রেলের পণ্যবাহী ওয়াগন এখন দুষ্কর্মের আখড়া

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual2 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ  পণ্য পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে আছে রেলওয়ের। সে কারণে পণ্যবাহী ওয়াগন রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থেকে হচ্ছে নষ্ট। এতে যেমন রেলের কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি পরিত্যক্ত ওয়াগন/ক্যারেজ দিনে দিনে হয়ে উঠছে মাদকসহ সব ধরনের দুষ্কর্মের আখড়া। রাজধানীর কমলাপুর, তেজগাঁও, বিমান বন্দর, টঙ্গীসহ সারা দেশে ১ হাজার ৬৬১টি মালবাহী ক্যারেজের মধ্যে ৬০০টির অধিক ক্যারেজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আবার মালবাহী ৩ হাজার ৪৮৬টি ওয়াগনের মধ্যে ১ হাজার ২৩৩টি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে রেলওয়ে, যা দেশের বিভিন্ন স্টেশনে, জংশনে অবহেলায় খসে-ঝরে ভেঙে পড়ছে। এসব ছাড়া বিভিন্ন দুর্ঘটনা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, চলাচল না করাসহ পরিচর্যার অভাবে অনেক ওয়াগন ও মালবাহী ক্যারেজ নষ্ট হয়ে গেছে ও যাচ্ছে, যা দুষ্কৃতকারীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজা, মদকসহ যত রকমের মাদক আছে সব কিছুই খাওয়া হয় এসব ওয়াগন ক্যারেজে ও এর আশপাশে। সেই সঙ্গে রাতের বেলায় এসব পরিত্যক্ত ওয়াগনের মধ্যে চলছে রমরমা দেহ ব্যবসা। অথচ নজর নেই রেলের। রেলরক্ষী বাহিনীকে ম্যানেজ করে এসব চলে বলে জানিয়েছেন অনেকে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, স্বাধীনতার আগে ও পরে রেলই ছিল পণ্য পরিবহনের মুখ্য বাহন। কিন্তু গত দুই দশক ধরে রেলের পণ্য পরিবহনে ভাটা পড়েছে। তাছাড়া বিশ্বব্যাংকের ফর্মুলা অনুযায়ী লোকসানের নামে তুলে দেয়া হয় রেলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুট। ফলে রেলে করে দেশের বিভিন্ন বন্দর ও প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে মালামাল পরিবহন কমতে থাকে। গত দুই দশক রেলের পণ্য পরিবহন থেকে তেমন কোনো আয় নেই। আর বর্তমান সরকার এসে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বাড়ানোয় চালক ও ইঞ্জিনের সংকট এবং রুট ফাঁকা না পাওয়ায় পণ্য পরিবহনে তেমন নজর দিতে পারেনি রেলওয়ে। রেলের পণ্য বহনের আয় চলে গেছে সড়ক পরিবহনের ওপর।

শত শত কোটি টাকার বিনিময়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা ওয়াগন-ক্যারেজ অবহেলায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় ‘ওয়েস্ট মাল’ দেখিয়ে কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে মূল্যবান এসব মালামাল। সরজমিন বিভিন্ন স্টেশনে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

Manual2 Ad Code

রেলওয়ে সূত্র জানায়, সারাদেশে এ ধরনের পড়ে থাকা ওয়াগন, ট্যাংক ও ক্যারেজের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। সেই সঙ্গে রয়েছে শত শত কিলোমিটার পরিত্যক্ত রেলপার্টি, সিøপারসহ নানাবিধ যন্ত্রপাতি। এসব পরিত্যক্ত রেলের জিনিসপত্র টেন্ডারের মাধ্যমে কেজি দরে বিক্রি করছে রেলওয়ে। আবার আইনি জটিলতায় স্ক্র্যাব বিক্রিতেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। গত দুই বছরে এসবের স্ত্র্যাব বিক্রি হয়েছে মাত্র ৯০ লাখ টাকা, যা কেনা হয়েছিল প্রায় ১০ কোটি টাকা দিয়ে। এদিকে রক্ষণাবেক্ষণ ও উপযুক্ত ব্যবহারের অভাবে প্রায় হাজার কোটি টাকার মালামাল রোদে, জলে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, চুরি হচ্ছে দরজা-জানালা, সিট, রেল পার্টি ইত্যাদি।

Manual2 Ad Code

রেল সূত্র জানায়, ২০ বছর আগে যেখানে শতাধিক মালবাহী ওয়াগন এবং অর্ধশতাধিক তেলবাহী গাড়ি চলত, বর্তমানে তা নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ১০-১৫টিতে। আর মালামাল পরিবহনের এ ঘাটতি হিসেবে ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও রুট ফাঁকা না থাকা, প্রায়ই দুর্ঘটনায় মালামাল নষ্ট হওয়া, সময় মতো ডেলিভারি দিতে না পারাকে দায়ী করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। ডাবল লাইন না হওয়ায় প্যাসেঞ্জার ট্রেনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পণ্যবাহী ট্রেন দিনে দিনে কমছে। সেই সঙ্গে রেলের মালামাল পরিবহন দীর্ঘদিন ধরে চলে গেছে সড়কপথে। ফলে আয়ও কমেছে রেলওয়ের। আবার ব্যবহার না হওয়ায় রেলওয়ের প্রায় অধিকাংশ ওয়াগন দেশের বিভিন্ন স্টেশন ও ওয়ার্কশপে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। যার মধ্যে মাদক সেবন থেকে অনৈতিক কাজ-কর্মও চলে বলে স্বীকার করেছেন অনেকেই। গত ২ বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ দেড় হাজারের মতো ওয়াগন ও তেলের ট্যাংক কেজি দরে বিক্রি করেছে রেলওয়ে।

Manual2 Ad Code

এ বিষয়ে এডিজি অপারেশন অফিস সূত্র জানায়, রেলের মালবাহী মোট ১ হাজার ৬৬১টি ক্যারেজের মধ্যে ৬০০টিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। মালবাহী ৩ হাজার ৪৮৬টি ওয়াগনের মধ্যে ১ হাজার ২৩৩টি পরিত্যক্ত রয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন দুর্ঘটনা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, চলাচল না করাসহ পরিচর্যার অভাবে অনেক ওয়াগন ও মালবাহী ক্যারেজ নষ্ট হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। আবার যাত্রীবাহী ট্রেন বাড়ানোয় মাল পরিবহনের জন্য ইঞ্জিন নেই। অনেক সময় ভারত থেকে মালামাল আনতে ভারতীয় ওয়াগনের ভাড়াও গুনতে হচ্ছে রেলওয়ের। যার জন্য লাখ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, এসব মেয়াদোত্তীর্ণ ওয়াগন বিক্রির জন্য টেন্ডার করা হয়। বিগত ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে এসব ওয়াগন ও রেলের ভাঙাচোরা জিনিস বিক্রি করে ৬৩ কোটি টাকা এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে স্ক্র্যাব বিক্রি বাবদ রেলের আয় হয়েছে ৩৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন বন্ধ হওয়া রেললাইনের রেল পার্টিও টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, রেলের নষ্ট ও অকেজো ওয়াগন, বগি, পার্টি প্রায় সব অকশনে বিক্রি করা হচ্ছে। পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে এখনো কিছু বাকি রয়েছে। স্থান সংকুলানের অভাবে বিভিন্ন স্টেশনে বা ওয়ার্কশপে এগুলো রাখা হয়। যেগুলো মেরামত করার মতো তা মেরামত করে চালানো হচ্ছে। তবে ইঞ্জিনের অভাবে পণ্য পরিবহন করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। যার ফলে ওয়াগন ও ক্যারেজ অব্যবহৃত থাকছে। তাছাড়া রেলবহরে যত ওয়াগন রয়েছে তার অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। সে কারণে ব্যবহার না হওয়ায় অনেক মালবাহী ও তেলবাহী ওয়াগন-ট্যাংক পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এসব পরিত্যক্ত বগি ও ওয়াগানে অনৈতিক কিছু কাজ কর্ম বা এর মধ্যে মাদক খাওয়া হয় এ বিষয়ে তিনি ওয়াকিবহাল নন বলে জানান। তবে তিনি বলেন, রেল নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দেবেন যাতে এসব অনৈতিক কাজ-কর্ম বন্ধ করা হয়।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code