শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইল ঢাকা, দিল্লি চুপ

লেখক: Rumie
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual5 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট : ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া, সেখানে থেকে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচার, গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়ন, তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি এবং সীমান্তে হত্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বাংলাদেশ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে সাংরিলা হোটেলে গতকাল শুক্রবার দুপুরে বৈঠক করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ড. ইউনূসের প্রথম বৈঠক। দু’দেশের সম্পর্কের অস্বস্তির বিষয়গুলো নিজ নিজ পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয় এই বৈঠকে। বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে উদ্বেগ জানানো হয়। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে চায়, যেখানে নির্বাচনের একটা ভূমিকা আছে।

বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের জনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা উভয় দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুবিধা বয়ে এনেছে। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারতের আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে শীতলতা আসে। এই বৈঠক সেই শীতলতা কমাতে সহায়তা করবে বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকটি ২০ মিনিট হওয়ার কথা থাকলেও ৪০ মিনিট স্থায়ী হয়।

বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে সমকালকে বলেন, বৈঠকে ঢাকা ভারতের উদ্বেগগুলোতে সুনির্দিষ্ট জবাব দিয়েছে। তিস্তা প্রকল্পে চীনের উপস্থিতি নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভারত চীনের নাম উচ্চারণ করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, আমরা আমাদের সুখ-দুঃখ বুঝব। তৃতীয় পক্ষ যদি এখানে আসে, তা সবার ভেবে দেখা উচিত।

নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে চায় ভারত নরেন্দ্র মোদির থাইল্যান্ড সফর নিয়ে গতকাল ঢাকা-দিল্লির বৈঠকের পর বিশেষ সংবাদ ব্রিফিং করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে চায় বলে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি।

Manual5 Ad Code

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, যে কোনো গণতন্ত্রে নিয়মিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ড. ইউনূসের কাছে নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে নিজের দর্শন তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে সামনের দিনে একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ দেখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা আগেও বলেছি তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে অনুরোধ এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখন আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।

Manual3 Ad Code

সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশ সরকার সংখ্যালঘু নির্যাতনের তদন্ত করবে এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি  দায়িত্ব পালনে সফল হবে। বিক্রম মিশ্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন, পরিবেশকে খারাপ করে এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলাই সর্বোত্তম।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জানান, সীমান্তে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধ, বিশেষ করে রাতে সীমান্ত অতিক্রম ঠেকানো সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক পর্যালোচনা এবং এগিয়ে নেওয়ার জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠক করতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিক্রম মিশ্রি বলেন, নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের সভাপতিত্ব গ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ফোরামের নেতৃত্বে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ফোরামের সদস্য দেশগুলোর নেতারা বিমসটেক কাঠামোর আওতায় আঞ্চলিক একত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পরামর্শ করা এবং সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সম্মত হয়েছেন।

Manual2 Ad Code

বিক্রম মিশ্রি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন যে, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থের সব বিষয় গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান অব্যাহত থাকবে। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন তখন ড. ইউনূস জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইচ্ছা তাঁর আছে। যদি আরও কিছু সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে সে ক্ষেত্রে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

Manual5 Ad Code

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় তুলেলও ভারতের পক্ষ থেকে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। তবে ভারত বিষয়টির নোট নিয়েছে। ড. ইউনূস বলেছেন, ভারতের আতিথেয়তার অপব্যবহার করছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিপরীতে নরেন্দ্র মোদি এর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করেন।

এতে আরও জানানো হয়, বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে গভীরভাবে মূল্য দেয়। দুই দেশের গভীর বন্ধুত্ব পরস্পর সম্পর্কিত ইতিহাস, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং সাংস্কৃতিক সখ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭১ সালে আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ভারতের সরকার ও জনগণের অটল সমর্থনের জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ। দুই দেশের সম্পর্কের চ্যালেঞ্জের বিষয়ে ড. ইউনূস বলেন, আমাদের উভয় দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য সম্পর্ককে সঠিক পথে নিয়ে যেতে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে কাজ করতে চায়। বিমসটেকের সভাপতি হওয়ায় ড. ইউনূসকে অভিনন্দন জানান নরেন্দ্র মোদি। এ ছাড়া এই সময় ঈদের শুভেচ্ছাও জানান তিনি।

নরেন্দ্র মোদি বলেন, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে দিল্লি সবসময় অগ্রাধিকার দেয়। দুই প্রতিবেশীর ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে জড়িত, আর এর শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশের জন্মের সময় থেকে। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না। আমাদের সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে জনগণের। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘শেখ হাসিনা অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে মিথ্যা ও উস্কানিমূলক অভিযোগ করে চলেছেন। আমরা ভারতকে অনুরোধ করছি, আপনার দেশে অবস্থানকালে তাঁকে এ ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত রাখার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।’

অধ্যাপক ইউনূস জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী লীগ কর্মীদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ তুলে ধরা  হয়। প্রধান উপদেষ্টা জানান, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের সময় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশই শিশু। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিজে নিরাপত্তা বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের হত্যা ও ‘নেতাদের গ্রেপ্তার করে লাশ গুম করার’ নির্দেশ দেন।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির উদ্বেগের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা অনেকটাই অতিরঞ্জিত এবং ‘এর বেশির ভাগই ভুয়া খবর’। যেসব হামলার অভিযোগ এসেছে, তা স্বচক্ষে যাচাই করার জন্য তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সাংবাদিক পাঠানোর অনুরোধ জানান। সরকার এমন যে কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশ গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া ও হত্যা কমাতে বৈঠকে দুই দেশ সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার (সিবিএম) প্রয়োজনের বিষয়ে জোর দিয়েছে দুই পক্ষ।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা সার্বভৌম, সমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ওপর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গঠনের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া, তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন, সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক যোগাযোগের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। জঙ্গিবাদ ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ আলোচনায় ড. ইউনূস জানান, বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু নির্বিশেষে সবার সুরক্ষা নিশ্চিতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নরেন্দ্র মোদিকে ছবি উপহার
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটি ছবি (ফটোগ্রাফ) উপহার দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত ১০২তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অধ্যাপক ইউনূসকে স্বর্ণপদক প্রদান করেন। সেই মুহূর্তটির ধারণ করা ছবি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন প্রধান উপদেষ্টা। বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। গতকাল তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code