

ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী নয়ন :::
গত সাত বছর ধরে নিউইয়র্কে আমার বসবাস। এত নিরব নিস্তব্দ আমেরিকা কখনো দেখিনি।
এত এ্যাম্বুলেন্স এর শব্দ পূর্বে কখনো শুনিনি। প্রতি মিনিটেই ধ্বনী প্রতিদ্ধনিত্ব হচ্ছে এ্যাম্বুলেন্স এর করুন শব্দ।
হাজার হাজার বাঙালীর বসবাস নিউইয়র্কে। ইতিমধ্যে মারা গেছেন ২৬জন বাংলাদেশী। ধারনা করা হচ্ছে প্রায় শতাধিক বাঙালী আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে বাঙালী কমিউনিটিতে বাড়ছে আতংক উৎকন্ঠা। ৩১ মার্চ ২০২০, সকাল ৫:৩০ মিনিট পর্যন্ত শুধুমাত্র নিউইয়র্কে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭৩২৫ জন,মৃত্যু বরন করেছেন ১৩৪২ জন।
এই নিষ্ঠুর করোনা চিনেনা শরীরের রং,বুঝেনা ধনী গরীব,শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত। করোনা যেন একটুও করুনা করছে না। হঠাৎ করে থামিয়ে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে।
ফেসবুক,মেসেজ কিংবা মোবাইল ফোনে প্রতিনিয়তই আসছে খারাপ সংবাদ। চেনা জানা কত পরিচিত লোকজন হঠাৎ করেই চলে যাচ্ছেন। কিন্তু এমন ভাবে চলে যাচ্ছেন বিদায় জানানোর সুযোগটাও নেই। নিজ উপজেলার, নিউইয়র্কের বাসিন্দা পাশের বাসার স্বামী-স্ত্রী দুজনই আক্রান্ত। গত প্রায় দুই বছর প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও যার সাথে দেখা হয়েছে বন্ধুবর প্রিয় ভাই ও তার বৃদ্ধ মা এবং বোন ও বোন জামাই চার জন অসুস্থ। পায়ে হেটে দুই মিনিটের দুরত্ব কিন্তু গিয়ে দেখার সুযোগ নেই। অথচ কারনে অকারনে সময়ে অসময়ে তার বাসায় আমার যাতায়াত ছিল। তার পাশের বাসার এক ভাবী আক্রান্ত। আর কতই বা লিখবো। আক্রান্তের সংখ্যা লিখতে থাকলে লিষ্ট কেবল দীর্ঘই হবে।
বলতে গেলে মৃত্যু যেন নিজ দরজায় কড়া নাড়ছে। কখন জানি ডাক আসে,চলে যেতে হয়। প্রত্যেক মৃত্যুই বেদনার। কিন্তু এ মৃত্যুর বেদনা যে কত প্রকট যার স্বজন মারা গেছেন কেবল তিনিই বুঝবেন। সদ্য পিতা হারানো একভাই বললেন, ডাক্তার ভিডিও কল দিয়ে তাকে বললেন তার পিতাকে আর আইসিইউতে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাই তার বাবাকে এখনই বিদায় জানাতে হবে,তখন ডাক্তার তার বাবার সামনে মোবাইল ফোন ধরলেন আর ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে ছেলে কালেমা পড়লেন। কথাগুলো শুনারপর যেন নিজেরই কলিজা ফেটে যাচ্ছিলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই মারা যাচ্ছেন জেনেও মৃত্যুর সময় যেমন কাছে থাকা যায় না,একটু ছুয়ে আদর করা যায় না। ঠিক তেমনি মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির গোছল কিংবা শেষ বারের মতো প্রিয় মুখটাও পর্যন্ত দেখার সৌভাগ্য হয় না। তার চেয়েও কষ্টের জানাজার নামাজটাও ঠিক মত দেয়া যাচ্ছে না। করোনার করুন থাবায় ধুকে ধুকে কাঁদছে পুরো বিশ্ব। নিমিষেই হাজার হাজার স্থাপনা কিংবা হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়ার হুঙ্কার যারা দেন তারা আজ কতইনা অসহায়।মৃত্যু ঠেকাতে কত চেষ্টাই না করে যাচ্ছেন। যত সময় গড়াচ্ছে ততই দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এ্যাম্বুলেন্স এর করুন সুর প্রতি মুহূর্তই হৃদয়ে নাড়া দিচ্ছে। একজন প্রবাসীর মধ্যে অনেকগুলো মানুষ প্রতিদিন হাজারো স্বপ্ন বুনেন। একজন প্রবাসীর মৃত্যু মানে অনেক মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু। নিউইয়র্কের করুন অবস্থায় উদ্বিগ্ন জননী সহ প্রিয়জনরা। অডিও কলে ভাল আছি বললেও যেন মা-বোনদের মনে শান্তি আসছে না। ভিডিও কল দিয়ে আমার চেহারা দেখেই কেবল তারা বিশ্বাস করতে চান আসলেই আমি ভাল আছি। হ্যা আল্লাহর কৃপায় এখনো ভাল আছি। কতক্ষনইবা ভাল থাকি আল্লাহ ভাল জানেন। চরম উৎকন্ঠা উদ্বিগ্নতায় কাটছে প্রতি মুহুর্ত।বেঁচে থাকার আশায় প্রায় কুড়ি দিন বন্ধি হয়ে আছি নিজ রুমে।মৃত্যু ভয় এতটাই জেঁকে বসেছে যা পূর্বে কখনো হয়নি। মৃত্যু অনিবার্য,জন্মিলেই মরতে হবে,এটাই চিরন্তন সত্য। তবুও মৃত্যু ভয়ে আজ গোটা বিশ্ব ঘরে বন্ধি। আমরা প্রত্যেকেই জানি আমাদের একদিন না একদিন এই দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে চলে যেতে হবে। তবুও আরো কিছুক্ষন,আরো কিছুদিন কিংবা আরো কিছু বছর বেঁচে থাকতে চাই। সবাই মিলে সৃষ্টিকর্তাকে বেশী বেশী ডাকুন। একমাত্র আল্লাহই পারেন আমাদেরকে রক্ষা করতে। জীবন চলারপথে ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাই।
বাসায় থাকুন
একা থাকুন
নিরাপদে থাকুন
ঘন ঘন হাত ধৌত করুন
বেশী বেশী আল্লাহকে ডাকুন।
লেখক :
ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী নয়ন,
নির্বাহী সম্পাদক
বাংলানিউজইউএসডটকম
১ এপ্রিল ২০২০