ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষে স্বাবলম্বী ফকিরহাটের কৃষকরা

লেখক:
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual4 Ad Code

,শেখ আবু সাঈদ, বাগেরহাট :

Manual1 Ad Code

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বেতাগায় নিরাপদ সবজি উৎপাদনে ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কৃষি দফতরের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ আর নানা ধরনের তদারকির কারণে এলাকার কৃষকরা এ পদ্ধতি অবলম্বল করে সফল হয়েছেন। যে কারণে ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ এ অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কৃষিনির্ভর দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে এ অঞ্চলে তেমন কোনো ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। সে বিষয়টি অনুধাবন করে প্রথম পর্যায়ে একজন কৃষক তার জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুনের চাষাবাদ শুরু করেন। তার দেখাদেখি চলতি বছর প্রায় ২০ জনেরে বেশি কৃষক তাদের নিজেদের জমিতে ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করেন। নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বেশ কয়েকজন কৃষক বেগুন চাষে সফলতা আনতে সক্ষম হয়।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, উপজেলা কৃষি অধিদফতরের পক্ষ থেকে তাদেরকে ২০১৮ সালে উপজেলার প্রান্তিক কৃষকদের ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। আর সেই থেকে তারা উপজেলার বেতাগায় প্রথম পরীক্ষামূলক এই পদ্ধতিতে বেগুনের চাষ শুরু করেন। ব্যাগিং পদ্ধতির বেগুন চাষে কোনো প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। যে কারণে স্থানীয় বাজারে এই বেগুনের চাহিদাও অনেক বেশি। কৃষকদের মতে এ অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ২০ জন চাষি ৩৪ হাজার ৫০০ চারা নিয়ে এই পদ্ধতিতে বেগুনের চাষ করছেন।
ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ এ অঞ্চলে একেবারেই নতুন একটি পদ্ধতি, যা অন্য কোনো স্থানে হচ্ছে বলে তাদের জানা নেই। এর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ হচ্ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় রোগবালাই ও পোকার সংক্রমণ থেকে বেগুন রক্ষায় শুরু হয়েছে ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ। এই পদ্ধতির চাষে কোনো ধরনের বালাইনাশকের ব্যবহার ছাড়াই ভালো মানের বেগুন উৎপাদন করা সম্ভব। এই প্রযুক্তিতে বালাইনাশক স্প্রে করার প্রয়োজনও হয় না। ফলে স্প্রে করার খরচ বেঁচে যায়।
কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে বেগুনে পলিব্যাগ ব্যবহার করা হয়। আর এই ব্যাগ যতœ সহকারে ব্যবহার করলে ৫ বছর ব্যবহার করা যাবে। যদি কোনো পলিব্যাগ ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে যায় তবে তা একত্রিত করে গর্তে ফেলে আগুন ধরিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। যার ফলে পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি হয় না। এই পদ্ধতিতে বেগুন উৎপাদনে একদিকে যেমন ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে, সেই সঙ্গে মানুষ পাচ্ছে নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি।
দেশে যত সবজি উৎপাদন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় বেগুন চাষে। যার ফলে শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ বেগুন নষ্ট হয় পোকার আক্রমণে। বেতাগা ইউনিয়নের ধনপোতা গ্রামের চাষি সরজিৎ কুমার পাল বলেন, ২০১৮ সালে উপজেলা কৃষি অফিসের একটা প্রশিক্ষণে যোগ দেন তিনি। যেখানে বেগুনের উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ সম্পর্কে জানতে পারেন। তখন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ শুরু করেন। তাতে আমি ভাবতেও পারিনি এই পদ্ধতির চাষে প্রথম হিসেবে এতটা স্বাবলম্বী হতে পারবেন। এর আগে তিনি স্বাভাবিক পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করতেন, তাতে প্রতি মণে পোকামাকড়ে নষ্ট বেগুন হত প্রায় ৮-৯ কেজি। আর এই পদ্ধতির চাষে প্রতি মণে পোকামাকড়ের আক্রমণে মাত্র ২-৩ কেজি বেগুন নষ্ট হচ্ছে। কৃষক সরজিৎ কুমার পালের সাফল্য দেখে উদ্বুদ্ধ হওয়া কৃষক শংকর কুমার দাশ, রিপন কুমার পাল, সুবল ও আনন্দ কুমার বলেন, প্রথমে ভেবেছি এই পদ্ধতির চাষে লাভ হয় কিনা। এমন দ্বিধার কারণে সাহস পায়নি। তবে সরজিৎ পালের সাফল্য দেখে আমরাও উদ্বুদ্ধ হয়ে এই পদ্ধতিতে বেগুন চাষ শুরু করি। আর এই পদ্ধতির চাষে ব্যাপক ফলন যেমন হয়েছে, তেমন আগের তুলনায় বহু গুণ কমেছে বেগুন নষ্টের পরিমাণ।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার তন্ময় কুমার দত্ত বলেন, আমরা কৃষকদের এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করি। তারই ধারাবাহিকতায় উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের মাসকাটা বিলে পরীক্ষামূলক এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু হয়। আর এই পদ্ধতির চাষে কৃষকরাও বেশ স্বাবলম্বী হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. নাছরুল মিল্লাত বলেন, বেগুনের প্রধান শক্র ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য কৃষকরা মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকেন। যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শুধু তাই নয়, এতে বেগুনের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি কুইনালফস বেগুনে পাওয়া গেছে। এই সমস্যাটি সমাধানে ব্যাগিং প্রযুক্তি প্রয়োগ করে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে বেগুনকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। আর ব্যাগ ব্যবহারের ফলে যে কোনো পাখি, ইঁদুর ও প্রতিকূল আবহাওয়া থেকেও বেগুন রক্ষা পাবে। ব্যাগের ব্যবহার শেষ হলে ব্যাগগুলো একসঙ্গে পুুড়িয়ে ফেলতে হয়। ব্যাগিং পদ্ধতিতে তুলনামূলক নিরাপদ ও বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদন করা সম্ভব। যে কেউ চাইলে অন্যান্য ফল-ফসলে ব্যবহার করতে পারবেন। আমরা এই পদ্ধতিতে বেগুন চাষে পরীক্ষামূলক সফলতা পেয়েছি।

Manual3 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code