বাসায় যেভাবে জামাতে তারাবি পড়বেন

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual8 Ad Code

কঠিন একটা মুহূর্তে আমাদের মাঝে রমজানের আগমন ঘটেছে। বলতে গেলে ইতিহাসে এরকম রোজার মাস আর দেখতে হয়নি পৃথিবীর মুসলমানদের।

সাধারণত অন্যান্য মাসের তুলনায় রমজান একটু ভিন্ন রূপে গ্রহণ করে মুসলমানরা। মুমিনের হৃদয় বারো মাস রমজানের জন্য অপেক্ষা করে।

 

Manual5 Ad Code

কখন রমজান আসবে, কখন একসঙ্গে মসজিদে বা বাসায় ইফতারের আয়োজন হবে, কখন হাফেজদের সুললিত কণ্ঠে তারাবির নামাজে অংশগ্রহণ করে সাধারণ মানুষ প্রাণ জুড়াবে-এ বাসনা নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুমিন অধীর আগ্রহে রমজানকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষায় থাকেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও মেনে নিতে হচ্ছে, প্রতিবারের ন্যায় এবারও মুয়াজ্জিন ভোরবেলা ডেকে বলছে ঘুম থেকে উঠুন, সেহরি খাওয়ার সময় হয়েছে, আপনারা তাড়াতাড়ি উঠুন, সেহরি খেয়ে নিন!

সেহরির শেষে আজান দিবেন মুয়াজ্জিন। কিন্তু মসজিদে আসতে বলবেন না। কারণ আমরা এতটাই পাপ করে ফেলেছি, যার কারণে আমাদের প্রতিপালক অসন্তুষ্ট হয়ে তার ঘরে ঢুকতে দিচ্ছেন না। মসজিদের দুয়ার আমাদের জন্য বন্ধ। কবে খুলবে জানা নেই।

ছোটবেলা থেকে প্রতি রমজানে মসজিদে ইফতারি করতাম। আমাদের এলাকার সমবয়সীরা জিলাপি নিয়ে কাড়াকাড়ি করতাম। যদি নিজের প্লেটের জিলাপিটা বড় হতো, তাহলে হাত দিয়ে ঢেকে রাখতাম। যেন কেউ নিতে না পারে।

বিষয়টি হাস্যকর হলেও এটি আমার রঙিন ছেলেবেলার সবচেয়ে মজার অতীত।

ইসলামিক আইন নিয়ে গ্রাজুয়েট করার পরও এরকম করেছি। রঙিন শৈশবের অভ্যাস ইচ্ছে করেই বদলাইনি। কিন্তু এবার এলাকার সব বন্ধুরা ছুটিতে থাকলেও একসঙ্গে ইফতারি করার কোনো সুযোগ নেই।

Manual8 Ad Code

ধর্মীয় যে সব কাজ খুব আনন্দের সঙ্গে করতাম, এগুলোর কিছুই এবার একসঙ্গে করতে পারব না।

Manual1 Ad Code

গত ৬ বছর তারাবি পড়িয়েছি, এবার পড়াচ্ছি না। মসজিদ সংশ্লিষ্ট অনেকেই যোগাযোগ করেছেন। আমি তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছি, ‘আসলে তারাবি নফল না সুন্নত একটি ইবাদত। এটি মসজিদে আদায় করতে হবে এমনটি জরুরি নয়। তাছাড়া পরিস্থিতি যেহেতু খুবই ভয়াবহ, এ জন্য জামাতে তারাবি পড়ার কোনো সুযোগ নেই।’

Manual6 Ad Code

বর্তমান পরিস্থিতিতে যেহেতু ধর্ম মন্ত্রণালয় ১২ জন মুসল্লি ছাড়া বাকিদের ঘরে নামাজ আদায় নির্দেশ দিয়েছেন, সুতরাং এই নির্দেশ মান্য করতে হবে। যেহেতু এর মাধ্যমে সোশ্যাল ডিসটেন্স বা সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকে।

আমি আমার ঘরকে মসজিদ বানিয়েছি। মা,বাবা, এক বোন ও দুই ভাগিনাকে নিয়ে ঘরেই আদায় করছি সব নামাজ।

তাই আপনাদেরকেও বলব, প্রত্যেকেই ঘরে নামাজ আদায় করে নিন। দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবি পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে একসঙ্গে জামাতে আদায় করুন।

ইসলামের প্রথমদিকে এই রীতি ব্যাপকভাবে চালু ছিল। মহিলা পুরুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতেন। রাসূল (সা.)-এর পেছনে অসংখ্য মহিলা সাহাবী মসজিদে নববীতে জামাতে নামাজ আদায় করেছেন।

করোনার কারণে সেই পুরনো নিয়ম চালু করার একটি সুবর্ণ সুযোগ আমাদের মাঝে এসেছে। আমরা পরিবারের সব সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারি।

সে ক্ষেত্রে যে কোনো একজন পুরুষ নামাজের ইমামতি করবেন। প্রাপ্তবয়স্ক অন্য পুরুষরা তার পেছনে দাঁড়াবেন। এরপর পর্যায়ক্রমে দাঁড়াবেন অপ্রাপ্তবয়স্ক ও পরিবারের মহিলা সদস্যবৃন্দ।

এ ক্ষেত্রে যিনি ইমামতি করবেন তার কুরআন তিলাওয়াত শুদ্ধ হতে হবে। পরিবারের মধ্যে ইমামতিতে পারদর্শী কয়েকজন থাকলে, সে ক্ষেত্রে যিনি কুরআন ও হাদিস সম্পর্কে অধিকতর জানেন, তিনি দাঁড়াবেন ইমামের মুসল্লায়।

এভাবে আমরা আমাদের গৃহবন্দি সময়টুকু মসজিদে না গিয়েও সমপরিমাণ নেকির ভাগীদার হতে পারি। আমাদের নেকি অর্জনে কোনো ক্ষতি হবে না।

আমরা মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করলে যতটুকু নেকি পেতাম, ততটুকুই পাব। বিন্দু পরিমাণও কম দেয়া হবে না আমাদের থলেতে।

এ কথা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই- দুনিয়াতে যত বালা-মুসিবত আসে সবকিছু মানুষের কর্মের প্রতিফলরূপ। আজাব-গজব বা শাস্তি থেকে যারা শিক্ষা নেন, তারা সফল। আর যারা ভুলে যায়, তাদের পরিণাম হয় ভয়াবহ। যেমনটি হয়েছিল ইহুদিদের সঙ্গে।

সুতরাং আমাদের প্রথম কর্তব্য হবে, বেশি বেশি ইস্তেগফার করা। এটাই আমাদের একমাত্র এবং প্রধান হাতিয়ার।

এরপর আমরা সামাজিক দূরত্ব, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা, স্বাস্থ্যকর খাবারসহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা যে সব বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করতে বলেছেন সেগুলোকে ন্যূনতম অবহেলা না করে সর্বোচ্চ দিয়ে মেনে চলব।

এই নির্দেশ শুধু ডাক্তাররা আপনাকে দিচ্ছে না। বরং মোহাম্মাদের (সা.) নিকট প্রেরীত ধর্ম ইসলাম আপনাকে ডাক্তারদের সঠিক পরামর্শ মেনে চলার সর্বোচ্চ আদেশ প্রদান করে।

ইসলাম বলে, সুস্বাস্থ্যের জন্য ডাক্তারগণ যে সব আদেশ বা নিষেধ করে থাকেন সেগুলোকে পালন বা বর্জন করা জরুরি।

সুতরাং আমাদের কর্তব্য, সতর্কতার সর্বোচ্চ অবলম্বন করে বাহ্যিকভাবে ডাক্তারদের পরামর্শ মেনে চলা এবং হৃদয় আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে অপরাধীর মতো ক্ষমা চাওয়া।

আসুন আমাদের অনাবাদি ঘরকে নামাজের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করি। কুরআনের আলো ছড়িয়ে দেই ঘরের সর্বত্র। কুরআনের মাসে কুরআনের শব্দে সারাঘর মুখরিত করে তুলি।

সিজদায় আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করি। ক্ষমা প্রার্থনা করি। আসন্ন বিপদ থেকে মুক্তি চাই। দেশের জন্য দোয়া করি। বিশ্বের জন্য দোয়া করি।

ইফতারের আগমুহূর্তে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরাই প্রভুর চরণতলে। ইনশাআল্লাহ, আমরা দুই ঈদ একসঙ্গে পালন করব। একটি হল রমজানের ঈদ, আরেকটি করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির ঈদ।

শিক্ষক: ইসলামিক আইন ও আরবি সাহিত্য, জামিয়া মাহমুদিয়া সাভার।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code