বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, ব্যবস্থাপনায় খুঁজতে হবে সমাধান

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual8 Ad Code

 

জসিম ইমরান
বন্যায় নলকূপ ডুবে গেছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট। তাই গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসি গ্রামের কৃষক আবদুল জলিল পরিবার নিয়ে কলার ভেলায় চেপে পানি সংগ্রহ করতে উঁচু জায়গায় যাচ্ছেন। ২২ জুলাই। ছবি: প্রথম আলো
বন্যায় নলকূপ ডুবে গেছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট। তাই গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসি গ্রামের কৃষক আবদুল জলিল পরিবার নিয়ে কলার ভেলায় চেপে পানি সংগ্রহ করতে উঁচু জায়গায় যাচ্ছেন। ২২ জুলাই। ছবি: প্রথম আলো
করোনার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, অর্থনীতির গতি হারানো এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থার কারণে সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি সরকার ও গণমাধ্যমের কাছ থেকে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। তারপরও বন্যাকবলিত মানুষের অসহায়তার যে খণ্ডচিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসছে, তা হৃদয়বিদারক। বন্যার কারণে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, আবার বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নদ-নদীর খনন এবং বাঁধ নির্মাণের নামে ব্যাপকভাবে অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু তেমন কোনো দৃশ্যমান ফলাফল নজরে আসছে না। বন্যা যেহেতু বাংলাদেশে একটি নৈমিত্তিক দুর্বিপাক, তাই বন্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগ দেওয়া একান্ত জরুরি।
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের একটি বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশের অবস্থান। ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা পানিপ্রবাহের হিসাবে বিশ্বের চতুর্থ ও পঞ্চম বৃহত্তম নদী, আর গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা যৌথভাবে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে। প্রতিবছর গড়ে এই তিনটি নদী সমুদ্রে ১ দশমিক ৩৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার পানি নির্গমন করে থাকে। পলি পরিবহনের ক্ষেত্রেও গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এই দুটি নদী মিলে বাংলাদেশে বছরে এক বিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে আসে, যার ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ নদীবক্ষ এবং প্লাবন ভূমিতে জমা হয় আর বাকিটা সমুদ্রসীমায় পৌঁছায়।
ভৌগোলিকভাবে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের অবস্থান ইউরেশীয়, ভারতীয় এবং বার্মা নামের তিনটি টেকটনিকস প্লেটের মিলনস্থলে। লিথোস্ফেয়ার নামে পরিচিত পৃথিবীর ওপরের স্তর অনেকটা ফাটা কিন্তু ভেঙে না যাওয়া ডিমের খোসার মতো, যার একেকটি অংশকে টেকটনিকস প্লেট বলা হয়ে থাকে। পর্বতমালা সৃষ্টি এবং ভূমিকম্পের জন্য দায়ী প্লেট টেকটনিকস, যা হচ্ছে এই প্লেটগুলোর নড়াচড়া আর একটির নিচে আরেকটির ঢুকে পড়ার প্রবণতা। অতি মাত্রায় পানি ও পলিপ্রবাহ আর এই অঞ্চলের সক্রিয় টেকটনিকসের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টির জন্য প্রকৃতির যে অবিরাম চেষ্টা, তার ফসল হচ্ছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূপ্রকৃতি এবং এর অনবরত পরিবর্তন-পরিবর্ধন।
বাংলাদেশে নদীভাঙন, নদীর গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন, নদীতে পলি পড়া, চর জেগে ওঠা আবার বিলীন হয়ে যাওয়া এবং প্রতিবছর বন্যা হওয়া অনেকটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের অংশ। নদীর গতিপথ পরিবর্তন সাধারণত একটি ধীর প্রক্রিয়া। তবে প্রবল বন্যা ও ভূমিকম্প অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বড় নদীরও গতি-প্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। চিলমারীর দক্ষিণ থেকে গোয়ালন্দের উত্তর পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের বর্তমান মূলধারা যমুনা নদী। মাত্র আড়াই শ বছর আগেও যমুনার অস্তিত্ব ছিল না; পুরাতন ব্রহ্মপুত্রই ছিল ব্রহ্মপুত্রের মূলধারা। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বিশ্বের অন্যতম চওড়া বেণিসদৃশ বা ব্রেইডেড ধরনের নদী। বেণিসদৃশ নদী অপেক্ষাকৃত বেশি ভাঙন ও বন্যাপ্রবণ; নদীর অপেক্ষাকৃত সোজা দুই কুলের মাঝে একাধিক জলপথ বা চ্যানেল সক্রিয় থাকে আর ছোট-বড় অসংখ্য দ্বীপ ও চর স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে ওঠে। বর্ষার সময় এসব চর আর জলপথ অনবরত স্থান ও আকার বদলায়।
বাংলাদেশের মাঝারি ও ছোট নদীগুলো আঁকাবাঁকা বা মিয়েনডারিং প্রকৃতির। আঁকাবাঁকা নদীতে সক্রিয় জলপথ একটি, নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয় অনেকটা ধীরে। একটি নদীর পানি ও পলি পরিবহনের ক্ষমতা অনেকাংশেই নির্ভর করে নদীর তলদেশের গড় ঢালের ওপর। নদী ভরাট হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে হয় দীর্ঘ মেয়াদে নদীর তলদেশের গড় ঢালের পরিবর্তন নিরীক্ষা করে; চর জেগে ওঠার ভিত্তিতে অনুমান করে নয়।
বাংলাদেশে বন্যার কারণ নানাবিধ। যেমন পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছাড়া নগরায়ণ, উজানে ও অববাহিকায় বৃষ্টিপাতের ফলে নদীর পাড় উপচে বা বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবনভূমিতে পানি প্রবেশ, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঁধ ভেঙে লোনাপানি ঢুকে পড়া, সড়ক ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের জন্য পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ রোধ হওয়া ইত্যাদি। আজকাল একটু ভারী বর্ষণ হলেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীসহ অনেক জেলা শহরে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে আবাদি জমিতে লোনাপানির অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য ষাট ও সত্তরের দশকে ব্যাপকভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এসব বাঁধ নির্মাণের ফলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টির কারণে অনেক জায়গায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া বেড়ি বাঁধে ঘেরা এলাকায় পলি প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভূমির অবনমন হচ্ছে এবং একবার বাঁধ ভেঙে লোনাপানি ঢুকে পড়লে তা আর সহজে নিষ্কাশিত হচ্ছে না।
বন্যা ও জলাবদ্ধতার যে কারণগুলো মানুষের সৃষ্টি, তার সমাধান কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। শহর অঞ্চলে জলাবদ্ধতার বড় কারণ বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে গাছপালা, নালা ও জলাধারের অস্তিত্ব বিলোপ। এ ছাড়া পানি নিষ্কাশনের যে ব্যবস্থা, তা অপ্রতুল ও অব্যবস্থাপনার শিকার। শহরে জলাবদ্ধতা কমাতে হলে এলাকাভিত্তিক সমাধান না খুঁজে পুরো নগরী এবং আশপাশের এলাকার জন্য পরিকল্পনা, সঠিক নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা দরকার। এ জন্য পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ভূগর্ভস্থ নালা ও সুড়ঙ্গ স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিকেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা জরুরি। বৃষ্টির পানি উৎসের কাছে যতক্ষণ সম্ভব ধরে রাখার ব্যবস্থা করা, পুকুর-জলাধারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং ছাদ ও আঙিনায় গাছ লাগানোর মাধ্যমে বৃষ্টির পানির সর্বোচ্চ প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও শোধনের মাধ্যমে প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। পল্লি অঞ্চলে যেসব স্থাপনা জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী, সেগুলো পরিবর্তন ও সংশোধন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রেও সমস্যার মূলে যেতে হবে এবং সমাধানের জন্য প্রকৌশল, ভূতত্ত্ব ও জীববিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে হবে। মোটের ওপর শহরের তুলনায় পল্লি অঞ্চলে জলাবদ্ধতার সমাধান করা কিছুটা সহজ।
প্রতিবছর বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ, বিশেষ করে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়। কিন্তু সময়-সময় অতি বন্যায় দেশের দুই–তৃতীয়াংশ পর্যন্ত তলিয়ে যায়, যেমন ১৯৮৮ ও ৯৮ সালের বন্যা। অতি বন্যা শুধু বাংলাদেশ নয়, যেকোনো দেশের পক্ষেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে, সক্রিয়ভাবে আগাম ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কী উপায়ে বন্যার প্রকোপ কমানো যায়। জাতীয় স্বার্থে শহর, নগরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। প্রাকৃতিকভাবে বন্যাপ্রবণ এবং কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করাই ভালো। এসব এলাকা থেকে জনবসতি উঁচু এলাকায় সরিয়ে নিয়ে এবং কৃষিব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে বন্যার ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। এ ছাড়া চরে স্থায়ীভাবে বসবাস নিরুৎসাহিত করা দরকার।
বাংলাদেশে হাওর এলাকার মানুষ বার্ষিক প্লাবনে অভ্যস্ত। তাদের জীবনযাপন এবং কৃষিব্যবস্থা অন্যান্য এলাকার জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। অতি বন্যা মোকাবিলায় দরকার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে বর্তমান ও ভবিষ্যতে বন্যার প্রকৃতি ও ব্যাপকতা নিরূপণ করা। ডেটা ও মডেলের সমন্বয়ে শুধু পূর্বাভাস নয়, চলমান সময়ে বন্যার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ ও নিরূপণ সম্ভব। এ জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক সেন্সর নেটওয়ার্ক স্থাপন করা দরকার হবে। বন্যার সঙ্গে সম্পর্কিত সেন্সর তৈরির প্রযুক্তি সহজলভ্য এবং বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা স্বল্প খরচে এগুলো নির্মাণ ও স্থাপন করতে সক্ষম। এ ছাড়া উজানের দেশের সঙ্গে তথ্য–উপাত্ত বিনিময়ের মাধ্যমে পূর্বাভাসের মান বাড়ানো যায়।
বন্যা শুধু প্রাকৃতিক বিপত্তি নয়, অর্থনীতিক ও সামাজিক বিপত্তিও বটে। কাজেই বন্যা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানেরও প্রয়োগ দরকার।
বিগত দশকগুলোয় বন্যার পূর্বাভাস, ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঝুঁকি হ্রাস এবং বন্যা ব্যবস্থাপনার ওপর ব্যাপকভাবে গবেষণা হয়েছে। তথাপি বিশ্বব্যাপী বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি কার্যকরভাবে কমানো যাচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে বিষয়ভিত্তিক গবেষণা এবং জ্ঞান, চিন্তাভাবনা ও প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। বন্যা সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় সরকার, নাগরিক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, নগর–পরিকল্পনাকারী এবং বিভিন্ন সরকারি এজেন্সি ও বিভাগের সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, গণিত, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও অংশীদারত্ব অপরিহার্য। পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় এবং এ–সংক্রান্ত গবেষণায় সামগ্রিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও বন্যা ব্যবস্থাপনায় সরকার, বিশেষজ্ঞ ও জনগণের সমন্বয়ে সামগ্রিক পন্থা বা হোলিসটিক অ্যাপ্রোচ ফলপ্রসূ হতে পারে।
জসিম ইমরান: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনার পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। এই নিবন্ধের কিছু তথ্য স্টিভেন গুডব্রেড, মাইকেল স্টেকলার এবং মমিনুল হক সরকারের বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির ওপর বিভিন্ন গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code