শ্রীমঙ্গল: চায়ের রাজধানী, রেইনফরেস্ট ও পর্যটন নগরী

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

Manual4 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত

Manual5 Ad Code

শ্রীমঙ্গল—বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণে ছড়িয়ে থাকা এক সবুজ-ঘেরা পর্যটন নগরী। ছোট পাহাড়, রেইনফরেস্ট, বিশাল চা-বাগান আর সাজানো বাগান—এই সব উপাদান মিলে গড়ে উঠেছে এমন এক মনোরম প্রাকৃতিক মহল, যেখানে প্রতিটি ভোরই এক নতুন নিঃশ্বাস। মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত এই উপজেলা ৪২৫.১৫ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত, আর চা-বাগানেই ছড়িয়ে আছে প্রায় ১৮৪.২৯ বর্গকিলোমিটার মনোরম সবুজ।

পরিচিতি ও রহস্যময় ইতিহাস-

শ্রীমঙ্গল সিলেট বিভাগের সবচেয়ে চেনাজানা স্থানগুলোর মধ্যে একটি—“চায়ের রাজধানী” হিসেবে পরিচিত। এখানকার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা জুড়ে বিস্তৃত ইতিহাস রয়েছে। ব্রিটিশ আমলের চা-বাগান, সেবার আগত প্ল্যান্টারদের স্মৃতি, এবং ডিনস্টন সিমেট্রির মতো শতবর্ষী সমাধিস্তম্ভ—সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস আজও জীবন্ত। ১৮৫৪ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে শুরু হওয়া চা-শিল্পের এই ঐতিহ্য এখানকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরে বড় ভূমিকা রেখেছে।

চা, বিটিআরআই ও উদ্ভাবনী গবেষণা-

বাংলাদেশে মোট সাতটি টি ভ্যালির মধ্যে সিলেট বিভাগের ছয়টিতেই চা-বাগান রয়েছে; এই ছয় ভ্যালিতে মোট ১৩৮টি চা-বাগান। কেবল শ্রীমঙ্গলেই আছে ৩৮টি বাগান—পাশাপাশি এলাকার হিসাব করলে সংখ্যা ৬০-এরও বেশি। তাই শ্রীমঙ্গলকে ‘চায়ের রাজধানী’ বলা যথার্থ।

বিটিআরআই (বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর ইতিহাসও আকর্ষণীয়। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান চা বোর্ড একটি গবেষণা স্টেশন স্থাপন করে; স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে এটিকে উন্নীত করে বাংলাদেশ সরকার। বর্তমানে বিটিআরআই-তে রয়েছে আটটি গবেষণা বিভাগ—মৃত্তিকা রসায়ন থেকে শুরু করে পরিসংখ্যান ও অর্থনীতি পর্যন্ত। বিটিআরআই-এর বৈজ্ঞানিকরা বিটি-১ থেকে বিটি-২৮ পর্যন্ত উন্নতমানের ক্লোন উদ্ভাবন করেছেন। সম্প্রতি ‘বিটি-২৮’ সহ বিভিন্ন নতুন প্রজাতি ও বিশেষ চা (যেমন—সিলভার চা, সাতকড়া চা) তৈরি হচ্ছে, যা স্থানীয় ফল ও ঐতিহ্যবাহী ফ্লেভারের সঙ্গে মিশে নতুন স্বাদের চা দেশজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলছে।

প্রকৃতি—শ্যামলী, লাউয়াছড়া ও গভীর বনসমূহ

শ্যামলী—লাউয়াছড়া ফরেস্ট জোনে নির্মিত পিকনিক স্পট, সবুজের অপরূপ সাজে পর্যটককে মোহিত করে। রাস্তায় দু’পাশে চা-বাগান, কাশফুলের সাদা ঢেউ আর বনলতা—শরৎকালের দৃশ্যকল্প এখানে অতুলনীয়। শ্যামলীর ডিপ ফ্রিজাপ এরিয়া গরমের দিনে ঠান্ডা বাতাসের স্বাদ দেয়—শহরের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেওয়ার মতো।

লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক—প্রায় ১,২০০ হেক্টর বিস্তৃত। এখানে আড়াই হাজারেরও বেশি পাখি, বহু স্তন্যপায়ী ও সরিসৃপ প্রজাতি থাকায় এটি প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। বনবিড়াল, হরিণ, বানর, সিভেট ক্যাটসহ নানা প্রাণী ও গাছগাছালি, এবং ‘ফরেস্ট মিউজিক’—জঙ্গলের পোকার সুর—প্রতিটি ভ্রমণকে অ্যালবামের মতো স্মরণীয় করে তোলে। পার্কজুড়ে খাসিয়া পুঞ্জি, আনারস ও লেবু বাগানও চোখে পড়ে—প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান এখানে এক অনন্য সমাহার।

Manual1 Ad Code

আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানসমূহ (সংক্ষিপ্ত গাইড)-

বিটিআরআই: শহর থেকে প্রায় ২ কিমি দূরে; প্রবেশ করতে অনুমতি লাগে।

লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক: জঙ্গল, ছড়া ও বিরল বৃক্ষরাজি—প্রকৃতি-প্রেমীদের জন্য অপরিহার্য গন্তব্য।

শ্যামলী ও ডিপ ফ্রিজাপ এরিয়া: পিকনিক ও ফটোগ্রাফির আদর্শ স্থান।

রাবার বাগান: সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ~৮,০৮৩ একর; রাবার শ্রমিকদের জীবনচিত্র দেখার সুযোগ।

আনারস ও লেবু বাগান: তাজা ফল কেনা যায়।

ভাড়াউড়া লেক: শাপলা ফুল ও অতিথি পাখির মিলনক্ষেত্র।

রাজঘাট লেক: চা-বাগানের মাঝে ঘেরা লেক ও সুইমিংপুল।

Manual4 Ad Code

মাগুরছড়া গ্যাস কূপ: ১৯৯৭ সালের বিস্ফোরণের স্মৃতি বহন করছে।

যজ্ঞকুন্ডের ধারা: শ্রীমঙ্গলের একমাত্র ঝর্ণা; পাহাড়ি ছড়ায় প্রবাহিত নিঝর জলধারা।

ডিনস্টন সিমেট্রি, নির্মাই শিববাড়ী, সিতেশ দেবের চিড়িয়াখানা, আরগ্য কুঞ্জ: প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে আলাদা অভিজ্ঞতা।

 

অনুভব ও স্থানীয় সংস্কৃতি-

শ্রীমঙ্গলের মানুষ—চা-শ্রমিক, খাসিয়া জনগোষ্ঠীর আবাসিক, চাষি ও উদ্যোক্তারা—সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। সাতকড়া, আঞ্চলিক আচার-অনুষ্ঠান, চা-কল্যাণে জড়িত সংগঠক ও কৃতি ব্যক্তিত্বদের নাম—প্রতিটি পাড়ায় একেকটি গল্প।

এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বে ছিলেন আসাম প্রাদেশিক পরিষদের এম.এন.এ জীবন সাঁওতাল, ডাঃ সূর্যমনি দেব, যতীন্দ্র মোহন দত্ত, অজিত চৌধুরী, ভূনবীরের লাকু দত্ত চৌধুরী, সাবেক এমপি মোঃ ইলিয়াস, মোহাম্মদ আহাদ মিয়া, শফিকুর রহমান, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ, শ্রীমঙ্গল পৌরসভার প্রথম ভাইস-চেয়ারম্যান ক্ষীরোদ দেব চৌধুরী, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান এম এ মুসাব্বির, এম এ রহিম, কমলেশ ভট্টাচার্য, মহসিন মিয়া মধু, রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ( সাবেক চেয়ারম্যান, সাংবাদিক ও বাম রাজনীতিবিদ), সাংবাদিক বিপুল রঞ্জন চৌধুরী, রাজনীতিবিদ শাহজাহান মিয়া, ডাঃ আব্দুল আলী, ডাঃ গোলাম জিলানী, প্রফেসর সাইয়িদ মুজিবুর রহমান, প্রফেসর সৈয়দ মূয়ীজুর রহমান, অধ্যাপক নিখিল ভট্টাচার্য, ডাঃ রমা রঞ্জন দেব, এস কে রায়, ডাঃ গিরীন্দ্র চক্রবর্তী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আছকির মিয়া, পৌর কমিশনার বলাই ভট্টাচার্য, সুনীল রায়সহ আরও অনেকে। এছাড়া চা শ্রমিকদের নেতৃত্বে ছিলেন সুরেন্দ্র চন্দ্র ব্যানার্জি ও রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জি।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও শ্রীমঙ্গল সমৃদ্ধ। গীতিকার এ কে আনাম, রাস বিহারী চক্রবর্তী, সীতেশ চৌধুরী, মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী, রংগলাল দেব চৌধুরী, বুলবুল আনাম, জিল্লুর আনাম, বাউল আবুল কাসেম, কানাই লাল তাতী, জয়তুন নাহার সাহাদত, তপতী কর মিতা, তাপসী কর কেনী, অভিনাশ দেব রায়, শ্যামসুন্দর রবিদাস, সুমিত্রা ঘোষ রুপা, সুজাতা ঘোষ মুন্না, রিতা চক্রবর্তী, উত্তম কুমার ভৌমিকসহ আরও অনেকেই সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও শিল্পচর্চায় অবদান রেখেছেন।

ভ্রমণসূচি ও টিপস (সংক্ষিপ্ত)-

শ্রেষ্ঠ সময়: শরৎকাল—চা-বাগানের সবুজ, কাশফুল আর শীতল বাতাস সবচেয়ে সুন্দর।

কী করবেন: বিটিআরআই ভ্রমণ, লাউয়াছড়ায় হাঁটা, শ্যামলীর ডিপ ফ্রিজাপে বিশ্রাম, ভাড়াউড়ায় ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ।

নিয়ম: সংরক্ষিত এলাকা ও গবেষণা কেন্দ্রে প্রবেশে অনুমতি নিন; পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন।

Manual4 Ad Code

স্মৃতি: সাতকড়া চা, সিলভার চা ও শ্রীমঙ্গলের লেবু বিশেষ উপহার হিসেবে নিতে পারেন।

 

উপসংহার-

শ্রীমঙ্গল কেবল একটি স্থান নয়—এটি অভিজ্ঞতার সমাহার, ইতিহাসের ছায়া, গবেষণার গৌরব এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মিলনক্ষেত্র। চায়ের সুগন্ধ, বনের সঙ্গীত, পাহাড়ি ছায়ায় পাখি ও প্রাণীর কোলাহল—সব মিলিয়ে এমন এক ভ্রমণ উপহার দেয় যা বারবার ফিরে আসতে বাধ্য করে। প্রকৃতি, ইতিহাস ও চা সংস্কৃতির সম্মিলন দেখতে চাইলে শ্রীমঙ্গলই হবে আপনার স্বপ্নের বাস্তবায়ন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code