মান্দা পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন চুন শিল্পের কারিগররা

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual1 Ad Code

 

মাহবুবুজ্জামান সেতু, মান্দা (নওগাঁ) :
নওগাঁর মান্দায় শামুক থেকে চুন তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন অনেক অসহায় পরিবারের লোকজন। তবে,উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন মান্দার চুন শিল্পের কারিগররা। মান্দা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এসব চুন তৈরি করা হয়ে থাকে বলে জানা গেছে। এখানকার ভুঁইমালীরা তাদের পূর্ব-পুরুষের ঐতিহ্যগত চুন তৈরির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

Manual4 Ad Code

উপজেলার মৈনম ইউপি’র জলছত্র মোড়ের পশ্চিম পার্শ্বে চুনাতা পাড়ায় এবং তেঁতুলিয়া ইউপি’র সাবাই হাটের দক্ষিণ পশ্চিমে কামারপাড়াসহ আসেপাশের গ্রামগুলোতে গেলেই চোখে পড়বে সাদা ধোঁয়ায় হলুদ কিরণ। এসব গ্রামের ভুঁইমালীরা চুলায় পুঁড়িয়ে শামুক আর ঝিনুক দিয়ে চুন তৈরি করে থাকেন। পানের স্বাদ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ মেশানো হয়। যেমন- সুপারি, চুনসহ জর্দা ও বিভিন্ন ধরনের মশলা। চুন ছাড়া পান খাওয়ার কোনো মজাই নেই। এই চুনের কদরও অনেক বেশি।

Manual2 Ad Code

চুন তৈরির কারিগররা ভুঁইমালী নামে পরিচিত। চুন বানানো তাদের বংশ পরম্পরার পেশা। ছোট ছোট করে কাঁটা জ্বালানি কাঠের টুকরো বিছিয়ে তাতে কেরোসিন তেল ঢালা হয় আগুন জ্বালানোর জন্য। চুন তৈরির চুলাটি দেখতে ছোট্ট কূপের মতো। চুলার তলদেশে প্রথমে বিছিয়ে দেয়া হয় ইট। পরে ইটের উপরে সাজানো হয় মাটির তৈরি ভাঙা পাতিলের টুকরা।
কাঠে আগুন ধরে গেলে ধোঁয়া ওঠা চুলায় ঢালা হয় ঝুড়ি ঝুড়ি শামুকের খোসা। শামুকের পরতের উপরে আবার বিছানো হয় জ্বালানি কাঠ, তার উপর আবারো শামুক।

চুন তৈরির প্রাচীন কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে শামুক আর ঝিনুকের খোসা। এসব খোসায় আছে চুনের মূল উপাদান- ক্যালসিয়াম, কার্বোনেট। জ্বালানি কাঠ আর শামুকের খোসায় চুলা ভরে গেলে নিচের গর্ত দিয়ে দিতে হয় একটানা বাতাস। বাতাস পেয়ে জ্বালানি কাঠের আঁচে স্তরে স্তরে পুঁড়তে থাকে শামুকের খোসা। আগুনের তাপে শামুকের খোসার ক্যালসিয়াম, কার্বোনেট ভেঙে তৈরি হয় ক্যালসিয়াম অক্সাইড বা কুইক লাইম। পুঁড়ে যাওয়া খোসার কুঁড়ো চালুনি দিয়ে চেলে এরপর ঢালা হয় পরিষ্কার এক গর্তে। পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে ভালো করে ঘুঁটলে তৈরি হয় ক্যালসিয়াম হাইড্রো অক্সাইড নামের চুন।

এভাবে ৫০ কেজি পোড়ানো গুঁড়া শামুক ও ঝিনুকের সঙ্গে পানি মিশিয়ে তা থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০কেজি চুন পাওয়া যায়। ধবধবে সাদা করতে চুনের সঙ্গে বিচি কলার রস মেশাতে হয়। এরপর তা জালের মাধ্যমে ছেঁকে বিভিন্ন হাঁট-বাজারে বিক্রয়ের উপযোগী করা হয়। এসব চুন ব্যবহার করে মাছ চাষের জন্য ঘের ও পুকুর প্রস্তুত করা হয়। পানের সঙ্গে তো খাওয়া হয়ই। এছাড়া ঘরের দেয়াল চুন-কাম করতেও ব্যবহৃত হয় এই চুন। মান্দা উপজেলার ভুঁইমালীরা যুগ যুগ ধরে এভাবেই বানিয়ে চলেছে খাবার উপযোগী ধবধবে সাদা চুন। এ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে একই প্রক্রিয়ায় চুন তৈরি করা হয়ে থাকে । এখানকার ভুঁইমালীরা তাদের পূর্ব-পুরুষের ঐতিহ্যগত চুন তৈরির ব্যবসার সঙ্গে এখনো অনেকে জড়িত রয়েছেন।

Manual5 Ad Code

চুন শিল্পের কারিগররা জানান, চুন তৈরির কাজ আমাদের জাত পেশা। তবে বর্তমানে খাল-বিল, নদী-নালায় পর্যাপ্ত পরিমাণ শামুক ও ঝিনুক না পাওয়া যাওয়ায় অতিরিক্ত দামে তা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অতীতে বস্তা প্রতি শামুক ও ঝিনুক ৫০-৬০ দরে কিনলেও বর্তমানে বস্তা প্রতি শামুক ও ঝিনুক ৩০০- ৫০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। চুনের বর্তমান বাজার দর প্রতি মণ (৪০কেজি) ৮০০ টাকা। তবে শামুক ও ঝিনুক পুড়ানোসহ বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে যে লাভ হয় তাতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই ক্ষতি সামলাতে অনেকেই বাপ-দাদার এই পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code