

ডেস্ক রিপোর্ট : মহামারীর দীর্ঘ স্থবিরতার পর মন্ট্রিয়লের পর্যটন খাত এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পর্যটকদের ব্যাপক আগমন এবং আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলোর সফল আয়োজনে শহরের আবাসিক হোটেলগুলো বর্তমানে অভূতপূর্ব সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান করছে। ট্যুরিজম মন্ট্রিয়ল-এর প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মন্ট্রিয়লের হোটেল শিল্পে আয় এবং কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে, যা শহরের সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মন্ট্রিয়লের হোটেলগুলোর গড় দখল হার দাঁড়িয়েছে ৮১ শতাংশ, যা গত বছরের একই সময়ের (৬৫ শতাংশ) তুলনায় ১৫ শতাংশের এক উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিশেষ করে, শহরের প্রাণকেন্দ্র ডাউনটাউন মন্ট্রিয়ল এলাকায় এই হার ছিল আরও বেশি, প্রায় ৮৯ শতাংশ। প্রায় প্রতিটি সপ্তাহান্তেই এই এলাকার হোটেলগুলো সম্পূর্ণ বুকড ছিল। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং পর্যটকদের মধ্যে মন্ট্রিয়লের আকর্ষণ কতখানি বেড়েছে তার স্পষ্ট প্রতিফলন।
অর্থনৈতিক দিক থেকে এই প্রবৃদ্ধি আরও বেশি চোখে পড়ার মতো। চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত হোটেল খাত থেকে মোট আয় হয়েছে প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের আয়ের (৮৫০ মিলিয়ন ডলার) চেয়ে অনেক বেশি। শুধু আগস্ট মাসেই আয় হয়েছে ২৮০ মিলিয়ন ডলার, যা মন্ট্রিয়লের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ আয়ের অন্যতম রেকর্ড। এই বিপুল আয় কেবল হোটেল মালিকদের জন্যই নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে এক শক্তিশালী প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে।
পর্যটকদের প্রবল চাহিদা এবং উৎসবের মরসুমের কারণে হোটেল কক্ষের ভাড়াও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এক রাতের জন্য যেখানে গড় ভাড়া ছিল প্রায় ১৭৫ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১০ ডলারে, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি। ভাড়া বাড়া সত্ত্বেও হোটেলগুলোতে অগ্রিম বুকিং ছাড়া কক্ষ পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এটি প্রমাণ করে যে মন্ট্রিয়লের পর্যটন কেবল পরিমাণে নয়, গুণগত মানেও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মন্ট্রিয়লের হোটেল ব্যবসার এই সাফল্যের পেছনে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব ও আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ বছর অনুষ্ঠিত মন্ট্রিয়ল জ্যাজ ফেস্টিভ্যাল-এর মতো বড় ইভেন্ট চলাকালীন এক সপ্তাহেই প্রায় ৩৮,০০০ হোটেল রাত বুকিং হয়েছিল। একইভাবে, জাস্ট ফর লাফস ফেস্টিভ্যাল এবং অন্যান্য বড় ক্রীড়া ইভেন্টের সময় হোটেলগুলোর দখল হার ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এসব উৎসব মন্ট্রিয়লকে শুধু একটি গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং একটি বিশ্বমানের ইভেন্ট কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মন্ট্রিয়লের হোটেল শিল্পের এই সাফল্যের প্রধান কারিগর হলো বিদেশি পর্যটকরা। মোট বুকিংয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যা সবচেয়ে বড় গ্রাহক গোষ্ঠী। এছাড়া ইউরোপ থেকে ২৭ শতাংশ এবং এশিয়া থেকে ১৫ শতাংশ পর্যটক এসেছেন। বিশেষ করে ভারত, চীন ও জাপান থেকে আগত পর্যটকের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা এশীয় বাজারের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়।
পর্যটন খাতের এই পুনরুজ্জীবন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে মন্ট্রিয়লের হোটেল খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ২৯,৫০০, যা গত বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি শুধু হোটেল শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রেস্টুরেন্ট, পরিবহন এবং অন্যান্য সহযোগী ব্যবসাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সব মিলিয়ে, মন্ট্রিয়লের আবাসিক হোটেলগুলো এখন এক স্বর্ণালী সময় পার করছে। পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি, বড় ইভেন্টগুলোর আয়োজন, এবং হোটেল কক্ষের ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি—সবকিছুই শহরের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে মন্ট্রিয়ল উত্তর আমেরিকার অন্যতম শীর্ষ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।