সংগ্রাম দত্ত
আজ ২৪ সেপ্টেম্বর, আমরা স্মরণ করছি চট্টগ্রামের কিশোর বয়সী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মত্যাগকে। যদিও প্রকৃত ঘটনা ঘটেছিল ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ সালে, ইতিহাসের পাতায় তার সাহস ও দেশপ্রেমের গল্প আজও অমর। প্রীতিলতা ছিলেন কিশোর বয়স থেকেই স্বাধীনতার প্রতি আকৃষ্ট এবং দেশের মুক্তির জন্য যে কোনো আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত।
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান নাইট ক্লাব আক্রমণের সময় প্রীতিলতা বাম বাহুতে গুলি লাগলেও পালানোর পরিবর্তে মৃত্যুকে বেছে নেন। মৃত্যুর আগে তিনি সহযোদ্ধাকে পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে ঢেলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর হাতে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “দেশের মুক্ত সংগ্রামে নারী-পুরুষের পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করিয়েছে। যদি আমার ভাইরা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারে, আমরা ভগিনীরা কেন পারব না?” এই লাইনটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীও যে দেশের স্বাধীনতার জন্য অসীম সাহস দেখাতে পারে।
কিশোর বয়স থেকেই প্রীতিলতা দলের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার জন্য বহুবার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও দলের নীতি অনুযায়ী সাধারণ নারী সদস্যদের সীমিত রাখা হয়, প্রীতিলতার নিষ্ঠা, ধৈর্য এবং সাহস শেষ পর্যন্ত মাস্টারদারের আস্থা অর্জন করে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারীও যে কোনো বিপ্লবী কার্যক্রমে মূল ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
প্রীতিলতার জীবন কেবল স্বাধীনতার প্রতীক নয়। এটি নারীশক্তির অনন্য উদাহরণ। সমাজে আজও নারীরা সমান মর্যাদা পাচ্ছেন না, তবু তাদের অবদান অপরিসীম। মা, বোন, স্ত্রী—নারীরা শিশু শিক্ষাদীক্ষা, চরিত্রগঠন এবং সামাজিক নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করেন। প্রীতিলতার মতো নারীরা কেবল নিজের স্বাধীনতার জন্য নয়, পুরো সমাজকে মুক্তি ও উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম।
প্রীতিলতার আত্মত্যাগ অতীতের অন্যান্য বিপ্লবীদের সাহসের সঙ্গে সমানভাবে স্মরণযোগ্য। ক্ষুদিরাম বসু, কানাইলাল দত্ত, বাঘা যতিন, সূর্য সেন—তাঁরা সবাই মৃত্যুকে অবজ্ঞা করে দেশের মুক্তির জন্য লড়েছেন। প্রীতিলতার জীবন নারীশক্তির চিরন্তন প্রতীক। তার সাহস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীর শক্তি কখনো কম নয়, বরং সঠিক প্রেরণা পেলে তারা দেশের জন্য বিপ্লবী ভূমিকা পালন করতে পারে।
আজকের প্রজন্মের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ যে তারা তাদের শিকড় জানুক, ইতিহাস বোঝুক এবং গৌরব অনুভব করুক। আমাদের সন্তানরা সেই অদম্য সাহসী পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকারী। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া মানে শুধুমাত্র পড়াশোনা নয়; সেই আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রীতিলতার জীবন আমাদের শেখায় সততা, সাহস এবং দেশপ্রেমের মূল্যবোধকে জীবন্ত রাখা কতটা জরুরি। নারীর মর্যাদা, স্বাধীনতার চেতনা এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা—এই মূল্যবোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের কর্তব্য। প্রীতিলতার জীবন দেখায়, একজন নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সমাজসেবা এবং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে দেশ ও সমাজকে শক্তিশালী করতে পারে।
২৪ সেপ্টেম্বর, প্রীতিলতার আত্মত্যাগের দিনে আমরা অঙ্গীকার করি—নারীশক্তির মর্যাদা, দেশপ্রেম এবং সমাজসেবার চেতনা আমরা জীবিত রাখব। ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের জীবন আমাদের শেখায় কখনো ভয় পাওয়া বা পিছপা হওয়া উচিত নয়। প্রীতিলতার সাহসী জীবন আমাদের জন্য চিরন্তন শিক্ষা, যা আমাদের গর্বিত করে এবং মনে করায়—অতীতকে সম্মান এবং ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অপরিহার্য।
আজ আমরা শুধুমাত্র প্রীতিলতার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করি না; তার জীবন ও আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন, ন্যায় এবং দেশপ্রেমকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি। প্রীতিলতার সাহসী মনোবল আমাদের শেখায়, নারীর শক্তি সীমাবদ্ধ নয় এবং সঠিক প্রেরণা পেলে তিনি সমাজে বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম।
প্রতিটি প্রজন্মের কাছে প্রীতিলতার জীবন স্মরণীয়। তার জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে সাহস, নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং নারীশক্তি মিলিয়ে এক শক্তিশালী সমাজ গঠন সম্ভব। প্রীতিলতার চেতনা শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য এক অনন্ত দীক্ষা। তার আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সত্যিকারের সাহস ও নিষ্ঠা নারী বা পুরুষ নির্বিশেষে দেশের উন্নয়নের পথে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
২৪ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতার স্মরণে আমরা শুধু ইতিহাসের পাতায় তাকাই না, বরং তার জীবন ও আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজের জীবন ও সমাজকে সমৃদ্ধ করি। সাহসী বিপ্লবী, অনুপ্রেরণার প্রতীক এবং নারীশক্তির অবিস্মরণীয় প্রতিচ্ছবি—প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার চিরকাল আমাদের মনে করিয়ে দেবেন যে সত্যিকারের দেশপ্রেম ও সাহস কোনো লিঙ্গের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।