শতাব্দীর সাক্ষী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী(র.) ছিলেন আমার দেখা সেরা রাজনীতি ও সমাজ সচেতন পুরুষ

লেখক:
প্রকাশ: ৪ years ago

Manual6 Ad Code

এ.এম.এম.বাহাউদ্দিনঃ

পারিবারিকভাবেই আমরা আলেম-উলামা, পীর-
মাশায়েখ ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব পরিবেষ্টিত হয়ে বড়
হয়েছি। পরম শ্রদ্ধেয় বুযুর্গানে দ্বীনের মধ্যে কিছু ব্যক্তিত্ব আমার কাছে বিশেষ বৈশিষ্ঠ্যে সমুজ্জ্বল মনে হয়েছে।
যেমন, ইবাদত-বন্দেগী, এলম-আমল, তাকওয়া-পরহেযগারী ও কষ্ট-সাধনার দেখা অনেকের মাঝেই পেয়েছি। কিন্তু সুদৃঢ় ঈমান, মুমিনের উচ্চতর নৈতিক শক্তি, তাগুতের বিরুদ্ধে খোদাপ্রেমিকদের অনন্ত লড়াই, উম্মাহ বনাম কুফুরী অপশক্তির চিরন্তন সংঘাত প্রভৃতি বিষয়ে পূর্ণ সচেতন সাহসী সাধক ব্যক্তি কমই দেখেছি।
সিলেটের হযরতুল আল্লাম মাওলানা আব্দুল লতীফ
চৌধুরী ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী ১৯১৩ সালে
জকিগঞ্জ থানার ফুলতলী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) এর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম
হযরত শাহ কামাল (রহ.)-এর অধস্তন পুরুষ হযরত আলা বখশ (রহ.)-এর অধস্তন বংশধর।

২০০৮ সালের ১৫ জানুয়ারি দিবাগত রাত তাহাজ্জুদের সময় শহরের সোবহানীঘাটস্থ নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল পর্যন্ত তার সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনটি ছিল অনন্য ও বর্ণাঢ্য। তিনি বৃটিশ ভারতে অসাধারণ প্রতিভাধর ছাত্র হিসেবে বিখ্যাত সব প্রতিষ্ঠানে যুগশ্রেষ্ঠ উস্তাদগণের নিকট ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন।
ইলমে কেরাতের উপর তার বহুমাত্রিক বুৎপত্তি ছিল
উল্লেখ করার মতো। ছাত্রজীবন শেষে তিনি
এলমে কেরাত প্রসার ও উচ্চতর দীনি শিক্ষা প্রদানে
আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু তার জীবনে আধ্যাত্মিক
প্রেরণা ও দিগি¦জয়ী রূহানী শক্তি তাকে অনন্য
বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল করে তুলে। মাদরাসার সুযোগ্য
উস্তাদ ভাইস প্রিন্সিপাল ও প্রিন্সিপাল ইত্যাদি পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ফুলতলীর পীর ছাহেব কিবলাহ। তার প্রিয় এক কবিতায় তার জীবনাদর্শ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাসাওফ বজুয খেদমতে খালকে নিস্ত। বসাজ্জাদা তাসবীহ ওয়া দালকে নিস্ত।
অর্থাৎ- মানুষের কল্যাণ ও সৃষ্টির সেবা ছাড়া তাসাওউফ কিছুই নয়। শুধু জায়নামাজ, তসবীহ ও খিরকার নাম তাসাওউফ নয়।
তিনি তার স্বদেশকে শিরক কুফর কুসংস্কার ও অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে আলোকময় উন্নত মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তার জীবনের শেষ বেলায় দেশ ও জাতির নানা কল্যাণময় কাজে আমাদের এক সাথে ভূমিকা রাখতে হয়েছে।
সেসময় অন্য অনেক বুযুর্গকে দেখেছি এলম আমল জিকির ও সাধনায় অনেক অগ্রসর হলেও কওম ও
মিল্লাতের বৃহত্তর স্বার্থে তাদের অবদান তেমন
স্পষ্ট নয়। তারা আধ্যাত্মিক সাধক বটে তবে বৃহত্তর
দ্বীনি রাজনীতি-সচেতন নন। জাতির দিক-নির্দেশক
বটে তবে সমাজ সচেতন নন। এ ক্ষেত্রে ছাহেব
কিবলা ফুলতলী ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন
রাজনীতি সচেতন মহান আধ্যাত্মিক পুরুষ।
সমাজ সেবায় তার অপরিসীম অবদানের কথা যুগ যুগ
ধরে মানুষ স্মরণ রাখবে। তিনি সমাজ ও মানবকল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেন দারুল কিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট, লতিফিয়া এতিমখানা, বাদে দেওরাইল ফুলতলী আলিয়া মাদরাসা, হযরত শাহজালাল দারুচ্ছুন্নাহ ইয়াকুবিয়া কামিল মাদরাসা, লতিফিয়া কমপ্লেক্স, বাংলাদেশ আঞ্জুুমানে মাদারিসে
আরাবিয়া, বাংলাদেশ আঞ্জুুমানে আল-ইসলাহ, লতিফিয়া ক্বারি সোসাইটি, বাংলাদেশ আঞ্জুমানে তালামীযে ইসলামিয়া, ইয়াকুবিয়া হিফযুল কোরআন বোর্ড, মুসলিম হ্যান্ডস বাংলাদেশ।

Manual1 Ad Code

স্বদেশেই শুধু নয়, দূর প্রবাসে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তুলেছেন কিছু প্রতিষ্ঠান। ইলমে
কিরাত, ইলমে হাদীস, ইলমে তাসাওফসহ সব ধরনের খিদমত পরিচালনার জন্য তিনি বিদেশেও কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তন্মধ্যে দারুল হাদীস লতিফিয়া, আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকে, লতিফিয়া উলামা সোসাইটি ইউকে, লতিফিয়া কারি সোসাইটি ইউকে, লতিফিয়া ফুলতলী কমপ্লেক্স মিডল্যান্ড, সিরাজাম মুনিরা জামে মসজিদ বার্মিংহাম ইউকে লিমিটেড, দারুল হাদিস লতিফিয়া মাদরাসা, ওল্ডহাম, ফুলতলী ইসলামিক সেন্টার
কভেন্ট্রি ইউকে, আল ইসলাহ ইয়ুথ ফোরাম, লন্ডন
কিরাত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আল মজিদিয়া ইভনিং মাদরাসা, লতিফিয়া গার্লস স্কুলসহ বহু মসজিদ মাদরাসা উল্লেখযোগ্য।

Manual3 Ad Code

আমেরিকায় তার নির্দেশনা ও দোয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় আল ইসলাহ ইসলামিক সেন্টার। এর
আওতায় আল ইসলাহ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। আমেরিকায় এ মসজিদটিতে আদালতের রায় ও এলাকাবাসীর প্রকাশ্য ভোটের মাধ্যমে মাইকে আযান চালু করা হয়।
২০০১ সালে তার দোয়া ও নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত হয় নিইউয়র্ক সিটি হাফেজিয়া মাদরাসা। পরবর্তীতে এর নাম রাখা হয় নিউইয়র্ক সুন্নিয়া হাফিজিয়া মাদরাসা। ২০০৯ সালে নিউজার্সিতে শুরু হয় শাহজালাল লতিফিয়া মাদরাসা।
এ ছাড়াও আমেরিকায় ছাহেব কিবলাহ ফুলতলীর ভক্ত মুরিদদের প্রচেষ্টায় বহু সংখ্যক মসজিদ, মাদরাসা ও ইসলামিক সেন্টার স্থাপিত হচ্ছে। ভারত, পাকিস্তানসহ গোটা উপমহাদেশেও তার ভক্তদের দ্বারা অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং প্রচুর ধর্মীয় খিদমত হচ্ছে।

Manual2 Ad Code

হযরত ছাহেব কিবলার সাথে আমার বহু স্মৃতি এমন
রয়েছে যেসব আজো আমার চলার পথে পাথেয়
হয়ে আছে। ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার
পথে যখন আকস্মিক বাধা-বিপত্তি এসে দাঁড়িয়েছে
তখন তার কাছ থেকে আমরা শক্তি পেয়েছি, সাহস
পেয়েছি। মনে পড়ে ঐতিহাসিক লংমার্চের কথা, যখন
সিলেট থেকে ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের
দাবিতে ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী সিংহের মতই গর্জে
উঠেছিলেন, ছুটে এসেছিলেন রাজধানীর দিকে।
সে দিনগুলোর কথা মনে হলে মাওলানা হুছামুদ্দীন
চৌধুরী ও মাওলানা কবি রূহুল আমীন খানের সংগ্রামী ভূমিকার কথাও স্বভাবতই মনে পড়ে যায়। নবতিপর এইসুদর্শন সিদ্ধপুরুষকে সঙ্গে করে আমাদের
ছুটোছুটি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা
জিয়ার সাথে আলোচনা, মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে
টমাস, বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ, ঐতিহাসিক লংমার্চ ইত্যাদির স্মৃতি জীবনের বড় অর্জন হয়ে রয়ে গেছে।

দ্বীনের উপর আঘাত এলে ছাহেব কিবলা ফুলতলী
তা সহ্য করতেন না। বিরোধী পক্ষে যেই থাকুক
তাকে পরোয়া করতেন না। বড় বড় শাসক ও
স্বৈরশক্তিকেও তিনি হিসাবে আনতেন না। কারো
রক্তচক্ষুকে ভয় করতেন না। ইসলামের স্বার্থে তিনি
ছিলেন নির্ভীক। সত্য উচ্চারণে কখনো পিছপা হননি।
খোদায়ী সাহায্যে বলীয়ান এ আধ্যাত্মিক শক্তিমান
বীরপুরুষ ছিলেন হকের কণ্ঠস্বর। তিনি কেবল
প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সংগঠনই স্থাপন করে যাননি, একদল কর্মবীর সৈনিকও তৈরি করে গেছেন। যারা আজ তার অবর্তমানেও বিশ্বের নানা প্রান্তে তার মিশনকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। দক্ষ, যোগ্য ও সৎ
নেতৃত্ব তৈরি করে মানবতার সেবায় ধর্ম-সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আত্মশুদ্ধির অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান অবদানের পথ রচনা করে গেছেন। পীর-মাশায়েখ ও
আধ্যাত্মিক ব্যক্তিগণের এ বরকতময় আদর্শ অনুসরণ
করা উচিত। নবী করিম (সা.)-এর জীবনেও মানুষ তৈরির এ দৃষ্টান্ত বিশ্বময় আউলিয়াদের অনুসরণীয়। ইসলামে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি তৈরির গুরুত্ব সমানভাবেই আলোচিত ও প্রশংসিত।

হযরত ছাহেব কিবলার পরিবারবর্গের সাথে আমার
আন্তরিকতা শুধু নয় আত্মার সম্পর্ক। বর্তমান
সাজ্জাদানশীন ছাহেব কিবলাহ মাওলানা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী, নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী, কমরুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী, মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী প্রমুখের সাথে যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান তা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হয়, মহান আল্লাহর কাছে সে দোয়াই করি। ছাহেব কিবলাহ ফুলতলীর পৌত্র নবীন ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আহমদ হাসান চৌধুরী শাহান আমাদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক রূপে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত এ সিলসিলারই ফয়জ ও বরকতের নমুনা। ফুলতলীর এক আস্থাভাজন কণ্ঠস্বর হাফিয সাব্বির আহমদ ছাহেব কিবলার
রূহানী তাওয়াজ্জুহপ্রাপ্ত ব্যক্তি। বহুমুখী খিদমত ও
অনন্য দ্বীনি কার্যক্রমের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি
অর্জনের পথে অগ্রসর হচ্ছেন।

বক্ষমান প্রকাশনার সম্পাদনায় নিয়োজিত সাব্বির আহমদ আমাদের প্রতি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ। আল্লাহ তাকে আরও সমৃদ্ধি ও উজ্জ্বলতা দান করুন। তার আগ্রহেই আমি শত ব্যস্ততার ভেতরেও দুয়েকটি কথা লিখতে সক্ষম হয়েছি।(আমিন)

 

Manual8 Ad Code

লেখকঃ এ.এম.এম.বাহাউদ্দিন, সম্পাদক দৈনিক ইনকিলাব।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code