কলকাতার ধর্ষণ-হত্যার প্রতিবাদের পথ দেখাচ্ছে বাংলাদেশের কোটা আন্দোলন?

লেখক: Nopur
প্রকাশ: ২ years ago

Manual8 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: কলকাতার সরকারি হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণের শিকার ও খুনের প্রতিবাদ যখন শুরু হয়েছিল তার কদিন আগেই প্রতিবেশী বাংলাদেশে ঘটে গেছে গণঅভ্যুত্থান, দেশ ছেড়ে চলে গেছেন প্রধানমন্ত্রী, পতন হয়েছে সরকারের।

বাংলাদেশের ওই আন্দোলনে যেসব স্লোগান উঠতে শুনেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, তার অনেকগুলিও শোনা যাচ্ছে ‘রাতের রাস্তা দখল’ বা তার পরবর্তী এক সপ্তাহ ধরে ওই ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নিয়ে যত প্রতিবাদী মিছিল হচ্ছে, সেখানে। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ যেমন শোনা গেছে, তেমনই কয়েকদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক দল – বিজেপি, সিপিএম এবং কংগ্রেস যে দাবি তুলছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর পদত্যাগের, সেখানেও শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশের আদলেই স্লোগান : ‘দফা এক দাবী এক, মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ’। এবার রাজনৈতিক দলগুলির বাইরে, নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে থেকেও সেই দাবি উঠতে শুরু করেছে।

জারি রয়েছে প্রতিবাদ
গত দিন দশেক ধরে চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ চলছে, বুধবারও তা অব্যাহত থেকেছে। জুনিয়র ডাক্তাররা এদিন বিক্ষোভ মিছিল করে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের সদর কার্যালয়ে গিয়েছিলেন, অন্যদিক বিজেপি নেতারা ধর্নায় বসেছিলেন আরজি কর হাসপাতালের কাছে শ্যামবাজারে। বুধবার বিকেলে বিজেপি একটি মিছিল করে, যেখানে অনেকটা বাংলাদেশের আন্দোলনের স্লোগানের ধাঁচে প্ল্যাকার্ড ছিল : ‘দফা এক দাবি এক মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ’।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও প্রাক্তনরা কলেজ স্ট্রিটে জমায়েত করেন। আবার কংগ্রেস নেতা-কর্মীদের একটি বড় মিছিল গিয়েছিল কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারের দিকে। মিছিলকারীদের পথ রোধ করে পুলিশ। সেই ব্যারিকেড ভাঙ্গার চেষ্টা হলে কংগ্রেস কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। ক্রীড়া জগতের মানুষও পথে নেমেছিলেন ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস ফর আরজি কর’ স্লোগান দিয়ে। বুধবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আর একাধিক মিছিল-জমায়েত-প্রতিবাদ হয়েছে।

Manual6 Ad Code

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিবাদী চিকিৎসকদের কর্মবিরতি শেষ করে কাজে ফেরার আবেদন করলেও আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও জুনিয়র ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআই এবং রাজ্য সরকারের যে ‘স্টেটাস রিপোর্ট’ জমা দেওয়ার কথা, সেটা দেখে তারা পরবর্তী কর্মসূচী ঠিক করবেন। কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গে যেমন প্রতিবাদ হচ্ছে, তেমনই ভারতের অন্যান্য শহরেও ডাক্তারদের প্রতিবাদ অব্যাহত আছে।
‘বাংলাদেশ পারলে আমরা পারব না?’

আরজি কর হাসপাতালের চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে ভারতের স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে যে কয়েকশো জমায়েত হয়েছিল, সেগুলির ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে, এমন একজন কলকাতার প্রকাশক দীপায়ন ধর। তিনি বলছিলেন, “আরজি করের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে এখন যে আন্দোলন চলছে, তা কিছুটা তো নিশ্চয়ই বাংলাদেশের ছাত্রদের আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তবে এখন যেভাবে আন্দোলন হচ্ছে, সেটা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।“

কলকাতার প্রতিবাদীদের একাংশ বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের দুটি আন্দোলনের সব থেকে বড় মিল হল রাজনৈতিক পতাকা ছাড়া সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে পড়াটা। ‘রাতের রাস্তা দখল’ কর্মসূচিতে উদ্যোগ নিতে দেখা গিয়েছিল, এমন আরেকজন অদিতি রায়।

তিনি বলছিলেন, “রিক্লেইম দ্য নাইট বা রাতের রাস্তা দখল কর্মসূচির একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে প্রথম এই আন্দোলন হয়েছিল। এই যে উই ওয়ান্ট জাস্টিস স্লোগান, সেটা কিন্তু ওই আন্দোলনেরই স্লোগান ছিল। কিন্তু ঠিকই, সেই ইতিহাস হয়ত অনেকেই জানেন না। তাদের একটা বড় অংশকে সেদিন রাতে পথে নামতে সম্ভবত বাংলাদেশের আন্দোলনই উজ্জীবিত করেছে।”

Manual8 Ad Code

“যেভাবে সাধারণ মানুষ প্রায় রোজই কোনও দলীয় পতাকা ছাড়া, দলমত নির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামছেন আরজি করের ঘটনার প্রতিবাদে, সেটার পথ দেখিয়েছে বাংলাদেশই। তারা তো দেখিয়েছেন যে এভাবেও সম্ভব! অনেকেই ভেবেছেন যে বাংলাদেশ পারলে আমরা পারব না?” বলছিলেন অদিতি রায়।

পুঞ্জীভূত ক্ষোভ
দীপায়ন ধরের কথায়, “কলকাতার একটা প্রিমিয়ার ইনস্টিটিউটে কর্তব্যরত অবস্থায় এক চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা তো মানুষকে ক্ষুব্ধ করেইছে, তবে এর বাইরেও জনমানসে একটা ক্ষোভ দানা বাঁধছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দেওয়ার একটা জায়গা খুঁজছিলেন মানুষ। সেটাই এই ঘটনার প্রতিবাদের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে বলে আমার মনে হয়। বাংলাদেশেও তো সেটাই ঘটেছে।“

শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারত এবং পাকিস্তানে যে আন্দোলন হচ্ছে, সবগুলির ধাঁচ অনেকটা একরকম বলে মনে করছেন তিন-দেশের রাজনীতির ওপরেই নজর রাখা কলকাতার তথ্যচিত্রকার সৌমিত্র দস্তিদার। তিনি বলছিলেন, “তিনটি দেশের আন্দোলনের মূল সুরটা যদি দেখেন, সবগুলিই কিন্তু অচলায়তন ভাঙ্গার চেষ্টা, এবং সবক্ষেত্রেই একেবারে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন। সব জায়গাতেই এমন বহু মানুষ রাস্তায় নামছেন, যাদের একটা বড় অংশ তরুণ এবং এদের অনেকেই কোনও দিন কোনও ধরণের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

Manual7 Ad Code

“সব জায়গাতেই দেখা যাচ্ছে একটা স্বতঃস্ফূর্ত জন জাগরণ দেখা যাচ্ছে। কোন দল কী করবে, কী দাবি তুলবে, সেটার অপেক্ষায় মানুষ বসে থাকছে না,” বলছিলেন মি. দস্তিদার। তার কথায়, “এইসব আন্দোলন থেকে যে সিস্টেম বদলের আওয়াজ উঠছে, রাজনৈতিক দলগুলির চেনা আখ্যানের বাইরে গিয়ে, সেটা অবশ্য দেখিয়েছে বাংলাদেশের ছাত্রদের শুরু করা আন্দোলনই।“ কী বলছে তৃণমূল কংগ্রেস?

Manual2 Ad Code

রাজনৈতিক দলগুলো যে তার পদত্যাগ চাইছে এবং কলকাতার আন্দোলনের ওপরে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা ব্যানার্জী নিজেও। তিনি সম্প্রতি বলেছিলেন যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সেদেশের আন্দোলনকারীরা সরিয়ে দিতে পেরেছে – এটা দেখে কলকাতার আন্দোলনকারীরাও উৎসাহিত হচ্ছে, এই ভেবে যে ‘এখানেও পারবে’, অর্থাৎ তাকেও ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারবে।

তার দলও আরজি করের ঘটনা নিয়ে ‘রাম-বাম’, অর্থাৎ বিজেপি এবং সিপিআইএমের রাজনীতির কথা বলছে বারবার। দলের অন্যতম মুখপাত্র অধ্যাপক মনোজিৎ মণ্ডল বলছিলেন, “বিরোধীদলগুলো যে রাজনীতি করবে এই নারকীয় ঘটনা নিয়ে, তা তো জানা কথা। কিন্তু তার বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেও মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠছে, তা নজরে আসে নি।

“যে ঘটনার বিচার চাওয়া হচ্ছে, এখনও পর্যন্ত যা তদন্ত, যা গ্রেফতারি, সেই সবটাই কিন্তু মমতা ব্যানার্জীর সরকারের পুলিশই করেছে। সিবিআই তো তদন্তভার পেয়েছে দশদিনের বেশি হয়ে গেল। কোনও অগ্রগতি কী তারা করতে পেরেছে? তাহলে মমতা ব্যানার্জীর পদত্যাগ কেন চাওয়া হবে? সিবিআই যে মন্ত্রণালয়ের অধীন, তার মাথায় যিনি বসে আছেন – প্রধানমন্ত্রী – তার পদত্যাগ চাওয়া উচিত,” বলছিলেন অধ্যাপক মণ্ডল। সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেও যে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়া হচ্ছে, সে ব্যাপারটি তার নজরে না এলেও সামাজিক মাধ্যমের নানা পোস্ট বা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে, চায়ের দোকানে, আড্ডাতেও যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা নজরে আসছে।

সূত্র: বিবিসি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code