

ডেস্ক রিপোর্ট, নিউইয়র্ক :: ‘অপরাজিত’ (The Undefeated) । সর্বত্র সাড়া জাগিয়েছে ছবিটি। ছবিটি তৈরি হয়েছে পথের পাঁচালী কিভাবে তৈরি হয়েছে, সত্যজিৎ রায় কিভাবে সিনেমা জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন সেসব গল্প নিয়ে।
নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনে ছবির প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয় ১০ আগস্ট বুধবার। কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এবছর ১৩ মে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল। এই ছবির পরিচালক ছিলেন অনিক দত্ত। সাদাকালো পর্দায় সত্যজিৎ রায়ের জীবনের একটা বিশেষ অংশ এঁকেছেন পরিচালক অনিক দত্ত। ফ্রেন্ডস কমিউনিকেশনের ব্যানারে ছবিটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছেন ফিরদৌসুল হাসান ও প্রবাল হালদার।
প্রিমিয়ারে সাংবাদিকসহ সুধী সমাজকে আমন্ত্রণ জানানো জানিয়েছিলেন বায়োস্কোপ ফিল্মসের রাজ হামিদ এবং রুবনা রশিদ। অপরাজিত ছবি দেখতে স্টাটেন আইল্যান্ড, নিউজার্সি, লং আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থান থেকে দুই বাংলার অনেক দর্শক ভির করেছিলেন সিনেমা হলে। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন কলকাতা থেকে আসা প্রযোজক ফিরদৌসুল হাসান এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক ও গীতিকার তৌকীর আহমেদ।
রাজ হামিদ জানান, বাংলা চলচ্চিত্রের ধারায় সত্যজিৎ রায়ের অবদান অসামান্য। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ধারায় এক মাইলফলক রূপে পরিগণিত। এই ছবি শুধু ছবি নয়, বাংলা চলচিত্রের ইতিহাসলিপি বললেও কম বলা হবে। প্রত্যেক বাঙালিকে এই ছবি দেখা উচিত।
বায়োস্কোপ ফিল্মস অপরাজিত ছবিটি আমেরিকার ২০ টির অধিক স্টেট এবং প্রায় ৩০টি শহরে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।
রুবনা রশিদ জানান, সত্যজিৎ রায়ের মতো একজন গুণী ডিরেক্টরকে তাঁর শতবছর জন্মবার্ষিকীতে বায়োস্কোপ ফিল্মস অপরাজিত ছবির প্রদর্শনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে ভীষণ ভালো লাগছে।
সত্যজিৎ রায় ওরফে অপরাজিত রায়ের ভূমিকায় জিতু কমল দর্শকের মন ছুঁয়ে নেন। ছবিতে তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সায়নী ঘোষ। তিনিও অনবদ্য। পথের পাঁচালী (ছবিতে নাম পথের পদাবলী) ছবিকে কেন্দ্র করে সত্যজিৎ রায়ের জীবনছবি এঁকেছেন অনিক দত্ত। হুবহু সত্যজিৎ রায়ের মতো দেখতে জিতু কমলের উপস্থাপন প্রশংসার দাবি রাখে।
বিশিষ্ট সিনেমা ও নাট্যব্যাক্তিত্ব শমীক বন্দোপাধ্যায়ের মুখোমখি বসে আকাশবাণীর কোনো এক রেকর্ডিং ঘরে অপারিজিত রায় তার প্রথম সংগ্রাম ও সাফল্যের কথা বলছেন, এমনভাবেই ছবির শুরু। এই সাক্ষাৎকারের মাঝে মাঝেই ঢুকে পড়েছে অতীতের বিভিন্ন গল্প আর সেই গল্প বুননের মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে চিরকালীন বিশ্ব ক্লাসিক তৈরির নেপথ্য ঘটনার এক দলিল। পরিচালক অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার সঙ্গে সেইসব ঘটনাকে যেমন আজকের ডিজিটাল পদ্ধতিতে তুলে এনেছেন , তেমনি সিনেমার ভাষাকেও যথেষ্ট মর্যাদা দিয়েছেন।
ছবিতে দেখানো হয় অ্যাড এজেন্সিতে চাকরি করতে করতেই বিলেতে যাওয়ার সুযোগ এবং সেখানকার সিনেমা হলে দ্যা বাইসাইকেল রাইড ছবিটি দেখে নিজে ছবি বানানোর অনুপ্রেরণা পান অপরাজিত রায়। যদিও ‘অপরাজিত’ অথরাইজ বায়োপিক নয়। তবে এ ছবি যে মহান প্রতিভা সত্যজিৎ রায়ের জীবন নিয়েই সেকথা বুঝতে আর দর্শকের অসুবিধা হয় না। বাংলার গ্রামের ছবি অপূর্বভাবে পথের পাঁচালীতে তুলে ধরেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেই ছবির নির্মাণকাহিনীই অপরাজিতর প্রাণ। যা দেখতে গিয়ে আমরা জানতে পারি সেই সময় কতটা বেগ পেতে হয়েছিল পরিচালক সত্যজিৎ রায়কে।
কলকাতার কাছেই এক গ্রামে পথের পাঁচালীর শুটিং করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। আগের দিন দেখে আসা কাশবন পরেরদিন উধাও। অপরাজিত রায়ের কথায়..গরু খেয়ে নিয়েছিল। এক অভিনেতার টাকে বৃষ্টি পতনের দৃশ্য কীভাবে হয়ে উঠেছিল, অপরাজিত ছবিটি দেখে আমরা তা জানতে পারি। সেই ব্যক্তিকে গ্রামে একদিন দেখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু নাম জানা নেই। তাই গ্রামবাসীরাও কেউ খোঁজ দিতে পারছেন না। তখনই একটা সাদা পৃষ্ঠায় খসখস করে অপরাজিত রায় এঁকে ফেললেন ছবি! এ বোধ হয় কেবল সত্যজিৎ রায়ের পক্ষেই সম্ভব। যা দেখে চিতে পারে গ্রামবাসীরা। পরে সেই ব্যক্তিকে দিয়েই দৃশ্যটিতে অভিনয় করানো হয়।
পথের পাঁচালীর সবচেয়ে আশ্চর্য দৃশ্য কাশবনের ভেতর দিয়ে ট্রেনের ছুটে যাওয়া। এই দৃশ্যকেও অপরাজিত ছবিতে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক অনীক দত্ত। দৃশ্যটিতে পরিচালকের মুন্সিয়ানা লক্ষ্য করার মতো। ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যু দৃশ্যটিও আমাদের আশ্চর্য করে। অপু ওরফে মানিকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শিশুশিল্পী আয়ুস এবং দুর্গা ওরফে উমার ভূমিকায় অনুষা বিশ্বনাথন। অর্থের অভাবে একসময় শুটিং বন্ধ হয়ে যায় পথের পদাবলীর। তারপর মুখ্যমন্ত্রী বিমান রায়ের কাছে সাহায্যের জন্য যান অপরাজিত রায়। অনেক ভেবেচিন্তে পথের পদাবলী নাম শুনে তিনি পরিচালককে পাঠিয়ে দেন পূর্ত দফতরে। সরকারি সাহায্য পেলে আবার শুরু হয় শুটিং এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে।
বিমান রায়ের ভূমিকায় বর্ষিয়ান অভিনেতা পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ের জাদু নতুন করে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অপরাজিত রায়ের মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অনসূয়া মজুমদার। ছেলের জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন সুরমা দেবীকে এক আত্মীয়ার কাছে বলতে শোনা যায়– এত কষ্ট করে অপুকে লেখাপড়া শেখালাম, শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে ছবি আঁকা শেখালাম তা কি কেবল ফিল্ম করে বখে যাওয়ার জন্য? তখন শীলা নামের সেই আত্মীয়া অভয় দিয়ে বলেন, আমাদের অপু কি বখে যাওয়ার মতো ছেলে! সেই কথাই পরে প্রমাণিত হয়। তাই রেডিওতে ছেলের সাক্ষাৎকার শুনতে শুনতে মায়ের চোখে জল আসে।
বিজয়া রায় ছাড়া সত্যজিৎ রায়ের জীবন যে অসম্পূর্ণ এ ছবিতে তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সায়নী ঘোষ অভিনয় করেছেন সেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। অন্যরকম ফিল্ম বানাতে চাওয়া অপরাজিতকে যখন সবাই ফিরিয়ে দিচ্ছেন বা ছবিতে গান ঢোকানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তখন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্ত্রী। এমন কি বিয়েতে পাওয়া গয়নাও বন্ধক দিতে পিছু পা হননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল এ ছবি একদিন সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেবে। শেষমেশ হলেও তাই। নিউইয়র্ক থেকে প্রশংসা এলো। তারপর বিখ্যাত কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দর্শকের মন জয় করল পথের পদাবলী। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি অপরাজিত রায়কে। এ ছবির মধ্যে দিয়েই তাঁর জীবন বাঁক নেয় নতুন পৃথিবীর দিকে। কলকাতার মঞ্চে সংবর্ধিত হন তিনি। ছবিতে তাঁর সঙ্গীদের ভূমিকায় ঋত্বিক, দেবাশিস, শোয়েব প্রমুখ যথার্থ অভিনয় করেছেন।”