

নিউজ ডেস্কঃ
ক্রমাগত লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারীদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয় ২০ বছর আগে। উদ্দেশ্য ছিল, শ্রমিকবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লোকসান কাটানো। কিন্তু এ উদ্যোগ পুরোপুরিই ব্যর্থ হয়েছে। মিলগুলোর কোনোটিই এখন আর উৎপাদনে নেই। এসব কারখানায় প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিলের মূল্যবান যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। জায়গা ভাড়া দিয়ে খাচ্ছেন শ্রমিক নেতারা। হস্তান্তরের সময় এসব কারখানার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল এক হাজার ১০২ কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদি দায়, চলতি দায় এবং স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। বছরে দুটি কিস্তিতে ১৫ বছরে দায় পরিশোধের শর্ত ছিল। ২০ বছরেও এ শর্ত পূরণ হয়নি। সব দায়দেনা এখনও সরকারের ঘাড়ে।
দায়িত্বে থাকা শ্রমিক নেতাদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ লোপাটের কারণেই এ পরিণতি দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ সাধারণ শ্রমিকদের। তাদের ভাষ্য, সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকাকালে যেসব শ্রমিক নেতার কারণে বছরের পর বছর লোকসানের বোঝা টানতে টানতে একপর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বস্ত্রকলগুলো বন্ধ হয়, তাদেরই নতুন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) রাষ্ট্রায়ত্ত বস্ত্রকলগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। জানতে চাইলে বিটিএমসির প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা ও মহাব্যবস্থাপক কাজী ফিরোজ হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, শ্রমিক-কর্মচারীর ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া বন্ধ ৯টি মিলের বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, বিটিএমসি তা কার্যকর করবে।
বন্ধ হওয়া মিলগুলোর চারটি টঙ্গীতে অবস্থিত। এগুলো হচ্ছে ফাইন কটন, মেঘনা টেক্সটাইল, অলিম্পিয়া টেক্সটাইল ও মন্নু টেক্সটাইল। এ ছাড়া ঢাকার পোস্তগোলার ঢাকা কটন, নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনারায়ণ কটন, চট্টগ্রামের পাইলন ইন্ডাস্ট্রিজ, ন্যাশনাল কটন ও ক্যারিলিন সিল্ক্ক মিলস।
সম্প্রতি মেঘনা টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শর্ত ভঙ্গ এবং নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও মিলের সম্পদ লোপাটের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। মিলটির শেয়ারহোল্ডার শ্রমিকরা এ অভিযোগ করেছেন। এতে বলা হয়, শ্রমিক-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জাহিদ আল মামুন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল ইসলামসহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা আরও কয়েকজন মিলের মূল্যবান যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিয়েছেন। কিছু যন্ত্রপাতি তাদের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গেছেন। গাছপালা কেটে নিয়ে গেছেন। মিলের ভান্ডার বিভাগের মালপত্র লুটে নিয়ে এখন স্থানীয় এক টাইলস ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। মিলের অন্যান্য বিভাগও ভাড়া দিয়ে রাখা হয়েছে। শেয়ারধারী শ্রমিকদের শেয়ারের বিপরীতে কোনো সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি ২০ বছরে কোনো হিসাবও দেওয়া হয়নি।
মিলটির কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের কাছ থেকে মিল বুঝে নেওয়ার সময় অনেক শ্রমিক শেয়ার কিনেছেন। শেয়ারের বিপরীতে কোনো মুনাফা দেওয়া হয়নি। সামান্য অজুহাতে শ্রমিকদের গায়ে হাত তোলা এবং চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। প্রধান উৎপাদন কার্যক্রম স্পিনিং ও উইভিং বন্ধ হলেও মিলটি এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। মাত্র ৯০ জন শ্রমিক নিয়ে ডায়িং বিভাগ কোনোরকমে চালু আছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল ইসলাম দাবি করেন, শ্রমিকদের অভিযোগ সঠিক নয়। হিসাবের ভিত্তিতে প্রতিবছর মুনাফা বণ্টন করা হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়নি। যন্ত্রপাতি চুরির অভিযোগও সঠিক নয়।
মিলের জায়গা ভাড়া দেওয়া প্রসঙ্গে নুরুল ইসলামের ভাষ্য, খালি জায়গা ফেলে না রেখে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
এসব মিল হস্তান্তরের সময় বলা হয়েছিল, মিল বন্ধ হওয়ার দুই মাস আগে থেকে যেসব শ্রমিক-কর্মচারী স্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেছেন, তাদের অন্তত ৫৫ শতাংশের মালিকানা থাকবে। তাদের মধ্য থেকে পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হবে। প্রত্যেক শ্রমিক-কর্মচারী কমপক্ষে ১০টি এবং সর্বোচ্চ ১০০টি শেয়ার পাবেন।
পরিবর্তিত ব্যবস্থাপনায় চালুর পর টঙ্গীর অলিম্পিয়া টেক্সটাইল মিলটি মাত্র ৯ মাস উৎপাদনে ছিল। মিলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক পরিবেশে পুরোনো মেশিন দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। দেশি কিংবা বিদেশি বিনিয়োগে যৌথভাবে কারখানা পরিচালনার সুযোগ থাকলে সবক’টি মিল আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে।
মন্নু টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, কয়েক মাস উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে আড়াই কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। তার মতে, পুরোনো মেশিন পরিবর্তন করে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করে মিলটিকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করা সম্ভব।