

বেড়া পাবনা :
স্থানীয় বাজারে পানের ব্যাপক চাহিদা,অনুকুল পরিবেশ,পান চাষ উপযোগী মাটি ও স্থানীয় ভাবে পান কেনা-বেচার পাইকারী বাজার সৃষ্টি হওয়ায় পাবনার বেড়া উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে পান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন পান চাষীরা। দীর্ঘ দিন ধরে এলাকায় গুটি কয়েক পানের বরজে (পাট কাঠি দিয়ে ছাউনি ও ঘেরা পানের জমি) পানে চাষ হলেও সেখানে বর্তমানে অর্ধ শতকেরও বেশী পানের বরজে কৃষক পান চাষ করছেন। সুখ সাচ্ছন্দ্য ফিরে এসেছে পান চাষীদের ঘরে।
বেড়া উপজেলার জাতসাকীনি,রুপপুর ও আমিনপুন ইউনিয়নে কম-বেশী পান চাষ হয়ে থাকে। বন্যমুক্ত,বেল-দোয়াশ উর্বর মাটি হওয়ায় এলাকার মাটি পান চাষের জন্য উৎকৃষ্ঠ। জাতসাকিনী ইউনিয়নেই সর্বাধিক পানের বরজ রয়েছে। এ ছাড়া বাকী দুই ইউনিয়নে বিক্ষিপ্ত ভাবে পানের চাষ হয়ে থাকে। বংশ পরম্পরায় পান চাষ করে আসছেন এমন এক জন চাষী, জাতসাকিনী ইউনিয়নের পান চাষী নব দাসের সাথে পান চাষ নিয়ে কথা হলে তিনি জানান,পান চাষ তাদের আদি পেশা। বংশ পরম্পরায় আমরা পান চাষ করে আসছি। প্রথম দিকে একটা বরজেই বাপ-দাদারা পান চাষ করতো এবং স্থানীয় খুচরা পান দোকানিদের নিকট পান বিক্রি করে কোন ভাবে জীবিকা নির্বাহ করতো। তিনি বলেন,ভাগে পাওয়া সমান্য জমি ও অন্যের জমি লীজ নিয়ে পান চাষ করছি। জাতসাকিনী ইউনিয়নের সিন্দুরী ও নয়া বাড়ী এলাকায় প্রায় ৩০ টিরও অধিক পানের বরজ রয়েছে।
সিন্দুরী গ্রামের পান চাষী রতন দাস পান চাষের বিষয়ে জানান,পান গাছ লতা জাতীয় উদ্ভিদ। পানের বীজ বা চারা রোপন করতে হয়না,পান গাছের কান্ড ও লতার অগ্রভাগ কেটে রোপনের মাধ্যমেই নতুন গাছ তৈরী হয় এবং যুগে যুগে মা গাছের কাটিং থেকেই পান গাছের বংশ বৃদ্ধি করা হয়। নতুন করে পানের বরজ তৈরীর সময় সতেজ,রোগ মুক্ত ও নতুন পান গাছের প্রায় এক ফুট ডগা কেটে রোপন করতে হয়। রোপনের ৬ থেকে ৮ মাস পর থেকে সামান্য পরিমান পান পাওয়া যায়। রোপনের ১২ মাস পর থেকে পরোপুরি ভাবে পান সংগ্রহ করা যায়।
উপজেলার নয়াবাড়ী গ্রামের পান চাষী শামচুল ইসলামের সাথে কথা হয় পান চাষ নিয়ে,তিনি বলেন,পানের বরজে পর্যাপ্ত শীতল বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা,সূর্যের প্রখর তাপ বা আলোতে সরাসরি পড়লে পান গাছ ও পানের বৃদ্ধি ব্যহত হয় সে জন্য পান বরজের চতুরদিকে ও পান বরজের উপরে পাট কাঠি দিয়ে বেড়া ও ছাউনি দিতে হয়। পান গাছ রোপন থেকে পান সংগ্রহের শেষ সময় পর্যন্ত এ ভাবেই পানের বরজ রাখতে হয়। বরজে পান গাছ একটি চিকন খুটি পেঁচিয়ে প্রায় ৭ ফুট উপরে উঠে,এ অবস্থায় গাছে (লতা) অসংখ্য গিট থেকে পাতা বের হয়। পরিণত পান সংগ্রহ করা পর পান গাছটিকে কুন্ডলি আকারে পেঁচিয়ে খুটির নিচে বেধে দেওয়া হয়। পান গাছটি ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতে থাকে ও গিট গুলো থেকে নতুন পাতা গজায় এবং পরিণত পান পাতা সংগ্রহ করা হয়,এ ভাবেই প্রতিটি পান গাছ থেকে এক নাগারে প্রায় ৩ বছর পান সংগ্রহ করে থাকেন পান চাষীরা।
পান চাষী সুকুমার,ঈমান আলী ও হাচেন আলীর সাথে কথা বলে জানা যায়,পানের বরজে প্রধান কাজ পরিচর্যা, যা লাগাতার ভাবে করে যেতে হয়। সার হিসেবে গোবর সার ও টিএসপি সার ব্যবহার করা হয়। খরা মৌসুমে পানের জমিতে সেচ দিতে হয়। বর্ষা মৌসুমে বেশী বৃষ্টিপাত হলে গাছে রোগের প্রর্দূভাব ঘটে। কি ধরনের রোগে পান গাছ বা পান আক্রান্ত হয় জানতে চাইলে পান চাষী আহেদ আলী,উত্তম ও অনিল জানায়, গিড়ে পঁচা রোগ পান গাছের সব থেকে ক্ষতি কারক রোগ। গিড়ে পঁচা রোগের বেশী প্রর্দূভাব হলে পানরে বরজ সম্পূর্ন ভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়াও পাতায় মরিচা বা রাষ্ট পরে ভাল মানের পান সংগ্রহ ব্যহত হতে পারে।
পান চাষে সরকারি ভাবে কোন সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া যায় কিনা জানতে চাইলে, পান চাষীরা জানায়,সাহায্য সহযোগিতা তো দুরের কথা,কৃষি অফিসের কোন কর্মকর্তা কর্মচারি কোন দিন পান চাষের বরজও দেখতে আসেনি। পান গাছ বা পানের রোগের জন্য আলাদা ভাবে কীটনাশক ঔষধের দোকানে ওষুধ পাওয়া যায়না। দোকানিরা যে ওষুধ দেয় সেটাই ব্যবহার করি। এক একটি পানের বরজে প্রায় ৩ লক্ষ টাকারও বেশী ব্যয় করতে হয়। আমরা সব সময় ঝুকির মধ্যে থাকি।
বেড়া উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইউছুব আলী ও রওশন আীর সাথে উপজেলার পান চাষের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, বেড়া উপজেলায় ৫ দশমিক ৬ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। মাঝে মধ্যে পান চাষ এলাকা পরিদর্শন করেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে পান চাষিদের কোন আর্থিক বা কোন র্ভতুকি দেওয়া হয়না। পান চাষিরা রোগ প্রতিরোধে পরার্মশ চাইলে পরার্মশ দিয়ে থাকেন বলে জানান। পান চাষের উপর বা রোগ প্রতিরোধে নিদিষ্ট কোন ওষুধ ব্যবহার প্রয়োজন সে সমন্ধে কোন প্রশিক্ষণ তাদের নেই বলেও স্বীকার করেন।
বেড়ার কাশীনাথপুরে পাইকারী পান বেচা-কেনার জন্য গড়ে উঠেছে পানের আড়ৎ। আড়ৎদার টোটন রাহা, গৌতম বিষ্ণু ও গোপাল মিত্র জানান,সপ্তাহে দু’দিন এখানে আড়ৎ বসে,হাটে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকার পান বেচা কেনা হয়ে থাকে। এ ছাড়াও প্রতিদিনই পান চাষিরা কম বেশী পান বিক্রি করে থাকেন। তারা জানান জেলার সাথিঁয়া ও আটঘরিয়া উপজেলাতেও পান চাষ হয়ে থাকে।
এলাকার পান চাষীদের উন্নত প্রশিক্ষণ, মাঠ পর্যায়ে তদারকি ও পরার্মশ এবং স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারলে পান চাষে চাষীরা যেমন আগ্রহী হয়ে উঠবে। সম্ভবনাময় পান চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হতে পারবে বেড়ার পান চাষীরা।