। আর সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল, মুসলমানদের ওই অংশ ১৮৭৬ (প্রথম রচনা) থেকে ১৮৯০ পর্যন্ত প্রায় দেড় দশকের রবীন্দ্রনাথকে যাচাই করেন। সেখানে তাঁর অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। তিনি শুধু একজন লিখিয়ে। ওই সময় বা তারও আগে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আরও বড়ো সাহিত্য প্রতিভা তাঁর পরিবারে একাধিক ছিলেন। উনিশ শতকের শেষ দশকে রবীন্দ্রনাথের নির্মাণ শুরু হয়। জমিদারি দেখাশোনা করতে আসেন শিলাইদহ, সাজাদপুর ও পতিসরে। আসার পরে ঔষধ বিক্রেতার পরিণতি ঘটে। ঔষধ বিক্রির চেয়ে গানই বেশি হয়। যতটা না হয় জমিদারির দেখাশোনা, তার চেয়ে বেশি হয় সাহিত্যসৃষ্টি, তার চেয়েও বেশি সাধারণ মানুষের সাথে চলাফেরা, পরষ্পরকে জানা। বিদায়ের সময় পতিসর, সাজাদপুর ও শিলাইদহের মানুষের আবেগতাড়না মিশ্রিত মানপত্রগুলো জানান দেয়, এই রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাকোঁর নন, এই রবীন্দ্রনাথ পদ্মাপাড়ের। এই দশ বছর রবীন্দ্রনাথকে ‘দ্য রবীন্দ্রনাথ’ এর দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে, সাহায্য করে। পদ্মাস্নাত রবীন্দ্রনাথ এক নতুন রবীন্দ্রনাথ, সংস্কারমুক্ত রবীন্দ্রনাথ। সব শেষে, রবীন্দ্রনাথ পতিসরে, সাজাদপুরে কালিমদ্দি, ইনাত আলী এবং জোড়াসাকোঁয় গফুর মিয়াকে বাবুর্চি রেখেছিলেন। কতটুকু সংস্কারমুক্ত হলে ব্রাহ্মণ্যবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করা যায় তা অনুমান করা যেতে পারে, আর কোনওভাবে সম্ভবপর নয়। সুতরাং প্রথম ত্রিশ (১৮৬১-১৮৯১) বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে যাচাই করুন। পরেরটাই বিবেচ্য। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অধ্যাপক গোলাম আযমের ভুমিকা থাকলেও পরেরটা (১৯৭১) আগেরটাকে ম্লান করে দিয়েছে। প্রথম জীবনের কবি আল মাহমুদের বেইল শেষ জীবনের কবি আল মাহমুদের কাছেই ছিল না, অন্যরা তো পরে। যেকোনও কিছু বিবেচনায় সর্বশেষ স্ট্যাটাসই বিবেচ্য। জাল নোট যেই বানাক সর্বশেষ যার কাছে পাওয়া যায় পুলিশ তাকেই ধরে। গঙ্গার সাঁতারু রবীন্দ্রনাথের চেয়ে পদ্মাস্নাত রবীন্দ্রনাথ অনেক বেশি শক্তিশালী, মানুষ হিসেবে, সাহিত্যপ্রতিভা হিসেবে।

 

১২. রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বিরোধিতা করেছিলেন কিনা তার উপসংহার এখনও আসছে না। করেননি বলেই মনে হয় তবে প্রতিষ্ঠার পূর্বে পক্ষে ছিলেন বলেও কোনও দালিলিক প্রমাণ নেই। প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষক পাঠানোসহ নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তিনি যে বিরোধিতা করেননি তার দুএকটি কারণ বলি। প্রথমত, তিনি বাইরে সবসময় উৎফুল্ল থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার সময় (১৯১২-১৩) মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিলেন। নিজের বড়ো মেয়ে ও মেয়ের জামাইর সাথে দূরত্ব। নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার পর অনেক লোক তাঁকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলেন। যাননি শুধু বড়ো মেয়ে মাধুরীলতা ও মেয়ের জামাই শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী। এর আগে স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে হারিয়েছেন, হারিয়েছেন দ্বিতীয় মেয়ে রেণুকা ও ছোটো ছেলে শমীন্দ্রনাথকে। দ্বিতীয়ত, তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা আছে। সেখানে আরেকটাতে বাগড়া দিতে যাবেন কেন? উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী একই সালে প্রতিষ্ঠিত হয় (১৯২১)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার কিছু আগে ১৯১৮ সালের মহামারীতে রবীন্দ্রনাথ বিপর্যস্ত ছিলেন। তাঁর অনেক নিকটজনকে বাঁচাতে পারেননি। নিজে ছিলেন মাঠে সেবক রবীন্দ্রনাথ হয়ে। তার মধ্যে ১৯১৮ সালে নিজের বড়ো মেয়ে মারা যান। সেই সর্বাঙ্গ বিপর্যস্ত ব্যক্তি দুই বছরের মাথায় বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। আসলে যাঁরা বিরোধিতা করেছিলেন তাঁদেও মধ্যে প্রধান ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর আশক্সক্ষা ছিল, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় রোজগার একেবারেই কমে যাবে কারণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েটেড কলেজের সংখ্যা পূর্ববঙ্গে বেশি ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে এগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অ্যাফিলিয়েটেড হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আরও অনেকের বিরোধিতা ছিল। এঁদের মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুমুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। বেশিরভাগই নানা মাত্রার বৈষয়িক কারণ। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় চার অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিনিময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সম্মত হন। প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তৃতীয়ত, নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ আমন্ত্রিত হয়ে আসেন ও ব্যাপকভাবে সংবর্ধিত হন। অন্য কিছু থাকলে এভাবে আমন্ত্রিত হয়ে সংবর্ধিত হতেন না। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দূরবর্তী কোনও বৈষয়িক চিন্তা থাকতেও পারে। এক পাড়ায় তিন ফার্মেসি যখন হয় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী), নতুন উদ্যোক্তা খানিক ভাবতেই পারেন। তবে সাম্প্রদায়িক ভাবনায় তিনি তাড়িত ছিলেন না। এ বিষয়টি নিয়ে আরও দীর্ঘ আলোচনা করলে নতুন প্রজন্ম উপকৃত হতে পারে।

 

আমাদের সামনে অনেক রবীন্দ্রনাথ- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ, পৌরাণিক রবীন্দ্রনাথ, সাহিত্যপ্রতিভা রবীন্দ্রনাথ, নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ, নাইটহুড জয়ী স্যার রবীন্দ্রনাথ, সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ, অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ, সর্বজনীন রবীন্দ্রনাথ। অনেক হিটলারের মতো অনেক রবীন্দ্রনাথ। পঠন-পাঠনই প্রকৃত রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে দিতে পারে।

 

লেখক পরিচিতি: মিহিরকান্তি চৌধুরী : লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code