

নিউজ ডেস্কঃ
পশ্চিমা বিশ্বের কূটনৈতিক তৎপরতা ও নানা সতর্কতার মধ্যেও ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। নিরাপত্তা শঙ্কা ক্রমশ ঘনীভূত হওয়ায় ১২টিরও বেশি দেশ ইউক্রেন থেকে নিজেদের নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি ইতোমধ্যেই তাদের নাগরিকদের ইউক্রেন ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।
ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত থামাতে তাদের মিত্র রাশিয়া সীমান্তে লাখো সেনা জড়ো করেছে, যা ক্রমাগত ভয়াবহ যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব এই সংঘাত থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা ও হুশিয়ারি অব্যাহত রাখলেও মস্কো সংঘাত অভিপ্রায়ের অভিযোগ অস্বীকার করছে।
ইউক্রেনে সম্ভাব্য রুশ সামরিক আগ্রাসন নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এ সময় পুতিনকে সতর্ক করে বাইডেন বলেছেন, ইউক্রেনে হামলা করলে চড়া মূল্য দিতে হবে রাশিয়াকে। খবর বিবিসি, রয়টার্সের।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শনিবার ভিডিওকলে কথা বলেন বাইডেন ও পুতিন। তাদের মধ্যে প্রায় ঘণ্টাখানেক কথা হয়।
এ সময় বাইডেন পুতিনের উদ্দেশে বলেন, ‘সামরিক আগ্রাসনের ফলে ইউক্রেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে রাশিয়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আর হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা দ্রুত এ কড়া জবাব দেবে। রাশিয়াকে এজন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।’
এদিকে বাইডেনের সঙ্গে ফোনালাপের আগে পুতিন শনিবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানায়, চলমান উত্তেজনা দ্রুত নিরসন না হলে কূটনৈতিক পদক্ষেপ ফলপ্রসু হবে না বলে পুতিনকে জানিয়েছেন মাখোঁ।
পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক চেষ্টা যেমন চলছে, তেমনি থেমে নেই ইউক্রেইনকে ঘিরে রাশিয়ার সমর সজ্জাও। নিজেদের সীমান্ত সংলগ্ন দেশটির তিন দিকেই দিনে দিনে শক্তি বাড়িয়েছে পুতিনের দেশটি। আর পশ্চিমা দেশগুলোর ‘যুদ্ধ শুরু হতে পারে’ এমন উদ্বেগের মধ্যেই ক্রিমিয়া উপদ্বীপের কাছে সমুদ্রে বড় ধরনের নৌ মহড়া করছে রাশিয়া।
আর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রতি ইউক্রেন সীমান্তে লক্ষাধিক রুশ সেনা জড়ো হওয়ার খবরে খুব দ্রতই দখল অভিযান শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কাও প্রকাশ করতে শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। যুদ্ধ এড়ানোর লক্ষ্যে মরিয়া কূটনৈতিক চেষ্টার মধ্যে রাশিয়ার এমন সমর সজ্জাকে ইউক্রেনের জন্য আসন্ন হুমকি হিসেবে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
তবে হামলা শুরু হলে কোন এলাকা থেকে শুরু হতে পারে সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে সিএনএন এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনের ওপর তিন দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করেছে রাশিয়া।
এ প্রতিবেদনে ইউক্রেনের তিন দিকেই রাশিয়ার সামরিক সজ্জা বাড়ানোর তথ্য তুলে ধরে কোন দিক দিয়ে সম্ভাব্য আক্রমণের চেষ্টা হতে পারে সে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে দক্ষিণ দিক থেকে ক্রিমিয়ায়, দুই দেশের সীমান্তবর্তী রাশিয়ার অংশ এবং উত্তরে বেলারুশে সেনা শক্তি বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ইউক্রেন এবং পশ্চিমা গোয়েন্দারা এ তিন এলাকাকে রণক্ষেত্র হিসেবে নজরে রাখছেন। এর প্রত্যেকটি এলাকাতেই রুশ সামরিক বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তন চিহ্নিত করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে দনেস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলটিকে। ২০১৪ সাল থেকে এ এলাকায় রাশিয়ার মদদ দেওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ইউক্রেনের সেনাদের সংঘাত চলছে।
রাশিয়ার গতিবিধি যারা পর্যালোচনা করছেন তাদের ধারণা- যেসব এলাকায় নিজেদের দখল রয়েছে, সেখানে সেনা বাড়াতে পারে মস্কো। এর মধ্য দিয়ে দখল অভিযান শুরু করার সবচেয়ে সহজ অবস্থান হয়ে উঠবে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল।
সিএনএনের কাছে থাকা স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবির বর্ণনা দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইলনিয়া এলাকায় বড় একটি সামরিক ঘাঁটিতে থাকা রাশিয়ার ট্যাঙ্ক, কামান এবং অন্যান্য সমরাস্ত্রগুলো খালি করে ফেলা হয়েছে। সম্প্রতি সেগুলো রণক্ষেত্রগুলোর বেশ কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালের শেষ দিকে ওই সেনা ঘাঁটিতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রের সমাগম ঘটানো হয়। এসবের মধ্যে প্রায় ৭০০ ট্যাঙ্ক, পদাতিক সেনাদের সাঁজোয়া যান এবং ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রেনে করে এবং সড়কপথে এসব অস্ত্রশস্ত্র আরও দক্ষিণে ইউক্রেইনের কাছাকাছি ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলে নেওয়া হয়েছে।
এসব যানবাহন, অস্ত্র এবং গোলাবারুদ ইলনিয়ার সেনা ঘাঁটিতে দেখা যাওয়ার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সিএনএন এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।
স্যাটেলাইটের ছবি সরবরাহ করা কোম্পানি ‘ম্যাক্সার’ এর জ্যেষ্ঠ পরিচালক স্টিফেন উড সিএনএনকে বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে যথেষ্ট পরিমাণ যানবাহন (ট্যাঙ্ক, স্বয়ংক্রিয় কামান এবং অন্যান্য সহযোগী যান) উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পার্ক থেকে সরে গেছে, এছাড়া আরও কিছু সাঁজোয়া যান কেন্দ্রীয় পার্ক থেকে ছেড়ে গেছে। সেইসঙ্গে উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের কুরস্ক এবং বেলগোরোদ ওবালাস্টস এলাকায় তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার কারণে শঙ্কা আরও বাড়িয়েছে।
নিবিড়ভাবে রুশ সেনাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা ওয়াশিংটনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পোটোম্যাক ফাউন্ডেশনের ফিলিপ কারবার এ মাসে সিএনএনকে বলেন, রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সমরাস্ত্র- ফার্স্ট গার্ডস ট্যাংক আর্মি।এই ইউনিট সাধারণত মস্কোতে রাখা হলেও ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কুরস্ক-কিয়েভ রুটে দ্রুততার সঙ্গে সামরিক শক্তি বাড়ানোর জন্য অনুকূলে থাকা এলাকাগুলোতে জড়ো করা হচ্ছে।
মস্কোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা দেশ বেলারুশে রুশ সেনাদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে ইউক্রেনে হামলার চালানোর সম্ভাব্য আরেকটি পথ হিসেবে শঙ্কা তৈরি করেছে। গত বৃহস্পতিবার রাশিয়া এবং বেলারুশ ১০ দিনের একটি যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। এর পরিধি এবং সময় নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমের দেশগুলোতে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শীতল যুদ্ধের পর বেলারুশে মস্কোর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ন্যাটো মহাসচিব জেসন স্টলবারবার্গ এসবের হিসেব দিয়ে বলেন, আনুমানিক ৩০ হাজার পদাতিক সেনা, স্পেৎসনাজ স্পেশাল অপারেশন ফোর্স, এসইউ-৩৫ সহ ফাইটার জেট, দ্বৈত ক্ষমতাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ইসকান্দর এবং এস-৪০০ ডিফেন্স সিস্টেমস জড়ো করা হয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) এর তথ্য অনুযায়ী বেলারুশের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে বছরের যেকোনো সময়ের বিবেচনায় এটি সবচেয়ে বড় মহড়া।