নিউজ ডেস্কঃ করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে বিশ্বজুড়ে এখন উদ্বেগ ছড়ানো ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত দুই রোগীর সন্ধান মিলেছে বাংলাদেশ। এই দুজনই দেশের নারী ক্রিকেটার; তারা আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়ে সফর করে সম্প্রতি দেশে ফিরে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ওমিক্রণে আক্রান্ত ওই দুই নারী ক্রিকেটারের সংস্পর্ষে যারা এসেছিলেন তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। আমরা কন্টাক্ট ট্রেসিং করছি, সবাইকে পরীক্ষার আওতায় এনেছি। যারা সঙ্গে ছিল বা সংস্পর্শে এসেছে, সবার পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে, প্রচলিত টিকার দুই ডোজ করোনা ভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হওয়া থেকে দূরে রাখতে যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা বলেন, ২ ডোজের পর আরেকটি বুস্টার ডোজ ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি সুরক্ষা দিতে পারে। করোনা ভাইরাসের টিকার বুস্টার ডোজ সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে দেওয়া শুরু হতে পারে বলে আশার কথা শুনিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেন, ওমিক্রণে আক্রান্ত দুই খেলোয়াড়ের কারও কোনো ধরনের শারীরিক জটিলতা নেই, তারা ভালো আছেন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাদের কোনও উপসর্গ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওমিক্রন ঠেকাতে সীমান্তসহ দেশের সব প্রবেশপথ কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। ওমিক্রনে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে আসা সবাইকে দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। রাজনৈতিকসহ যেকোন সমাবেশ সীমিত করাসহ পূর্বের মতো মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশেষজ্ঞরা।
করোনা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট মানবদেহে সংক্রমণের পর অসংখ্যবার রূপবদল করে। এক বছরের বেশি সময় পর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টই মহামারীর মাত্রা ভয়াবহ করে তোলে। এরপর টিকা যখন মহামারী নিয়ন্ত্রণের আশা দেখাচ্ছে, তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় ধরা পড়ে ভাইরাসটির নতুন রূপ ওমিক্রন। ইতিমধ্যে ৬৬ দেশে ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়েছে। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করে। এর মধ্যেই জিম্বাবুয়েতে নারীদের ওয়ানডে বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে খেলতে যাওয়া বাংলাদেশ দল ঢাকায় পৌঁছানোর পর সব খেলোয়াড়দের পাঠানো হয় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে। সেখানে নমুনা পরীক্ষার পর দুজনের করোনা ভাইরাস পজিটিভ আসে। নারী ক্রিকেট দলের ওই দুই ক্রিকেটারের একজনের বয়স ২১, আরেকজনের ৩০ বছর। ছয় দিন পর গতকাল শনিবার ঢাকার শিশু হাসপাতালে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক নিশ্চিত করেন যে ওই দুই খেলোয়াড় ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত। তিনি বলেন, আমাদের দুইজন যে নারী ক্রিকেটার, যাদের শরীরে ওমিক্রন ভাইরাস পাওয়া গেছে, তাদের আমরা কোয়ারেন্টাইনে রেখেছি এবং তারা সুস্থ আছেন। তাদের যা যা চিকিৎসা দরকার, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাঝে মাঝেই তাদের পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। পুরোপুরি সেরে উঠতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। দুই সপ্তাহ আমরা দেখব, সম্পূর্ণ সেরে উঠলে তখন তাদের আমরা ছাড়তে পারব।
দক্ষিণ আফ্রিকা, যেখানে ওমিক্রনের প্রথম রোগী ধরা পড়েছিল, সেখানকার এক চিকিৎসক জানিয়েছিলেন যে এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তদের উপসর্গ মৃদু। আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনও পড়ছে না। ভারতে যে ৩৩ জনের মধ্যে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে, তাদের তেমন কোনো জটিলতা নেই বলে দেশটির স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ওমিক্রনের রোগীদের ক্ষেত্রে মৃদ দুর্বল ভাব, শরীর ও মাথা ব্যথার উপসর্গই দেখা যাচ্ছে। তাদের অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি, যেটা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুই নারী ক্রিকেটারের সঙ্গে যারা যারা ছিল, তাদের সবার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ডব্লিউএইচও আমাদেরকে জানিয়েছে, আমরা যে সমস্ত টিকা ব্যবহার করছি, এই টিকাও ওমিক্রনকে প্রতিরোধ করার কাজ করে। আমরা চাইব, যারা এখনও টিকা নেয় নাই, তারা তাড়াতাড়ি যেন টিকা নিই। ইতিমধ্যে ৭ কোটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরমধ্যে দ্বিতীয় ডোজ চার কোটির বেশি হয়ে গেছে। এখনও বেশ কিছু বাকি আছে, তারা যেন তাড়াতাড়ি টিকা গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন দেশের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। তবে এটা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশের মানুষ সারাবিশ্বে রয়েছে। এটি যে চলে আসবে সেটিই স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে ওমিক্রন ৬৬ দেশে ছড়িয়েছে। এর উপসর্গ মৃদ। তবে দ্রুত সংক্রমণের সক্ষমতা রয়েছে ওমিক্রনের। তাই এখন আমাদের প্রয়োজন সতর্ক হওয়া। বিমান, স্থল ও নৌপথসহ সকল সীমান্তে কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। ওমিক্রনে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে কেউ আসলে তাকে দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি সবার টিকা গ্রহণ করতে হবে। টিকা নিলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেক কম থাকে।
করোনা মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন ৬৬ দেশে আছে। কমবেশি সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আছে, দেশের মানুষের যাতায়াত আছে। তাই ওমিক্রন যে দেশে ঢুকে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। ওমিক্রন সংক্রমণের সক্ষমতা বেশি। এটি মোকাবেলায় যে প্রস্তুতি দরকার সেটি আমাদের আছে। দুই একদিনের মধ্যে টেকনিক্যাল কমিটি মিটিং করে সরকারকে লিখিত আকারে পরামর্শ দেবে। অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, ওমিক্রন মোকাবেলা করতে মাস্ক পরাসহ সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অহেতুক সমাবেশ করা যাবে না। বিবাহ অনুষ্ঠানে জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। অফিসে মিটিং সীমিত পরিসরে করতে হবে। প্রয়োজনে অনলাইনে মিটিং করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের সকল মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, দেশে করোনা ভাইরাস রয়েছে। করোনার আরেক নতুন ধরন ওমিক্রনও এসেছে। ওমিক্রনের সংক্রমণ সক্ষমতা অনেক বেশি। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ওমিক্রন মোকাবেলায় প্রস্তুতি একটাই, মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজে সুস্থ থাকতে হবে, অন্যকে সুস্থ রাখতে হবে।
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন দ্রুত ছড়ায়। তাই রাজনৈতিকসহ যেকোন সমাবেশ এড়িয়ে চলতে হবে। বিবাহের অনুষ্ঠানে জনসমাগম কমাতে হবে। সবার মাস্ক পরতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা ও টিকা গ্রহণের কোন বিকল্প নেই।
