

ডেস্ক রিপোর্ট: উসমানি খেলাফত তথা অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর প্রায় শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছিলো। ততদিনে তারা প্রবল ক্ষমতাশালী,দাপুটে হিসেবে গোটা ইউরোপে পরিচিতি পেয়েছে। স্থলপথে দিন দিন তাদের শক্তি বেড়েই চলছিলো।
হঠাৎ মনে হলো, স্থলপথের মতো তাদেরকে জলপথেও শক্তিশালী হতে হবে। পূর্বে সেলজুকরা একসময় নৌ-পরাশক্তি হতে চাইলেও বাইজেন্টাইন হস্তক্ষেপ, মঙ্গোল আগ্রাসন এবং নিজেদের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের কারণে ঠিক সুবিধা করে উঠতে পারেনি। তবে সমুদ্রজয়ে উসমানিদের এত কাঠ-খড় পোড়াতে হয়নি।
১৪৬২ সালে অটোমানরা আনাতোলিয়ার অ্যাজিয়ান উপকূল জয় করার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমুদ্রযাত্রা শুরু করে। এরপর ধীরেধীরে ভূমধ্যসাগরে তাদের প্রভাব বাড়তে শুরু করে।
নিয়মিত নৌবাহিনী গড়ে তোলার পাশাপাশি সমুদ্রে চষে বেড়ানো ভাড়াটে বাহিনীদেরও কাজে লাগাতো অটোমানরা। বাহিনীগুলোকে ‘প্রাইভেটিয়ার্স’ নামেও অভিহিত করা হতো। প্রাইভেটিয়ার্সরা ষোড়শ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে বিভিন্ন যুদ্ধে অবদান রেখে গেছে।
বিশেষ করে ইউরোপিয়ান এবং অটোমানদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধে যোগ দিতো তারা। কখনো কখনো নিজেরাও ভূমধ্যসাগর এবং পূর্ব আটলান্টিকের পণ্যবাহী জাহাজগুলোতে আক্রমণ চালাতো। তবে এসব কর্মকাণ্ডের জন্য কাউকে জবাবদিহিতা করতো না তারা। এভাবেই প্রাইভেটিয়ার্সদের ব্যবহার করে, ইউরোপীয় এবং অটোমানরা নিজেদের প্রক্সি যুদ্ধগুলো পরিচালিত করতো।
সমুদ্র ঈগল খ্যাত হাইরেদ্দীন বারবারোসাও প্রথম জীবনে এরকম একটি ভাড়াটে সৈনিক দলের নেতা ছিলেন, যিনি ইউরোপীয়দের কাছে তার সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং অভিজ্ঞ জলদস্যু হিসেবে পরিচিতি পান। কিন্ত মূলত তিনি ছিলেন একজন মুসলিম বীর। বারবারোসা ছিলেন একজন দক্ষ যোদ্ধা, যিনি আরও বড় কিছু হওয়ার জন্যই জন্মেছিলেন। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাকে সেদিকেই ধাবিত করেছিলো। নিজের যোগ্যতা গুণে একসময় অটোমানদের মিত্রতে পরিণত হন তিনি। ফলে তার ক্ষমতাও রাতারাতি আকাশচুম্বী হয়ে যায়। অটোমান সাম্রাজ্যের হয়ে বারবারোসা অসংখ্য নৌ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। বিশেষ করে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাজতন্ত্র, স্পেনীয় সম্রাট পঞ্চম চার্লসের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন তিনি।
বারবারোসার জন্ম ১৪৭৫ সালে, যদিও তার জন্মসাল নিয়ে মতবিরোধ আছে। জন্মস্থান অটোমান শাসনের অধীনে থাকা লেসবোসের পালাইওকিপোস গ্রামে। তার বাবা ইয়াকুব ছিলেন একজন আলবেনীয় বংশোদ্ভূত ধর্মান্তরিত মুসলিম সিপাহী। অটোমান বাহিনীর লেসবোস দখলের সময় ইয়াকুব অটোমান নৌবাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। আর তার মা ছিলেন লেসবোসে বসবাসকারী একজন গ্রীক। সেই সময় উসমানিরা তাদের জয় করা অঞ্চলগুলোতে ধর্মীয় উদারতা দেখিয়েছিলো। যার ফলে অনেক স্থানীয় ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো।
শৈশবে হাইরেদ্দীন বারবারোসার নাম ছিলো ‘খিজির’। চার ভাইয়ের মাঝে খিজির ছিলেন তৃতীয়। বাকি ভাইদের নাম যথাক্রমে ইসহাক, অরুচ এবং ইলিয়াস। এদের মাঝে খিজির এবং অরুচের কমলা রঙের দাড়ি থাকার কারণে ইউরোপীয়রা তাদের ‘বারবারোসা ভাতৃদ্বয়’ উপাধি দিয়েছিলো। আর অটোমান সুলতান সুলেইমান খিজিরকে ‘খয়ের আদ-দীন’ উপাধিতে ভূষিত করেন, যার অর্থ ‘ইসলামের শ্রেষ্ঠতম’। পরে সেটা ‘হাইরেদ্দীন’ হিসেবে অধিক পরিচিতি পায়।
কিন্তু রোডস দ্বীপভিত্তিক প্রাইভেটিয়ার্স বাহিনী ‘নাইট টেম্পলাররা’ তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষতি সাধন করতে থাকে। এরই চূড়ান্ত রূপ হিসেবে টেম্পলাররা মেঝ ভাই অরুচকে বন্দি করে এবং দাস হিসেবে রেখে দেয়। অরুচ দুই বছর বন্দি হিসেবে নিদারুণ কষ্টের জীবন কাটায়। দুইবছর পর চেষ্টায় টেম্পলারদের কাছ থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। পালিয়ে আসার পর অরুচ ছোট ভাই খিজিরের সঙ্গে মিলিত হন।