১১ হাজার টন আবর্জনা ঘেঁটেও মেলেনি মাথা, ট্যাটুতেই মিলল অভিনেত্রীর পরিচয়

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

Manual3 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: চেন্নাইয়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে এক নারীর খণ্ড-বিখণ্ড দেহাবশেষ উদ্ধারের পর প্রায় অন্ধকারে ছিল তদন্ত। মাথা ও বাঁ হাত না থাকায় পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। এমনকি প্রায় ১১ হাজার ৭০০ টন আবর্জনা তন্নতন্ন করে খুঁজেও মেলেনি মাথাটি। শেষ পর্যন্ত ডান হাতে আঁকা শিব-পার্বতী ও ড্রাগনের দুটি ট্যাটু, একটি বিশেষ তিল এবং অলংকারের সূত্র ধরে পরিচয় মেলে ৩৭ বছর বয়সী উদীয়মান তামিল অভিনেত্রী সন্ধ্যার। পরে ডিএনএ পরীক্ষায়ও পরিচয় নিশ্চিত হয়। তদন্তে উঠে আসে, তাকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার স্বামী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা বালাকৃষ্ণনকে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। চেন্নাইয়ের পল্লীকরনাই ডাম্পইয়ার্ডের কাছে একটি প্লাস্টিকের বস্তা থেকে মানুষের আঙুল বেরিয়ে থাকতে দেখেন এক পথচারী। খবর পেয়ে পুলিশ বস্তাটি খুলে একটি কাটা হাত ও দুটি পা উদ্ধার করে। এরপর শহরের বিভিন্ন জায়গা, বিশেষ করে আদিয়ার নদীর তীরের কাছাকাছি এলাকা থেকে আরও কয়েকটি প্লাস্টিকের ব্যাগে হাড়গোড়, খাদ্যনালিসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ পাওয়া যায়।

ফরেনসিক পরীক্ষায় জানা যায়, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলো ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী একই নারীর। ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার পর তার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছিল বলেও পরীক্ষায় উঠে আসে। কিন্তু নিহতের মাথা ও বাঁ হাত পাওয়া যায়নি। ফলে মুখ দেখে শনাক্ত করা কিংবা আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল না।

Manual2 Ad Code

ঘটনার তদন্তে উপপুলিশ কমিশনার মুথুসামীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। পুলিশ ধারণা করেছিল, পল্লীকরনাইয়ের বিশাল ময়লার স্তূপের ভেতর আরও দেহাবশেষ চাপা পড়ে থাকতে পারে। এরপর শুরু হয় বড় ধরনের তল্লাশি। প্রায় ১১ হাজার ৭০০ টন আবর্জনা ঘেঁটে নিহত নারীর টরসোসহ আরও কয়েকটি অংশ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু মাথা ও বাঁ হাতের কোনো সন্ধান মেলেনি।

চেন্নাইয়ের রাজীব গান্ধী সরকারি জেনারেল হাসপাতালের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন, সবগুলো একই নারীর। এরপর একই বয়স ও শারীরিক গঠনের নিখোঁজ নারীদের তথ্য যাচাই করতে থাকে পুলিশ। তামিলনাড়ুর বিভিন্ন থানায় উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের ছবি পাঠানো হয়। সংবাদমাধ্যমেও পরিচয় শনাক্তে সহায়তার আবেদন জানানো হয়। তবু প্রথম দিকে কোনো সূত্র পাওয়া যাচ্ছিল না।

তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয় নিহতের ডান হাতে থাকা দুটি ট্যাটু। একটিতে ছিল শিব ও পার্বতীর ছবি, অন্যটি ছিল একটি ড্রাগনের। হাতটিতে থাকা অলংকারও তদন্তকারীদের নজরে আসে।

এই সময় থুথুকুডির একটি থানায় এক নারী তার ৩৭ বছর বয়সী মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর দেন। মেয়েটির নাম সন্ধ্যা। তিনি চেন্নাইয়ে স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন এবং অভিনয় ক্যারিয়ার গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন।

সন্ধ্যার মা পুলিশকে জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে মেয়ের কোনো খোঁজ নেই। জামাতা বালাকৃষ্ণনের কাছে মেয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, সন্ধ্যা ১৯ জানুয়ারি থুথুকুডির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। কিন্তু সন্ধ্যা কখনোই সেখানে পৌঁছাননি।

নিহত নারীর বয়স ও শারীরিক গঠনের সঙ্গে সন্ধ্যার তথ্য মিলে যাওয়ার পর তার পরিবারকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষের শনাক্তকারী চিহ্নগুলো দেখানো হয়। সন্ধ্যার মা ডান হাতে থাকা শিব-পার্বতীর ট্যাটু দেখে মেয়েকে শনাক্ত করেন। তিনি একটি বিশেষ তিল ও অলংকারও চিনতে পারেন। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ সন্ধ্যারই।

পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তদন্তের দিক বদলে যায়। পুলিশের নজর পড়ে সন্ধ্যার স্বামী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা বালাকৃষ্ণনের দিকে। শুরুতে তিনি দাবি করেছিলেন, ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যা বাড়ি থেকে চলে গেছেন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে তার বক্তব্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া যায়।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে বালাকৃষ্ণন স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন বলে তদন্তকারীরা জানান। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৯ জানুয়ারি রাতে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। সন্ধ্যার অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, এমন সন্দেহ করতেন বালাকৃষ্ণন। সেই বিষয়কে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে ঘরে থাকা কুঠার দিয়ে সন্ধ্যার ওপর হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।

Manual5 Ad Code

তদন্তে আরও উঠে আসে, হত্যার পরদিন বালাকৃষ্ণন সন্ধ্যার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করেন বলে অভিযোগ। এরপর প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে দেহের বিভিন্ন অংশ চেন্নাইয়ের একাধিক জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়। পল্লীকরনাইয়ের ময়লার স্তূপ এবং আদিয়ার নদীর কাছের নির্জন এলাকাও ছিল এসব স্থানের মধ্যে।

তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা আলভিন জানিয়েছিলেন, অভিযুক্তের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজ মাথার সন্ধানে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। তবে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

সন্ধ্যার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ রক্তের দাগ, দেহাবশেষ বহনের জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বস্তার সঙ্গে মিল থাকা বস্তা এবং দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার কাজে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। তদন্তকারীরা আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করেন। সেখানে গভীর রাতে বালাকৃষ্ণনকে মোটরসাইকেলে করে বস্তা নিয়ে বের হতে দেখা যায় বলে পুলিশ দাবি করে।

সন্ধ্যা ও বালাকৃষ্ণন দুজনেরই শিকড় থুথুকুডিতে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে তাদের বিয়ে হয়। তাদের দুই সন্তান ছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের দাম্পত্যজীবনে পারিবারিক সহিংসতা ও আর্থিক সংকট নিয়ে টানাপোড়েন চলছিল।

২০১৮ সালে সন্ধ্যা পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে আসে। পরে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তারা আবার একসঙ্গে থাকা শুরু করেন।

বালাকৃষ্ণন তামিল ছবি ‘কাধাল ইলাভসাম’ প্রযোজনা করেছিলেন। ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর নতুন একটি সিনেমা নির্মাণের জন্য তিনি সন্ধ্যার পরিবারের কাছে অর্থ চাইছিলেন বলেও তদন্তে অভিযোগ ওঠে।

অন্যদিকে, সন্ধ্যা চেন্নাইয়ে নিজের অভিনয় ক্যারিয়ার নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। চলচ্চিত্র অঙ্গনের কয়েকজন নতুন বন্ধুর সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। এ বিষয়টি নিয়ে বালাকৃষ্ণনের মধ্যে সন্দেহ আরও বেড়ে যায় বলে তদন্তকারীরা জানান। তবে সন্ধ্যার কোনো পরকীয়া সম্পর্ক ছিল, এমন অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, অভিনয়ের কাজ পাওয়ার চেষ্টা করার সময় সন্ধ্যা কথিত একটি ‘কাস্টিং কাউচ’ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। পরে তিনি আবার বালাকৃষ্ণনের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন এবং বালাকৃষ্ণন তাকে চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ তৈরি না হওয়ায় দাম্পত্য টানাপোড়েন আবারও বাড়ে।

হত্যার রাতেও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় সন্ধ্যা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরপরই পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে এবং তাকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে দাবি করা হয়।

পুলিশ সন্ধ্যার পরিচয় শনাক্ত করতে এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠন করতে সক্ষম হলেও একটি প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এত বিপুল পরিমাণ আবর্জনা তল্লাশি এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর পরও সন্ধ্যার মাথা ও বাঁ হাত উদ্ধার করা যায়নি।

Manual2 Ad Code

নিহতের পরিচয় মুছে ফেলতে চেহারা ও আঙুলের ছাপ সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তদন্তের ঘটনাপ্রবাহে উঠে আসে। কিন্তু ডান হাতে থাকা দুটি ট্যাটুই শেষ পর্যন্ত সেই অজ্ঞাতপরিচয় নারীর পরিচয় সামনে নিয়ে আসে। শিব-পার্বতী ও ড্রাগনের সেই চিহ্ন এবং এক মায়ের শনাক্তকরণেই খণ্ড-বিখণ্ড দেহাবশেষ ফিরে পায় তার নাম, সন্ধ্যা।

Manual8 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code