মাহফুজ আদনান
ক্রমান্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা ধরনের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, সময়ে সময়ে একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে যাচ্ছি কি আমরা? বাংলাদেশ যেন বানানো একটি কারাগার। গোটা বাংলাদেশটাই আয়নাঘরে পরিণত এখনো। দেশে যেভাবে ঘটনার ঘনঘটা নিজেকে আত্মগোপন করে রাখা, নিজেকে না জড়ানো বাংলাদেশে সম্ভব অতীতেও ছিল না এখনও নেই। যারা টাকা পাচারকারী তারা প্রতাপের সাথে ঘুরাফেরা করেছে। যারা খুনী হত্যাকারী তাদের পিঠে সিল থাকলেও তারা সমাজের সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তি হয়ে আছেন।
গণতন্ত্র এখনও নিরাপদ নয়,নানা বিষয়ে নানা ধরণের গোজামিল দেখতে পাচ্ছি। এটা হওয়ার কথা নয়। কবে আমরা দেখবো বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শর্তগুলো পূরণ হচ্ছে । স্বাধীনভাবে কথা বলবে সবাই, স্বাধীনভাবে সংগঠন করবে। এখানে কোন গুন্ডামি সন্ত্রাসীর আশ্রয় থাকবে না। যেটা আগের সরকারগুলো করেছিল। আগেও প্রশ্নে ভয় ছিল সরকার দলীয় শাসকদের এখন তার কিছুই বদলায়নি।
এখনও দেশে চলছে তুঘলকি কারবার। দেশে জাতীয় শোক দিবস ঘোষনা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বহাল রাখা আবার গভীর রাতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা করা । অবিচকপ্রসূত ঘটনার জেরে শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষাসচিবের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় শিক্ষার্থীরা নেমে এলে। এ সময় তাঁদের লাঠিপেটা করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিচার্জ, সংঘর্ষ কি কোনভাবেই এড়ানো যেত না। এজন্যই এত আন্দোলন সংগ্রাম আমরা করেছি? ২০২৪ এর পর মাত্র এক বছরের কাছাকাছি এসে আমাদের শুভবোধ কি বলছে?
এ ঘটনায় অন্তত ৭৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্যও আহত হন। সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবেই এমন পরিস্থিতি হল কিন্ত আমরা দেখলাম সেই পুরানো রাজনৈতিক সংস্কৃতি অন্যের উপর দোষ চাপানোর রীতি। সেই রীতি যদি বহাল ই থাকে তাহলে আমাদের ছাত্রনেতা বলবেন কি?
এখন আমরা তাদের মনে করি গণতান্ত্রিক শক্তির একটা অংশ। কিন্তু আপনারা সবকিছু বাদ দিয়ে যখন সংস্কার নামে এটা সেটা করেন তখন আমাদের সন্দেহ হবেই বৈকি নাকি হওয়া উচিত নয়।
সমাজের মধ্যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। আইন শৃঙ্খলার প্রচণ্ড অবনতি দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক অবস্থা জটিল হচ্ছে। শুল্কহার ৫০ শতাংশ হয়ে গেছে। যত্রতত্র ব্যবস্থা না নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবার ক্ষমতা সক্ষমতা দেখানো উচিত সরকারকে ।
সোমবার রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষার্থীসহ ৩২ জন নিহত হন। আহত হন দেড় শতাধিক। মর্মান্তিক এ ঘটনার পর ক্ষুব্ধ করে তোলেছে কোটি কোটি মানুষকে।
বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ঘিরে ধরেন শিক্ষার্থীরা শুধু তাই নয় উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং সি আর আবরার। তখন তাঁদের সঙ্গে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ প্রেস উইংয়ের আরও তিন সদস্য। ৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তাঁরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন।
উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান এমন এক স্থানে বিধ্বস্ত হলো, প্রশ্ন হলো, আমরা এ দুর্ঘটনা ও এতগুলো মৃত্যু এড়াতে পারতাম কি না। পৃথিবীর সব দেশেই প্রশিক্ষণ বিমানের উড্ডয়ন ও ল্যান্ডিং করা হয় নির্জন বা কম বসতিপূর্ণ এলাকায়; সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হয়। লোকালয় থেকে দূরে মাঠ, চর অঞ্চল অথবা অন্য কোনো জায়গায়। কিন্ত সেই জায়গায় আমরা হাত দিতে কি পারবো প্রশ্ন থেকে যায়, কারণ আমাদের অভিজ্ঞতা ভাল না। তারপরও এর আমরা এর জবাব চাই, সঠিক জবাব ।
পরিশেষে ফেসবুকের একটি লেখা দিয়ে ইতি টানছি– “একটা বোতাম চাপলেই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ফিরে যেতে পারতেন পরিবারে, জীবনের কাছে। নিজেকে বাঁচানোর সুযোগ ছিল তাঁর হাতে। জরুরি পরিস্থিতিতে বিমানের নিয়ন্ত্রণ সিট ত্যাগ করে প্যারাসুট নিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষায় লাফ দেননি তিনি। বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ফাঁকা জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
তাঁর যে বিমানটি, সেটি ছিল পুরনো এক F-7। একটা যুদ্ধবিমান, যার জায়গা ২০২৫ সালের আকাশে থাকার কথা না। তবু সেটিই উড়ছিল— কারণ দুর্নীতি এখনও উড়ছে এই দেশের আকাশে, আর সেই দুর্নীতির ভার বইছে এই প্রজন্মের সাহসীরা।
তৌকির আকাশে মারা যাননি। তিনি মরে গিয়েছিলেন অনেক আগেই— যেদিন বাজেট চুরি হয়েছিল, যেদিন সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৯৭৬ সালের বাতিল বিমান দিয়েই চলবে আধুনিক যুগের প্রশিক্ষণ।
এই সিস্টেম তাঁর জন্য কিছুই রাখেনি— না কোনো নিরাপত্তা, না কোনো বিকল্প। রেখে গেছে কেবল ঝুঁকি, মরচে ধরা লোহা, আর এক তরুণ অফিসারের নিশ্চিত মৃত্যু।
উত্তরায় বিমান বিধ্বস্তের এই ভয়াবহ ঘটনায় শুধু তৌকির নন, প্রাণ হারিয়েছেন আরও অনেকে। তাঁদের সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তাঁদের পরিবার-পরিজনের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা। আহত যারা হয়েছেন, আল্লাহ যেন তাঁদের দ্রুত সুস্থতা দান করেন। আর যেন কোনো তরুণ তৌকিরকে,একটা মরচে ধরা বিমানের সঙ্গে জীবন বিসর্জন দিতে না হয়।”
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।