

নিউজ ডেস্কঃ
প্রতি রাতে ক্লান্তি বাড়ে মোহাম্মদ নাদিমের। পোশাকের নিচে রাইফেল নিয়ে বাড়ির প্রবেশপথে বসে থাকেন তিনি। এই দিয়ে শুরু হয় তার ভোর। পরে বাড়ির চারদিক প্রদক্ষিণ করেন তিনি। শহরের ধুলোময় রাস্তায় পদচিহ্নের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। এটি রাজধানী ইসলামাবাদের দক্ষিণ-পশ্চিমের ৩০০ কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান জেলার একটি শহর শারারোখা। ওই অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কম। তা সত্ত্বেও স্থানীয় চোর ও অপরাধীদের ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটান না নাদিম। তিনি মূলত পাকিস্তানি তালেবানের বিরুদ্ধে পাহারা দেন।
চলতি বছর উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান-সংলগ্ন জেলাগুলোতে লক্ষণীয়ভাবে সহিংসতা বেড়েছে। এটাই পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) জন্মস্থান। এখানে তাদের সদর দপ্তর রয়েছে। আফগানিস্তান পতনের পর থেকে তালেবানের সমর্থনপুষ্ট টিটিপির নিয়ন্ত্রণে যায় সীমান্তবর্তী ওইসব জেলা। ওইসব অঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, তারা টিটিপির নিয়ন্ত্রণাধীন জীবনে ফিরেছেন।
বিশ্লেষক ও স্থানীয়রা বলছেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এই বিদ্রোহে যুক্ত হয়েছে টিটিপি ও তাদের স্থানীয় মিত্র জঙ্গিরা, যাদের নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তারা সবাই নাগরিকদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা, অপহরণ, জাতিসত্তা কাউন্সিল ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণে জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদবিষয়ক পোর্টাল এসএটিপি বলছে, গত জানুয়ারি থেকে এই পর্যন্ত দক্ষিণ ও উত্তর ওয়াজিরিস্তানের জেলাগুলোতে ৩৭ হামলায় অন্তত ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। মূলত তালেবানবিরোধীদের হত্যা ও অপহরণ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেছেন, এসব ঘটনার জন্য আফগানিস্তানে ধারাবাহিকভাবে খারাপ হওয়া পরিস্থিতিকে দায়ী করেছে সামরিক বাহিনী। এমন প্রেক্ষাপটে গত অক্টোবরে টিটিপির সঙ্গে শান্তি আলোচনার ঘোষণা দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। সন্ত্রাসীদের শান্তির পথে ফেরাতে এক মাসের যুদ্ধবিরতি করে পাকিস্তান সরকার ও টিটিপি। গত নভেম্বরে ভারপ্রাপ্ত আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বলেন, তালেবানের মধ্যস্থতায় ওই যুদ্ধবিরতি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই আলোচনার সঙ্গে সংশয় ও আতঙ্কও যুক্ত হয়েছে। ৩৩ বছরের নাদিম বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন খুবই খারাপ। তারা বলছেন শান্তি আছে। আসলে কোথাও শান্তি নেই।
নাদিমের চাচার কাছে দুই লাখ রুপি চাঁদা দাবি করেছিলেন টিটিপির সদস্য পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি। সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করায় গত ২৩ মে তাদের পরিবারের এক সদস্যের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। পরে তাদের বাড়িতে বন্দুকধারী হামলা চালায়। দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের অন্য বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এমন হুমকি তারা প্রায়ই পেয়ে থাকেন। দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের অধিকারকর্মী ফিদা মোহাম্মদ বলেন, ‘এটাই চাঁদাবাজির ধরন- যদি কেউ তাদের দাবি করা চাঁদা প্রথমে না দেয়, তাহলে তাদের গাড়ি বা বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এরপর দু-একবার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর তাদের হত্যা করা হয়।’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের ফেলো মাদিহা আফজান বলেন, এগুলো তালেবানের বিপজ্জনক অগ্রগতি। যেভাবে এক যুগ আগে ওই এলাকায় তাদের প্রত্যাবর্তন হয়েছিল, এগুলো তার পূর্বাভাষ দেয়।
দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের আইনপ্রণেতা মহসিন দাওয়ার বলেন, কাবুল পতনের পর তারা অভ্যন্তরীণভাবে শক্তি ও আস্থা পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, তারা আতঙ্ক ছড়াতে মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে। টিটিপি এখন ওই অঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল সরকারের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ করে যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে তারা।