বাতিঘরের দ্বীপ কুতুবদিয়া

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৩ years ago

Manual5 Ad Code

ডেস্ক নিউজ: শিক্ষাঙ্গনের উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে আমরা স্বপ্ন দেখি একদিন ভ্রমণে যাব। অপেক্ষায় থাকলাম ছুটি হওয়ার। অবশেষে ছুটি হলো। ঠিক করলাম কক্সবাজার যাব বাতিঘরের দ্বীপ কুতুবদিয়াতে। বেরিয়ে পড়লাম ভ্রমণের উদ্দেশে আমি আর বন্ধু রাইসি। ব্যাগভর্তি প্রয়োজনীয় জিনিস। যেমন-তাঁবু, বুট জুতা, হাতঘড়ি, ক্যামেরা, পানি এবং আবহাওয়াভিত্তিক কাপড়চোপড় ইত্যাদি। নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড থেকে রাত ১১টায় সেন্টমার্টিন বাস সার্ভিস কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে রাতভর গাড়িতে ঘুমিয়ে সকাল ৬টায় পৌঁছালাম গন্তব্য চকোরিয়ায়। চকোরিয়া থেকে সিএনজিযোগে একঘণ্টা জার্নি করে পৌঁছালাম পেকুয়ার মগনামা জেটি ঘাটে।

Manual3 Ad Code

চোখে পড়ল পশ্চিমে বিশাল নদী কর্ণফুলী। অপর প্রান্তে সমুদ্রের বুকের ভেতর ভেসে আছে এক টুকরা জেগে উঠা দ্বীপ বাতিঘরখ্যাত কুতুবদিয়া। খুশিতে টলমল যেন চক্ষু যুগল। এরপর জেটির প্রবেশ মুখে পাঁচ টাকা জেটি ভাড়া দিয়ে ছোট ছোট স্পিড বোটে উঠে পড়লাম কুতুবদিয়ার দরবার ঘাটের গন্তব্যে। ঢেউয়ের সঙ্গে ঝাপটাতে ঝাপটাতে স্পিডবোট পৌঁছাল পাঁচ থেকে সাত মিনিটের ভেতর অপরপ্রান্তে দরবার ঘাটে। এরপর আবারও পাঁচ টাকা নাকি ঘাট ভাড়া।

Manual7 Ad Code

ভাড়া দিয়ে কুতুবদিয়া দ্বীপের বিখ্যাত বুজুর্গ মালেক শাহ্ হুজুরের দরগাহতে ছুটছি মনের আনন্দে। হুজুরের মাজার জিয়ারত শেষে গন্তব্য ঠিক করলাম সেই কুতুবদিয়া দ্বীপের প্রাণখ্যাত বাতিঘরের উদ্দেশ্য। এক পর্যায়ে বিকাল গড়াল। আধঘণ্টা জার্নি শেষে পৌঁছালাম বাতিঘরে। দেখলাম বিশাল আকাশের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাতিঘর। পশ্চিমে বিশাল পানি সমুদ্র বঙ্গোপসাগর। চিকচিক বালির তীরের কাছাকাছি থেকে পানিতে উড়ছে সাদা পায়রা, অতিথি পাখি। এরা সাধারণত আসে শীতকালে সুদূর উত্তর মেরু থেকে উড়ে উড়ে। নজর কাটল সূর্যের রক্তিম আলোর কিরণ ঝুঁকে পড়েছে বাতিঘরের উঁচু শিরে।

দেখতে কী যে ভালো লাগছে। বেশ পরমানন্দে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো কুতুবদিয়ার বুকে বুকে। জ্বলে উঠল বাতিঘরের বাতি। সাধারণত এ বাতির দ্বারা সমুদ্রের বিভিন্ন জাহাজকে সচেতন করা। বাতির আলোয় ঝলমলে উঠল দ্বীপের চর। মাঝে মাঝে আলো ছড়াচ্ছে জোনাকি পোকা, পূর্ণিমার চাঁদ। তারা গুনতে গুনতে আমরা দ্বীপের চরে সমুদ্র তীরে ঝাউগাছের নিচে টেনে ফেললাম একটা তাঁবু। ইট দিয়ে ব্যবস্থা করলাম একটা চুলা। লাকড়ি সংগ্রহ করে কফি বানিয়ে নিল বন্ধু রাইসি। সমুদ্র তীরে বালির ওপর বসে হাওয়া খেলাম প্রাণভরে। দেখলাম, সমুদ্রের মাঝে মাঝে দুই-তিন কিলোমিটার পর পর জাহাজ আর মাছের বোট চলাচল করছে। এ দ্বীপের মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে সমুদ্রের মাছ দিয়ে।

অবশেষে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম তাঁবুতে। ভোরে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। পূর্বদিকে নতুন সূর্য উদিত হচ্ছে জগতে-দ্বীপের বুকে। যেন নতুন স্বপ্ন, সুন্দর দিন নিয়ে। চিকচিক করছে বালু-গর্জন দিচ্ছে সমুদ্রের ঢেউ। আমি হাঁটতে গেলাম। সকালে হাঁটার অভ্যাস আছে। এর মধ্যেই ইটের চুলা আর লাকড়ি জ্বালিয়ে রাইসি বানিয়ে নিল সকালের নাশতা। নাশতা খেয়ে আর তাঁবু ভেঙে দুজনই উঠে হাঁটা ধরলাম নতুন গন্তব্যে। আজকের গন্তব্য বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘোরাঘুরি। ধারণা করা হয়, সমগ্র বাংলাদেশে কুতুবদিয়া দ্বীপেই প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন হয় ১৯৯৬ সালে। আধঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের জার্নিতে দুটি গাড়ি পালটিয়ে অবশেষে পৌঁছালাম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রে। কুতুবদিয়া দ্বীপের মানুষের ঘরে ঘরে আলো দিতে এ বায়ু বিদ্যুতের কর্তৃত্ব অপরিসীম। দেখলাম, উঁচু উঁচু টাওয়ার বানিয়ে আকাশের বুকে বড় বড় পাখা রয়েছে। যে পাখাগুলো থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এ পাখা থেকেই তারের মাধ্যমে জ্বলে ওঠে দ্বীপ, মানুষের ঘর। পূর্বে-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ চারদিকে সমুদ্র। এ দ্বীপের মানুষ নানা প্রতিকূলতায় বেঁচে আছে স্রষ্টার নির্দেশিত পথে চলে। এ দ্বীপের মানুষের মন প্রকৃতির মতোই সুন্দর, নির্মল, উজ্জ্বল। যা সহজেই মানুষকে মুগ্ধ করেছে। যেমন মুগ্ধ করেছে দ্বীপের প্রকৃতি, সকাল, সমুদ্দুর।

যেভাবে যাবেন : কুতুবদিয়া যেতে হবে কক্সবাজারের বাসে। ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যায় সোহাগ পরিবহণ, টিআর ট্রাভেলস, গ্রিনলাইন পরিবহণ, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সেন্টমার্টিন পরিবহণ, সৌদিয়া পরিবহণের এসি বাস ভাড়া ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া এস আলম, সৌদিয়া, শ্যামলী, ইউনিক, ঈগল ইত্যাদি পরিবহণের ননএসি বাসে ভাড়া সাড়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।

এসব বাসে চড়ে নামতে হবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের পথে যাত্রাবিরতি চকোরিয়া। সেখান থেকে সিএনজিচালিত টেক্সিতে যেতে হবে মাগনামা ঘাট। জনপ্রতি ভাড়া ৮০ টাকা। মাগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়া চ্যানেল পার হতে হবে ইঞ্জিন নৌকা অথবা স্পিডবোটে। ইঞ্জিন নৌকায় সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ মিনিট, ভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আর স্পিডবোটে লাগে ১০ মিনিট, ভাড়া একশ থেকে দেড়শ টাকা। চ্যানেল পার হলেই কুতুবদিয়া।

Manual3 Ad Code

কোথায় থাকবেন : কুতুবদিয়া দ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্য মানসম্মত একমাত্র আবাসন ব্যবস্থা হলো হোটেল সমুদ্র বিলাস। সমুদ্র লাগোয়া এ হোটেলে বসে উপভোগ করা যায় সমুদ্রের সৌন্দর্য। হোটেলের দুজনের ননএসি কক্ষ ভাড়া ৮০০ টাকা, তিনজনের ১ হাজার এবং চারজনের কক্ষ ভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা। অথবা বিশাল আকাশের নিচে সমুদ্র তীরে বালুর ওপর তাঁবু টানিয়ে হাওয়া খেতে খেতে পূর্ণিমা চাঁদের আলোয় রাতযাপন করতে পারেন নির্বিঘ্নে। প্রয়োজনে জিজ্ঞাসা বা মতামত নিতে পারেন স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code